এখন গভীর রাত। ঘোর অন্ধকার। সাদিয়া চাকরানীকে দিয়ে দেয়ালের রশিটা বেঁধে রাখে। দেয়ালের ভিতর দিকে একটি গাছ আছে। আনতানুন বাহির থেকে রশি বেয়ে উপরে উঠে আবার সেই রশির অপর মাথা বেয়ে দেয়ালের ভিতর নীচে নেমে গাছটার আড়ালে লুকিয়ে থাকবে।
এই আসরে বাহির থেকে অনেক উন্নত নর্তকী আনা হয়েছে। আমদানী করা হয়েছে অল্প বয়স্ক কটি সুশ্রী বালককে। তারা অর্ধ উলঙ্গ হয়ে বিশেষ ধরনের নাচ নাচছে। হেরেমের সব কটি মেয়ের প্রতি গোমস্তগীনের নির্দেশ, যে কোন মূল্যে হোক, সব কজন মেহমানকে পুরোপুরি আয়ত্ত্বে নিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে। তাদেরকে এই আসরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। মদের মটকার মুখ খুলে দেয়া হয়েছে। সাদিয়াও স্বাধীনভাবে যে কারো সঙ্গে মিশছে ও হাসিমুখে কথা বলছে।
আসরের রওনক ও আনন্দ-ফুর্তির মাত্রা বেড়ে চলছে। পাশাপাশি সাদিয়ার অস্থিরতাও বাড়ছে। কারণ, আনতানুনের এসে পড়ার সময় হয়ে গেছে। এ মুহূর্তে সে একজন খৃষ্টান কমান্ডারের সঙ্গে আলাপে মত্ত। এই খৃস্টান লোকটা অনর্গল আরবী বলতে পারে। সাদিয়া সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে কথা বলছে, যাতে তার মনের কথা বের করা যায়। হয়েছেও তা-ই। তারা সুলতান আইউবীকে কিভাবে খতম করবে, তার বিবরণ দেয় সাদিয়াকে। এই সুযোগে সে সাদিয়ার ঘনিষ্ঠতা লাভ করার চেষ্টা করে। সাদিয়া তাতে বাধা দেয়নি। মূল্যবান তথ্য হাসিল করছে সে। খৃস্টান লোকটা কথা বলতে বলতে আসর থেকে উঠে তাকে আড়ালে নিয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে সে সাদিয়াকে নিয়ে বাগানে চলে যায়। বাগানটা অন্ধকার। সেখানে গিয়ে সাদিয়া অনুভব করে, আনতানুন এসে পড়েছে। সাদিয়া লোকটাকে বলল, চলুন ফিরে যাই। কিন্তু সে এখনই যেতে চাচ্ছে না।
খৃস্টান লোকটা সাদিয়ার বাহু জড়িয়ে ধরে টেনে ঘাসের উপর বসিয়ে দেয় এবং তার রূপের প্রশংসা করতে শুরু করে। সাদিয়া তাকে ঠেকাবার চেষ্টা করে। লোকটা নেশাগ্রস্ত। সে সাদিয়ার সঙ্গে যথেচ্ছ আচরণ করার চেষ্টা করলে সাদিয়া হাসিমুখে বলল- জান, আমি কার?
তার অনুমতি নিয়েই আমি এই দুঃসাহস দেখাচ্ছি- খৃস্টান বলল এবং সাদিয়াকে টেনে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বলল- তুমি যাকে তোমার স্বামী বলছ, সে তোমার স্বামী নয়, এই সত্যটা তুমিও জান। সে সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করে নিজে রাজা হওয়ার মানসে তার কথিত সবগুলো স্ত্রীকে এ রাতের জন্য আমাদেরকে হালাল করে দিয়েছে।
লোকটার কোন আত্মমর্যাদাবোধ নেই। সাদিয়া মনের ক্ষোভ দমন করে মুখের হাসি বহাল রেখে মনে মনে বলল। তার জানা আছে, এই খৃস্টান লোকটা যা বলছে, সবই সঠিক।
যে লোক নিজের ঈমান বিক্রি করতে পারে, সে নিজের স্ত্রী-বোন এবং কন্যার ইজ্জতও নীলাম করতে পারে। তুমি একটা বোকা মেয়ে। ফুর্তি করতে আপত্তি করছ কেন? আবার কিনা বলছ, মদপান কর না?
দুটি বিষয় সাদিয়াকে ভাবিয়ে তুলছে। এক. আনতানুন এসে পড়েছে। দুই. এই খৃস্টানটার কবল থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। গোমস্তগীন যদি মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হতেন, তাহলে সাদিয়া তার নিকট ছুটে গিয়ে আশ্রয় নিত এবং বলত, অমুক আমার প্রতি হাত বাড়িয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো। যে কোন মূল্যে মেহমানদের সন্তুষ্ট করা গোমস্তগীনের হেরেমের মেয়েদের কর্তব্য। কোন মেহমানকে। বিশেষত, কোন খৃস্টান কমান্ডারকে অখুশী করা গোমস্তগীনের নির্দেশ অমান্য করার নামান্তর। লোকটা তার স্ত্রীদের ইজ্জতের বিনিময়ে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে সামরিক সাহায্য গ্রহণ করছে। এমতাবস্থায় সাদিয়া খৃস্টান, লোকটার মুখে থু থু ছিটাতেও পারছে না, তাকে ত্যাগ করে পালাতেও পারছে না। কিন্তু এসব বাধ্য-বাধকতা সত্ত্বেও সাদিয়া তার সম্ভ্রম বিকাতে পারে না। কি, করবে, সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে সাদিয়ার পক্ষে।
আনতানুনের বিষয়টা প্রচন্ডভাবে ভাবিয়ে তুলছে সাদিয়াকে। চরম আকার ধারণ করেছে সাদিয়ার অস্থিরতা। তার এই মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যেই লোকটা তার সঙ্গে অসদাচরণ শুরু করে দেয়। সাদিয়া লাফিয়ে ওঠে। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায় তার। মেয়েটা ঘাসের উপর বসা ছিল। সে খৃস্টানটাকে সজোরে ধাক্কা মারে। লোকটা চীৎ হয়ে পড়ে যায়।
নারীরা অবলা। কিন্তু যদি তার মধ্যে আত্মমর্যাবোধ জেগে ওঠে, তাহলে সে বিশাল পাথরখন্ডকেও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারে। খৃস্টান লোকটা নেশাগ্রস্ত। সে সাদিয়ার এই আচরণকে ঠাট্টা মনে করে খিলখিল করে হেসে ওঠে। নিকটে মাটির বড় একটি পাত্র রাখা ছিল। রাগে-ক্ষোভে পাগলের মত হয়ে গেছে সাদিয়া। সে পাত্রটি হাতে তুলে নেয়। অত্যন্ত ভারি বস্তু। সাদিয়া সেটা উপরে তুলে লোকটার মুখের উপর ছুঁড়ে মারে। চীৎ হয়ে শুয়ে থাকা অবস্থায়-ই খিলখিল করে হাসছিল সে। ভারি গামলাটা তার কপালে গিয়ে আঘাত হানে। সঙ্গে সঙ্গে অট্টহাসি থেমে যায়। সাদিয়া গামলাটা আবার তুলে নেয়। লোকটা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। সাদিয়া পাত্রটা তার মাথার উপর ধরে আস্তে করে ছেড়ে দেয় এবং নিজে সেখান থেকে সরে গিয়ে পিছনের বাগিচায় চলে যায়।
আসরে মদপানের ধারা চলছে। নাচ-গান এখন তুঙ্গে। কে বেঁচে আছে আর খুন হল, সে খবর কারো নেই। সাদিয়া এখন এই ঝামেলা থেকে মুক্ত। আনতানুনের ভালবাসার নেশা তাকে ভুলিয়ে রেখেছে যে, সে এক ব্যক্তিকে খুন করে এসেছে এবং লোকটা খৃস্টান। সে অত্যন্ত গর্বের সাথে আনতানুনকে এসংবাদটা দেয়ার জন্য উদগ্রীব যে, আমি আমার ইজ্জত রক্ষার্থে একজন খৃস্টানকে খুন করে এসেছি।
