গোমস্তগীন বিশ্রাম করছিলেন। দূত এবং মেয়ে দুটোকে শামসুদ্দীনের নিকট নিয়ে যাওয়া হয়। গোমস্তগীনের পর সালার শামসুদ্দীন-ই রাষ্ট্রীয় কাজ দেখা শুনা করে থাকেন। শামসুদ্দীন মেয়েগুলোকে তার ঘরে আলাদা বসিয়ে রেখে দূতকে জিজ্ঞেস করেন- বল, কী বার্তা নিয়ে এসেছ?
দূত যে দীর্ঘ বার্তা নিয়ে আসে, তার সারমর্ম হল, সুলতান আইউবী হাব অবরোধ করার পর সম্রাট রেমন্ড বাহিনী নিয়ে আসেন। ফলে আইউবী অবরোধ তুলে নেন। কিন্তু রেমন্ড যুদ্ধ না করেই বাহিনী নিয়ে ফিরে যান। খৃস্টানরা ভবিষ্যতেও আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করবে। আমরা যদি এভাবে আলাদা আলাদাভাবে আইউবীর বিরুদ্ধে লড়াই করি, তাহলে আমরা প্রত্যেকেই পরাজিত হব। আইউবীকে চিরতরে খতম করার জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা একান্ত আবশ্যক।
বার্তার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ করার একটি পরিকল্পনাও ছিল। তা এরকম
আলরিস্তানের পাহাড়ে বরফ গলতে শুরু করেছে। আমরা গুপ্তচর মারফত জানতে পেরেছি, সুলতান আইউবীর সৈন্যরা পাহাড়ের উঁচুতে অবস্থান করতে পারছে না। কারণ, সেখানে গলিত বরফের পানি তাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। আমাদের জন্য এটি মোক্ষম সুযোগ। আমরা সব দল যদি একত্রিত হয়ে আইউবীর বাহিনীকে ঘিরে ফেলি, তাহলে অতি সূহজেই তাকে পরাজিত করতে পারব।
পরিকল্পনায় এ-ও ছিল যে, খৃস্টান সম্রাট রেজিনাকে আমাদের সঙ্গে ভিড়িয়ে নিতে হবে। তা এভাবে যে, আপনি (গোমস্তগীন) তাকে পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করুন এবং যে প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে আপনি তাকে মুক্তি দিয়েছিলেন, সেকথা স্মরণ করিয়ে দিন।
শামসুদ্দীন পয়গামটা শাদবখতের কানে দেন। দুভাই বসে মতবিনিময় করেন। তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বার্তাটি গোমস্তগীনকে জানতে দেয়া যাবে না। আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, গোমস্তগীন সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে লড়াইটা যেন একাকী করেন। তাহলে তার পরাজয় সহজতর হবে। তারা জানতেন, আইউবীর সৈন্যসংখ্যা কম। তা দিয়ে তিনি গাদ্দার মুসলিম শাসনকর্তাদের আলাদা আলাদাভাবে খতম করতে পারবেন।
শামসুদ্দীন ও শাদবখত নিজেদের আসল পরিচয় গোপন রাখার ব্যাপারে পুরোপুরি সতর্কতা অবলম্বন করতেন। কিন্তু এ মুহূর্তে তারা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তাদের আবেগকে উস্কে দিয়েছে উপহার হিসেবে আসা মেয়ে দুটো। তারা মেয়েদেরকে তাদের ধর্মপরিচয় জিজ্ঞেস করেন। জবাবে তারা জানায়, আমরা মুসলমান। বয়সে তারা যুবতী। শামসুদ্দীন ও শাদবখতের মনে অনুশোচনা জাগে, একদিকে মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে এই দুর্বলতা সৃষ্টি করে নিয়েছে যে, তারা সুন্দরী মেয়েদের বিনিময়ে ঈমান বিকিয়ে ফেলছে। অপরদিকে যেখানে মুসলিম মেয়েদের সম্ভ্রান্ত পরিবারের শোভা বর্ধন করার কথা, সেখানে তাদেরকে তাদের-ই বাবা-মা আমীরদের হেরেমে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন।
তোমরা কোথাকার বাসিন্দা এবং এদের হাতে পড়লে কিভাবে?- শাদবখত জিজ্ঞেস করেন- তোমাদের পিতারা কি জীবিত? ভাই আছে?
এসব প্রশ্নের জবাবে মেয়েরা যা বলল, তাতেই শামসুদ্দীন ও শাদবখতের চেতনা ক্ষেপে ওঠে। যেসব অঞ্চলে খৃস্টানদের কর্তৃত্ব চলছে, সেসব এলাকার মুসলমানদের বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। একজন মুসলমানের ইজ্জতেরও কোন নিরাপত্তা ছিল না। ফলে সেসব মুসলমান বাসিন্দারা এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে হলে দলবদ্ধভাবে চলত। কাফেলায় মেয়েরাও থাকত এবং মাল-সম্পদও থাকত। অপরদিকে খৃস্টানরা কাফেলা লুট করার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকত। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ পর্যন্ত স্বীকার করেছেন যে, কোন কোন খৃস্টান ম্রাট- যারা মধ্যপ্রাচ্যের কোন না কোন অঞ্চল শাসন করতেন সেনাবাহিনী দ্বারা মুসলমানদের কাফেলা লুণ্ঠন করাত। লুটেরারা যুবতী মেয়ে, পশুপাল ও অর্থ-সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে যেত। তারা মেয়েদেরকে বাজারে নিয়ে বিক্রি করত কিংবা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে মুসলিম আমীরদের হাতে তুলে দিত। কিছু কিছু মেয়েকে খৃস্টানরা নিজেদের কাছে রেখে দিত এবং তাদেরকে গুপ্তচরবৃত্তি ও চরিত্র বিধ্বংসী কাজের জন্য গড়ে তুলত। তাদেরকে তারা মুসলমানদের এলাকায় ব্যবহার করত।
এই মেয়ে দুটোকেও একটি কাফেলা থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। তখন তাদের বয়স ছিল তের-চৌদ্দ বৎসর। তারা ফিলিস্তীনের কোন এক অধিকৃত অঞ্চল থেকে পরিবারের সঙ্গে কোন নিরাপদ এলাকার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। কাফেলাটা ছিল বিশাল। খৃস্টান দস্যুরা রাতের বেলা কাফেলার উপর হামলা চালায় এবং অনেকগুলো মেয়েকে তুলে নিয়ে যায়। এরা দুজন অস্বাভাবিক। সুন্দরী ছিল বিধায় এদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে বিশেষ যত্নে লালন পালন করতে শুরু করে। প্রথম দিকে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হলেও পরে তাদের সঙ্গে এমন সদ্ব্যবহার শুরু হয়, যেন তারা রাজকন্যা। আসলেই তাদেরকে রাজকন্যা রূপে গড়ে তোলা হয়েছিল। তাদেরকে মদপানে অভ্যস্ত করে তোলা হয় এবং অত্যন্ত উন্নত পন্থায় তাদের চিন্তা-চেতনাকে খৃস্টানদের ধাঁচে গড়ে তোলা হয়। চারু-পাঁচ বছর পর যখন সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী মৃত্যুবরণ করেন, তখন এদেরকে খৃস্টানদের পক্ষ থেকে উপহারস্বরূপ দামেস্ক প্রেরণ করা হয়। উদ্দেশ্য, খলীফা আল-মালিকুস সালিহ ও তার আমীরদেরকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে এবং নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা।
