আমি আরো কিছু জানি- সাদিয়ার হাসিতে তিরষ্কার নয়- ঘনিষ্ঠতার ভাব।
কে এসেছে?- শামসুদ্দীন অনুচ্চ স্বরে জিজ্ঞেস করে- তুমি কি জান, আমার সঙ্গে প্রতারণা করলে তোমায় কী সাজা হবে?
প্রতারণা নয়- সাদিয়া জবাব দেয়- আপনি হাঁটতে হাঁটতে প্রধান ফটকের নিকট চলে যান। সেখানে দুজন রক্ষীসেনা দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞাসা করবেন, জেরুজালেম থেকে কে এসেছে?
শামসুদ্দীন ফটকের নিকট চলে যান। ওখানে দুজন মোহাফেজ দাঁড়িয়ে আছে। শামসুদ্দীন তাদেরকে চিনেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন- জেরুজালেম থেকে তোমাদের কে এসেছে? আনতানুন সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে বলল, আমি। শামসুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন- তুমি যদি আলরিস্তান থেকে এসে থাক, তাহলে ওখানে বরফ গলছে।
আপনি আলরিস্তান যাচ্ছেন নাকি? আনতানুন জিজ্ঞেস করে।
ইচ্ছা তো এমনই। শামসুদ্দীন মুচকি হেসে জুবাব দেন।
শামসুদ্দীন নিশ্চিত হন যে, আনতানুন সত্যিই আইউবীর গোয়েন্দা। তিনি জিজ্ঞেস করেন- মেয়েটি ধোকা দিচ্ছে না তো?
না- আনতানুন জবাব দেয়- সাক্ষাতের সুযোগ করে দিন, সব কথা খুলে বলব।
***
সাক্ষাতের সুযোগ সৃষ্টি করে নেয়া হল। শামসুদ্দীন একজন সেনা অধিনায়ক। সুযোগ সৃষ্টি করা তার পক্ষে কোন ব্যাপার নয়। তিনি আনতানুনকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি সাদিয়াকে কিভাবে ফাঁদে ফেলেছ এবং তাকে কিভাবে বা বিশ্বাস করে আমাদের সাংকেতিক বাক্য বলে দিলে? আনতানুন তাকে ঘটনাটা ইতিবৃত্ত শোনায় যে, মেয়েটির সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ কিভাবে হয় এবং তার সঙ্গে কি কি কথা হয়।
আমি একটি আশংকা অনুভব করছি- শামসুদ্দীন বললেন- তুমি যুবক। সুদর্শন ও স্বাস্থ্যবান। মেয়েটিও যুবতী এবং অতিশয় সুন্দরী। আমি কর্তব্যের উপর আবেগের জয়ী হওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আবেগের বশবর্তী হয়ে দিনের বেলা এভাবে তার কক্ষে যাওয়া তোমার ঠিক হয়নি। তুমি সাবধানতা অবলম্বন করনি। মেয়েটির মনে ভালবাসা ও ঘনিষ্ঠতার পিপাসা আছে। তুমি তাকে ভালবাসাও দিয়েছ, ঘনিষ্ঠতাও দিয়েছ। এরূপ মেয়েদের আবেগ স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক হয়ে থাকে। আমার ভয় হচ্ছে, তুমি তোমার কর্তব্যকে আবেগের আতিশয্যে ধ্বংস করে দেবে। আমি তোমার ঈমানের পরীক্ষা নিতে চাই।
আমি আমার উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষে তাকে আসক্ত বানিয়েছি- আনতানুন বলল- তবে আমি মিথ্যা বলব না। এই মেয়েটি আমার মন জয় করে নিয়েছে। আমি আপনাকে আল্লাহ ও তার রাসূলের শপথ করে নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, এই ভালবাসা আমার কর্তব্যের উপর জয়ী হতে পারবে না।
তারপর শামসুদ্দীন ও আনতানুনের মাঝে কিছু কাজের কথা হয়। সালার শামসুদ্দীন গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপদেশ দিয়ে আনতানুনকে বিদায় করে দেন।
সেদিনই শামসুদ্দীন তার ভাই শাদবখতকে জানালেন, সুলতান আইউবী এখানে একজন লোক পাঠিয়েছেন। তার নাম আনতানুন। সে এই মহলের-ই মোহাফেজ দলে ঢুকে পড়তে সক্ষম হয়েছে।
শামসুদ্দীন ও শাদবখতের ব্যক্তিগত দুই রক্ষীসেনা, তাদের আরদালী এবং দুজন চাকরও সুলতান আইউবীর যুদ্ধবাজ গোয়েন্দা। সালারদ্বয় তাদেরকে জানায়, তোমাদের আরো একজন সঙ্গী এখানে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু লোকটা নিজেই নিজেকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। দুর্গপতির ব্যক্তিগত বাসভবনের একটি মৎস শিকার করে নেয়া তার বিরাট সাফল্য। কিন্তু সে বিপদমুক্ত নয়। শামসুদ্দীন তার সঙ্গীদেরকে বিষয়টা বিস্তারিত বুঝিয়ে দিয়ে বললেন- এখন পর্যন্ত হাররানে আমাদের কোন গোয়েন্দা ধরা পড়েনি। আমার ভয় হচ্ছে, আনতানুন ধরা পড়ে যাবে। তার প্রতি আমাদের নজর রাখতে হবে। আর আমাদেরও প্রস্তুত থাকতে হবে। লোকটা যদি ধরা পড়ে যায়, তাহলে আমাদের জন্য অপমান। তাছাড়া নির্যাতনে বাধ্য হয়ে সে আমাদের সকলের নামও বলে দিতে পারে। আমি বেশি চিন্তা করি সুলতান আইউবীর কথা। তিনি বলবেন, দুজন সালার আর ছয়জন যোদ্ধা গোয়েন্দা একটা লোককে রক্ষা করতে পারলে না!
আপনারা এবং আমরা থাকতে আরেকজন লোক পাঠাবার কী প্রয়োজন ছিল? এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করে।
প্রয়োজন তা-ই ছিল, যা সে পূরণ করেছে- শামসুদ্দীন জবাব দেয় আমাদের গোমস্তগীনের হেরেম পর্যন্ত পৌঁছানো প্রয়োজন ছিল। যা হোক, এসব বাদ দাও। আমি জানি, এটা হাসান ইবনে আব্দুল্লাহর সিদ্ধান্ত, যা সম্পূর্ণ সঠিক। আমি তোমাদেরকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিলাম। তোমরা প্রস্তুত থাকবে। মেয়েটিকে অপহরণ করে আমাদের উধাও হওয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে। তোমরা তার জন্য প্রস্তুত থাকবে।
আমরা প্রস্তুত- সবাই বলল- প্রয়োজন শুধু সময়মত সংবাদ পাওয়া।
না, সময়মত সংবাদ পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে- শামসুদ্দীন বললেন এমনও হতে পারে, আমিও তখন টের পাব, যখন আনতানুন পিঞ্জিরায় আবদ্ধ থাকবে এবং তার হাড়-গোড় চুরমার হতে থাকবে।
***
কারো থেকে সাহায্য না নিয়ে আমাদের লড়াইটা আমরা স্বাধীনভাবে লড়তে চাই। তোমরা কী বল?- গোমস্তগীন সালার শাসসুদ্দীন ও শাদবখতকে জিজ্ঞেস করেন- তোমরা তো জান, আমরা যারা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি, সংখ্যায় নগন্য। আমরা বাহ্যত যদিও ঐক্যবদ্ধ; কিন্তু মূলত একজনের মন এক দিকে। খলীফা আল-মালিকুস সালিহ বাচ্চা মানুষ। তিনি কতিপয় আমীরের কথায় উঠাবসা করছেন। তারা সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করো তাকে ছুঁড়ে ফেলতে এবং নিজেরা স্বাধীন শাসকে পরিণত চাচ্ছে। মসুলের শাসনকর্তা সাইফুদ্দীন আমার বন্ধু এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর শক্র। কিন্তু তিনি একটি স্বতন্ত্র রাজ্যের স্বাধীন শাসক হতে চান। আপনারা তো জানেন, আমি হাররানের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক সৈন্য রিকুট করেছি। আমি খৃস্টান সম্রাট রেজিনাল্ট এবং তার সকল যুদ্ধবন্দীকে এই শর্তে মুক্তি দিয়েছিলাম যে, আমি যখন সালাহুদ্দীন আইউবীর মোকাবেলায় অবতীর্ণ হব, তখন তারা সরাসরি আমার সহযোগিতা না করলেও পিছন কিংবা পার্শ্ব থেকে সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর হামলা করবে অথবা তাকে আক্রমণের ধোকা দিয়ে তার দৃষ্টি আমার থেকে অন্যদিকে সরিয়ে দেবে। আমি আশা করছি, আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করতে পারব। তিনি খৃস্টানদেরকে পিছনে হটিয়ে দিতে পারেন। কেননা, খৃস্টানরা তার রণকৌশল জানে না। আমরা তো বুঝি। আমরাও মুসলমান। তার বাহিনী যদি প্রাণপণ লড়তে পারে, তো আমরাও তদপেক্ষা বেশি বীরত্বের প্রমাণ দিতে পারব। আইউবী প্রথমবার যখন হাব আক্রমণ করেছিলেন, তখন হাবের মানুষ তাকে চরম শিক্ষা দিয়েছিল। তা থেকেই আমার সাহস বেড়ে গেছে।
