শামসুদ্দীন সিপাহীদেরকে একটি জায়গার নাম উল্লেখ করে বললেন, আসামীকে ওখানে নিয়ে যাও; আমি ওকে কয়েদখানায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। সিপাহীরা আলতানুনকে নিয়ে যায়। শামসুদ্দীন মহলের ভিতরে চলে যান। তিনি তার ভাই শামসুদ্দীনের সঙ্গে দেখা করেন।
আসরে নাচ-গান চলছে। মেহমানগণ চরম আনন্দ উপভোগ করছেন আর গায়ক-নর্তকীদের বাহবা দিচ্ছেন। মটকার পর মটকা মদ খালি হচ্ছে। মশালের কিরণ আর ফানুসের রং-বেরং আলো নর্তকীদের গায়ের মূল্যবান ফিনফিনে পোশাকে এমন চমক সৃষ্টি করছে যে, তা আলফ লায়লার যাদুকেও হার মানায়। সবাই অচেতন-মাতাল। খৃস্টান লোকটার মৃতদেহটা ওখানে-ই পড়ে আছে। এমনি তেলেসমাতি পরিবেশে শামসুদ্দীন ও শাদবখতের মাঝে আনতানুন ও সাদিয়ার প্রসঙ্গে কথোপকথন হয়। শাদবখত শামসুদ্দীনকে অবহিত করেন, সাদিয়া এক খৃস্টান মেহমানকে খুন করে ফেলেছে।
তারা সাদিয়াকে তাদের কক্ষে নিয়ে যায় এবং বেশ-ভূষা পরিবর্তন করে সেখান থেকে পালাবার কৌশল শিখিয়ে দেয়। সাদিয়া পরিকল্পনা মোতাবেক ধীর পায়ে মহল থেকে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর দারোয়ান এসে শামসুদ্দীনকে সংবাদ জানায়, বাইরে অমুক কমান্ডার দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আপনাকে ডাকছেন। শামসুদ্দীন বাইরে চলে যায়। ভীত-সন্ত্রস্ত এক কমান্ডার দন্ডায়মান। সে রিপোর্ট দেয়- আনতানুন নামক যে রক্ষীসেনাকে দেয়াল ডিঙ্গানো অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়েছে, সে পালিয়ে গেছে।
কী বললে?- আগুনের মত গরম হয়ে যান শামসুদ্দীন- সিপাহী দুটা কি মরে গিয়েছিল?
মনে হচ্ছে, কাজটা একা আনতানুনের নয়- অনেক লোকের- কমান্ডার বলল- সিপাহী দুজন সেখানে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। তাদের মাথায় আঘাতের চিহ্ন আছে।
শামসুদ্দীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সিপাহীদ্বয়ের জ্ঞান ফিরে এসেছে। তারা জানায়, আমরা এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে পিছন দিক থেকে কে যেন আমাদের মাথায় একটি করে আঘাত হানে। আমরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
শামসুদ্দীন দৌড়-ঝাঁপ শুরু করে দেন। ঠিক সে সময়ে আপাদমস্তক কালো রেশমী চাদরে আবৃত- যার দুটি চোখ ছাড়া আর কোন অংশ দেখা যায় না–গোমস্তগীনের বাসভবন থেকে প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে যায়। সে রাতে মেহমানদের আসা-যাওয়া অব্যাহত ছিল। আপাদমস্তক পোশাকাবৃত করে বের হওয়া লোকটা কে, দারোয়ান ও রক্ষীসেনারা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনই অনুভব করল না।
মধ্যরাতের পর যখন আসর ভাঙ্গে, তখন দুর্গের দরজা খুলে যায়। ঘোড়া ও ঘোটকযান ফটক অতিক্রম করতে শুরু করে। এক অশ্বারোহী ফটক অতিক্রম করে, যার মুখটা নেকাবে ঢাকা। তার সঙ্গে অপর একটি ঘোড়ায় সেই চাঁদরাবৃতা মহিলা, যে গোমস্তগীনের বাসভবন থেকে একাকী বেরিয়ে এসেছিল।
ব্যবস্থাটা শামসুদ্দীন ও শাদবখতের। শামসুদ্দীন উক্ত সিপাহীদ্বয়কে একটি জায়গার নাম উল্লেখ করে বলেছিলেন, আনতানুনকে ওখানে নিয়ে গিয়ে আমার অপেক্ষা কর। অপরদিকে তিনি তার বডিগার্ডকে বলে দিলেন, তুমি আনতানুনকে মুক্ত করে আমার কক্ষে লুকিয়ে রাখ। আগেই বলেছি, শামসুদ্দীন ও শাদবখতের বডিগার্ড, দুজন আরদালী ও দুজন চাকর সুলতান আইউবীর কমান্ডো গোয়েন্দা। তারা যথাসময়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং আনতানুনকে মুক্ত করে ফেলে। ওদিক থেকে সাদিয়াও সাফল্যের সাথে বেরিয়ে শামসুদ্দীনের ঘরে চলে যায়। সেখানে আয়োজন পূর্ব থেকেই সম্পন্ন করা ছিল। মেহমানরা যখন বের হতে শুরু করে, তখন তাদেরকে দুটি ঘোড়া দিয়ে সেখান থেকে বের করে দেয়া হল।
নাচ-গান আর মদ-নারীতে রাতটা কেটে যায়। পরদিন সকালে খৃস্টান লোকটার লাশ চোখে পড়ে। গোমস্তগীনের মহলের একটি মেয়েও নিখোঁজ। গোমস্তগীন নির্দেশ দেন, যে দুজন সিপাহীর প্রহরা থেকে আনতানুন পালিয়েছে, তাদেরকে আজীবনের জন্য কয়েদখানায় নিক্ষেপ কর।
***
আনতানুন ও সাদিয়ার পলায়নের কথা ভুলে গেছে সবাই। গোমস্তগীনের খৃস্টান বন্ধুরা তাদের একজন কমান্ডারের খুনের ঘটনায় তোলপাড় শুরু করে দেয়। তাদের মূলত একজন সহকর্মীর মৃত্যুতে ততটা দুঃখ নেই, যতটা তারা হুলস্থুল সৃষ্টি করেছে। তাদের উদ্দেশ্য হল, অসন্তোষ প্রকাশ করে গোমস্তগীন থেকে আরো সুবিধা আদায় করা এবং অতিশীঘ্র সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর আক্রমণ করার জন্য গোমস্তগীনকে ক্ষেপিয়ে তোলা। খৃস্টানরা জানে, মুসলমানদের হেরেমগুলোতে এমন ড্রামা খেলা হয়ে থাকে, যাতে একটা মেয়ে অপহৃতও হয়, স্বেচ্ছায় উধাও হয়ে যায় এবং দু-একটা খুনের ঘটনাও ঘটে থাকে। তারা গোমস্তগীনকে অসহায় করে ফেলতে চাইছে, যাতে তিনি তাদের কাছে সম্পূর্ণরূপে নতি স্বীকার করেন। মানুষ যার প্রতি সাহায্যের হস্ত প্রসারিত করে, তার দাম বেড়ে যায় এবং সাহায্য প্রার্থনাকারীর অসহায়ত্বের সুযোগে নিজের সব শর্ত আদায় করে নেয়ার এবং অসহায়কে গোলামে পরিণত করার চেষ্টা করে। খৃস্টানরাও সেই একই নীতি অবলম্বন করছে।
ঘটনাটা গোপন রাখা গেল না। হাল্ব পর্যন্ত পৌঁছে গেছে সংবাদ। সেখানকার দরবারীগণ্যারা সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত গোমস্তগীনকে তাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছে। আল-মালিকুস সালিহ-এর পক্ষ থেকে তারা গোমস্তগীনের নিকট দূত প্রেরণ করে। সঙ্গে রীতি অনুযায়ী মূল্যবান উপটোকনও পাঠায়। উপহারের মধ্যে আছে দুটি যুবতী মেয়ে।
