সালার শাসসুদ্দীন ও শাদবখত গোমস্তগীনকে একথা বললেন না, যে, মুসলমানের বিরুদ্ধে মুসলমানের লড়াই না করা উচিত আর খৃস্টানরা মূলত আমাদের দুশমন। তারা আমাদেরকে সাহায্য করার কথা বলে বলে প্রতারণা করবে-সাহায্য দেবে না। তারা একথাও স্মরণ করিয়ে দিল না যে, আল মালিকুস সালিহ খৃস্টান সম্রাট রেমন্ডকে সোনা-দানী দিয়ে চুক্তি করেছিল, সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলে রেমন্ড আইউবীর উপর পিছন দিক থেকে হামলা করবেন। সুলতান যখন হাল্ব অবরোধ করেন, তখন রেমন্ড বাহিনী এসে পড়ে। কিন্তু সুলতান আইউবীর কমান্ডো বাহিনী তাকে প্রতিহত করে এবং তিনি যুদ্ধ না করেই ফিরে যান।
শাসসুদ্দীন ও শাদবখত কোন প্রসঙ্গেই গোমস্তগীনের সঙ্গে দ্বিমত করলেন না। বরং তাকে সমর্থন জানালেন এবং পরামর্শ দিলেন যে, এ সময়ে সুলতান আইউবী আলরিস্তানের পাহাড়ী এলাকায় বসে আছেন। এই পর্বতমালায় হামাতের শিং নামক যে উপত্যকা আছে, তাকে যুদ্ধক্ষেত্র বানানো গেলে আইউবীকে পরাজিত করা যেতে পারে। তারা পরামর্শ দেয়, হ্যাঁ, আমরা স্বাধীনভাবেই লড়াই করব; কিন্তু খৃস্টানদের থেকে সাহায্যও গ্রহণ করব।
আমি সংবাদ পাচ্ছি, আমার এখানে নাকি সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচর আছে এবং তারা আমাদের প্রতিটি সংবাদ তাকে পৌঁছিয়ে দিচ্ছে- গোমস্তগীন বললেন- আপনারা সতর্ক থাকুন, চারদিক কান রাখুন এবং তদন্ত করুন।
সে কথা আপনার বলতে হবে না- শাদবখত বললেন- সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক কত শক্ত ও বিস্তৃত, আমাদের জানা আছে। এখানে আমরাও আমাদের গোয়েন্দা ছড়িয়ে রেখেছি। কোন সন্দেহ দেখা দিলেই তারা আমাদেরকে অবহিত করবে।
এ ক্ষেত্রে আমি বড় কঠিন মানুষ- গোমস্তগীন বললেন- যদি আমার পুত্রের ব্যাপারেও সন্দেহ জাগে যে, সে শত্রুর হয়ে গোয়েন্দাগিরি করছে, তাহলে তাকেও আমি পিঞ্জিরায় বন্দি করব- এক বিন্দু দয়া করব না।
গোমস্তগীন যে দুসালারের সঙ্গে এত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন, তারা যে সুলতান আইউবীর গুপ্তচর, তা তার কল্পনায়ও নেই। এরা দুজন অত্যন্ত বিপজ্জনক গোয়েন্দা। অথচ, এরা গোমস্তগীনের সেনা অধিনায়ক। গোমস্তগীনের বাহিনীর কমান্ড তাদের হাতে।
গোমস্তগীন থেকে আলাদা হয়ে শামসুদ্দীন ও শাদবখত পরিকল্পনা ঠিক করেন, তারা যখন ফৌজ নিয়ে সুলতান আইউবীর মোকাবেলায় যাবেন, তখন তারা তাদের অগ্রযাত্রা সম্পর্কে আগেই সুলতানকে জানিয়ে দিবেন। আইউবী উপযুক্ত স্থানে তাদেরকে ঘিরে ফেলবেন এবং তারা আত্মসমর্পন করবে।
দুভাই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত পরিকল্পনা করতে থাকেন এবং খুটিনাটি প্রতিটি দিক নিয়ে বিশ্লেষণ করেন। গোমস্তগীন কোনদিন আক্রমণ চালাবেন, তা এখনো তারা জানেন না। তাকে দ্রুত হামলা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
***
গোমস্তগীনের বাসভবন প্রহরার দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে আনতানুনের। এখন আর এখানে নেই সে। সাদিয়া তাকে কিছু কাজের কথা বলেছিল। এখন সাদিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা দুরুহ হয়ে পড়েছে তার। অথচ, মেয়েটির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য প্রতি মুহূর্ত অস্থিরতার মধ্যে কাটাচ্ছে সে। তার কারণ দুটি। প্রথমত, কর্তব্য পালন। দ্বিতীয়ত, হৃদয়ের টান।
মহলের এক চাকরানীকে হাত করে নিয়েছে সাদিয়া। একদিন তার মাধ্যমে সে আনতানুনকে সংবাদ পাঠায়, যেন আজ রাতে সে ঠিক আগের সময় উক্ত বাগানে চলে আসে। প্রধান ফটক অতিক্রম করে বাগানে প্রবেশ করা অসম্ভব। বাগানের পিছনে একটি উঁচু দেয়াল আছে। সাদিয়া আলতানুনকে বলে পাঠায়, দেয়ালের বাইরে একটি রশি ঝুলান থাকবে। সেই রশি বেয়ে ভিতরে ঢুকে পড়বে।
সে রাতে মহলে নিমন্ত্রণের আয়োজন ছিল। যুদ্ধে সহযোগিতা করতে পারে এজাতীয় বহু লোককে গোমস্তগীন দাওয়াত করেছেন। তাদের মধ্যে আছে বেশ কজন খৃস্টান কমান্ডার। মসুল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে কয়েকজন মুসলিম সেনা অফিসারও এসেছেন। গোমস্তগীন এমন কজন বেসামরিক লোককেও দাওয়াত করেছেন, যাদের কাছে বিপুল অর্থ আছে। এই মেহমানদের থেকে যুদ্ধের জন্য সহযোগিতা নিতে চাইছেন গোমস্তগীন। সালার শামসুদ্দীন এবং শাদবখতও ভোজসভায় উপস্থিত আছেন গোমস্তগীনের কাজী ইবনুল খাশিব আবুল ফজলও।
আসরটাকে পুরোপরি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে সাদিয়া। এজাতীয় আসর-সভায় তার গুরুত্ব অপরিসীম। সে তার ইচ্ছার বিপরীতে এমনভাবে সাজগোজ করে, যা উপস্থিত মেহমানদেরকে চুম্বকের ন্যায় আকর্ষণ করছে। এমনিতেই মেয়েটির রূপ-যৌবনের স্বতন্ত্র এক আকর্ষণ আছে। তার উপর এত সাজসজ্জা! নারীলোলুপ পুরুষদেরকে পাগল করে তুলছে সাদিয়া। মেয়েটি এখান থেকে সেখানে হরিণীর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রত্যেক মেহমানের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছে। এরই মধ্য দিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলছে সে। কোন খৃস্টান কিংবা মুসলিম সেনা অফিসারকে কথা বলতে দেখলেই তার পার্শ্বে গিয়ে কান পেতে এমনভাবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে যে, তারা কিছুই বুঝতে পারছে না। সাদিয়া শামসুদ্দীন এবং শাদবখতের নিকটও গিয়ে দাঁড়ায় এবং একইভাবে হাসিমুখে কথা বলে। তারা সাদিয়াকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, কোন গোপন তথ্য পেয়ে গেলে আমাদেরকে জানাবে। আনতানুনের সঙ্গে বেশী দেখা-সাক্ষাৎ করবে না। কিন্তু আজ রাতই যে আনতানুনের সঙ্গে বাগানে তার সাক্ষাৎ হওয়ার কথা এবং সে মিলনটা একটু পরই ঘটতে যাচ্ছে, সে কথা গোপন রাখে সাদিয়া।
