আনতানুন যেখানে থাকার কথা, সেখানে নেই। সাদিয়া ভাবে, সে এসে তাকে না পেয়ে ফিরে গেছে। সে বৃক্ষটার পিছনে গিয়ে দেখে রশিটা দেয়ালের বাইরে না ভিতরে। রশি দেয়ালের ভিতরে। তার অর্থ হচ্ছে, আনতানুন এসেছে। কিন্তু লোকটা গেল কোথায়! ফিরে গেলে তো রশি বাইরেই থাকত।
সাদিয়া ওখানেই দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে। হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে একটি ছায়া নড়াচড়া করছে দেখতে পায় সে। সাদিয়া গভীরভাবে লক্ষ করে। বোধ হয় চাকরানী হবে। সে ক্ষীণ কণ্ঠে ডাক দেয়। ওদিক থেকেও ফিসফিস কণ্ঠে জবাব আসে। ও তার চাকরানী-ই। সে সাদিয়ার দিকে ছুটে এসে বলল- তাকে এখানে খুঁজে লাভ নেই। তিনি এসেছিলেন। আমি তার অপেক্ষায় লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি তাকে দেয়ালের উপর দেখেছি। তিনি রশিটা ভিতরে ছুঁড়ে ফেলে নামতে শুরু করেন। ওদিক থেকে দুজন লোক আসতে দেখলাম। তখন তিনি নীচে নামছিলেন। তোক দুজন নিকটে এসে পড়ে। আমি তাকে সতর্ক করার সুযোগ পাইনি। আমি আপনাকে খুঁজতে থাকি। কিন্তু মেহমানদের মধ্যে আসরে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
সাদিয়ার মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। তার মনে পড়ে যায়, সে একজন খৃস্টানকে হত্যা করে এসেছে। তার হুশ-জ্ঞান লোপ পাওয়ার উপক্রম হয়। এটি আলফ লায়লার রহস্যময় ও তেলেসমাতি জগত, যা সাদিয়ার মত মেয়ের বোধগম্যের বাইরে। তাকে হেরেমের একটি মেয়ে সাবধানও করেছিল যে, একজন রক্ষীসেনার সঙ্গে এই প্রেমখেলা তোমার জন্য অকল্যাণ ডেকে আনবে।– একটি ভাবনা সাদিয়াকে অস্থির করে তুলতে শুরু করে যে, আনতানুনকে কে গ্রেফতার করাল? যে দুজন ব্যক্তি তাকে গ্রেফতার করল, তারা নিশ্চয় পূর্ব থেকেই জানত যে, আনতানুন এখানে আসবে। তারা বিষয়টা কিভাবে জানল? সাদিয়ার মনে আশংকা জাগতে শুরু করে, সেও গ্রেফতার হয়ে যাবে। চাকরানীর প্রতিও তার সন্দেহ জাগে যে, সেও গোয়েন্দাগিরি করতে পারে।
সাদিয়ার কিছুই বুঝে আসছে না। চাকরানীকে দিয়ে সে রশিটা খোলায় এবং লুকিয়ে ফেলতে বলে। তারপর চরম উৎকণ্ঠা ও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় সালার শামসুদ্দীন ও শাদবখত-এর উদ্দেশ্যে ছুটে যায়। নাচ-মদের আসর তখনো গরম। সাদিয়া শাদবখতকে পেয়ে যায়। আসরের অবস্থা দেখে তার মনে হল, খৃস্টান লোকটার খুন হওয়ার বিষয়টা এখনো কেউ টের পায়নি। সাদিয়া পা টিপে টিপে শাদবখত-এর নিকট চলে যায় এবং তাকে ইংগিতে ডাক দেয়। সাদিয়া তাকে আলাদা নিয়ে গিয়ে জানায়, আমি একজন খৃষ্টানকে খুন করে এসেছি। খুনের হেতুও জানায় সাদিয়া।
শাদবখত শংকিত হয়ে উঠেন যে, সাদিয়াকে খৃস্টান লোকটার সঙ্গে যেতে কেউ না কেউ নিশ্চয় দেখেছে! তার ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তিনি বললেন- তোমার আর এখানে থাকা ঠিক হবে না। যদি তুমি গ্রেফতার হয়ে যাও, তাহলে গোমস্তগীন তোমার ন্যায় রূপসীকেও বন্দিশালায় কি দশা ঘটাবে, তা আমার অজানা নয়। একজন খৃস্টানের খুনী যদি তার পিতাও হন, তবুও তিনি তাকে সামান্য ছাড় দেবেন না। তিনি একজন খৃস্টান কমান্ডারের মৃত্যুর ভয়ানক প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।
আমি যাব কোথায়? সাদিয়া কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে।
কিছু সময় এখানে ঘোরাফেরা কর- শাদবখত বললেন- শামসুদ্দীন ভাই আসলে তার সঙ্গে কথা বলব।
তিনি কোথায় আছেন? সাদিয়া ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে।
কিছুক্ষণ আগে আমরা সংবাদ পেলাম, কে একজন রশি বেয়ে পিছনের দেয়াল অতিক্রম করে ভিতরে ঢুকে পড়েছে। লোকটা কে এবং কী উদ্দেশ্যে ঢুকেছে, জানতে পারিনি। শামসুদ্দীন তাকে দেখতে এবং তার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে না আসলে আমি নিজে যাব। তুমি মনটা শক্ত রাখ। আমরা তোমাকে যেভাবে হোক লুকিয়ে ফেলব। শাদবখত জবাব দেন।
সাদিয়া ভাবে, ধৃত লোকটা আনতানুন ছাড়া আর কেউ নয়। সে কিছুটা নিশ্চিত হয় যে, আনতানুনকে সালার শামসুদ্দীনের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে এবং তিনি তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করবেন।
লোকটা আনতানুন-ই। দুজন সিপাহী তাকে গ্রেফতার করেছে। এ ধরনের লোকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা শামসুদ্দীনের বিভাগের দায়িত্ব। তাই সংবাদটা তাকেই দেয়া হয়েছে যে, দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করা অবস্থায় এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শামসুদ্দীন আসর থেকে উঠে বাইরে গিয়ে দেখেন, ধৃত লোকটা আনতানুন। শামসুদ্দীন তাকে চিনেন না ভান ধরে জিজ্ঞেস করেন- তুমি সম্ভবত রক্ষী বাহিনীর জওয়ান। দেয়াল অতিক্রম করে ভিতরে ঢুকলে কেন? সত্য সত্য বলে দাও; অন্যথায় মৃত্যুদন্ড হবে তোমার শাস্তি।
আনতানুন নীরব। শামসুদ্দীন তার প্রতি এ কারণে ক্ষুব্ধ যে, তিনি বলেছিলেন, সতর্ক থাকবে এবং আবেগকে কর্তব্যের উপর জয়ী হতে দেবে না।
কিন্তু আনতানুন সিনিয়রের এই নির্দেশনা মান্য করেনি। সে একদিকে যেমন যোগ্যতা দেখিয়েছে যে, এক চেষ্টায়-ই গোমস্তগীনের রক্ষী বাহিনীতে ঢুকে পড়েছে এবং পরক্ষণেই হেরেম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। অপরদিকে চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়ে অল্পতেই ধরা পড়ে গেল। আনতানুন যে কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়ল, একজন গুপ্তচরের জন্য তা গুরুতর অপরাধ। কিন্তু তাকে সেই অপরাধের শাস্তি এখন দেয়া যাবে না। এ মুহূর্তে তাকে এখান থেকে রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি সাদিয়াকেও এখান থেকে বের করতে হবে। কেননা, আনতানুন সাদিয়ার ডাকে এসেছে এবং সাদিয়া-ই রশি ঝুলানোর ব্যবস্থা করেছে, এ তথ্য ফাস হয়ে যেতে পারে।
