মেয়েটি আনতানুনের ডান হাতটা নিজের দুহাতে চেপে ধরে টেনে নিয়ে চুমো খায়। তারপর আবেগজড়িত কণ্ঠে বলল- তুমি আমাকেও দ্রুপ শক্ত পাবে। বল, আমি কী করব?
আনতানুন মেয়েটিকে সবক দিতে শুরু করে- তুমি গান-বাদ্য ও মদের প্রতিটি আসরে উপস্থিত থাকবে। খৃস্টানদের ঘনিষ্ট হয়ে তাদের কথা-বার্তা শুনবে। প্রয়োজন হলে দু-এক চুমুক পানও করবে। তাদের সামনে সুলতান আইউবীকে মন্দ বলবে। এভাবে এই সালারদের মনের কথা বের করে আনবে যে, তাদের সামরিক পরিকল্পনা কী। খৃস্টানদের কথা-বার্তা মনোযোগ সহকারে শুনবে।
আনতানুন তাকে হিন্দুস্তান থেকে আসা দুসালার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে।
শামসুদ্দীন আলী ও শাদবখত আলীকে আমি ভালভাবেই চিনি- মেয়েটি। বলল- গোমস্তগীন তাদের ছাড়া এক পাও হাঁটতে পারেন না। তারা প্রায়ই এখানে আসেন এবং রং-তামাশায় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু তারা মদপান করেন না।
তুমি তাদের ঘনিষ্ট হয়ে যাও- আনতানুন বলল- কথা প্রসঙ্গে তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে, আলরিস্তানে বরফ গলছে কি? তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করবে, তুমি আলরিস্তান যাচ্ছ নাকি? তুমি মুচকি হেসে বলবে, ইচ্ছা আছে। তারপর তারা তোমাকে আরো কিছু কথা জিজ্ঞাসা করবে। সম্ভবত জিজ্ঞাসা করবে, ওদিক থেকে কে এসেছে? তুমি বলবে, তিনি আপনাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
আমি কিছুই বুঝলাম না- মেয়েটি বলল।
সবই বুঝবে- আনতানুন বলল- আমি তোমাকে কখনো এসব ঝামেলায় ফেলতাম না সাদিয়া! কিন্তু কর্তব্যের দাবি, প্রিয়তম বস্তুটিকেও কর্তব্যের পথে কোরবান করে দেই। তুমি আমাকে কোরবানী করে দাও, আমি তোমাকে কোরবান করে দেব। ভয় পেও না সাদিয়া! জানা নেই, ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কিরূপ বিপদ ও কিরূপ পরীক্ষা নিয়ে আসছে। আমরা দুজন যদি বন্দীশালার জাহান্নামে চলে যাই, কিংবা যদি নিহত হই, তবু আমাদের রক্ত বৃথা যাবে না। মহান আল্লাহ আমাদেরকে ভুলবেন না। মনে রেখ, রক্ত ছাড়া ইসলামকে হেফাজত করা যায় না।
তুমি আমাকে দৃঢ়পদ পাবে- সাদিয়া বলল- তুমি আমার সেই চেতনাটাও জীবিত করে দিয়েছ, যার ব্যাপারে আমি মনে করতাম, সে মরে গেছে।
***
আনতানুন ফিরে যায়। সাদিয়া তার প্রতি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। আনতানুন দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলে সাদিয়া অনুভব করল, এখানে সে একা নয়- তার পার্শ্বে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। চকিতে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় সাদিয়া। হেরেমের-ই একটি মেয়ে দন্ডায়মান। সাদিয়ার-ই ন্যায় রূপসী যুবতী সে। মেয়েটি বলল- সাদিয়া! তুমি কি এই ভালবাসার পরিণতি চিন্তা করে দেখেছ? তুমি স্বাধীন নও। আমার আবেগ-চেতনাও তোমারই ন্যায়। আমিও খাঁচা ভেঙ্গে উড়ে যেতে চাই। কিন্তু এটা সম্ভব নয়। আমাদের ভাগ্যে যা লেখা ছিল, আমরা পেয়ে গেছি। আমাদের মনের বাসনাকে অবদমিত করে চলতে হবে। আর চিত্তবিনোদনের একটা উপায় যদি বের করতেই হয়, তাহলে লোক অনেক আছে। একজন রক্ষীসেনাকে তুমি এত বড় মর্যাদা দিও না।
কোন্ রক্ষীসেনার কথা বলছ?- সাদিয়া মুখে বিস্ময়ের ভাব ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করে- তুমি কী বলছ?
দেখ, আমি তোমাদের কথোপকথন পুরোটাই শুনেছি- মেয়েটি বলল আমার থেকে কিছুই লুকাবার চেষ্টা কর না। তার সঙ্গে তুমি যে সওদা করেছ, তার মূল্য অনেক।
মেয়েটি চলে যায়। সাদিয়া চিন্তিত মনে ওখানেই অন্ধকারে পায়চারি করতে থাকে।
সাদিয়ার মনে পড়ে যায়, আনতানুন তাকে বলে গেছে, আজ থেকেই কাজ শুরু করে দাও। তার একথাটিও মনে পড়ে যায় যে, সে আনতানুনকে বলেছিল, তুমি আমাকে দৃঢ়পদ পাবে। কিন্তু সাদিয়া একটি অনভিজ্ঞ মেয়ে। তার জানা নেই যে, পাপের এই রহস্যময় ভূবনে সে কত বড় ঝুঁকি মাথায় তুলে নিয়েছে।
দু-তিনদিন পর সালার শামসুদ্দীন ও শাদবখত-এর সঙ্গে সাদিয়ার সাক্ষাৎ ঘটে। গোমস্তগীন নাচ-মদের আসরে দুনিয়ার স্বাদ উপভোগ করছেন। সালার, খৃস্টান উপদেষ্টামন্ডলী ও ঊর্ধ্বতন অফিসারদেরকে হাতে রাখার জন্য গোমাগীন এই আসরের আয়োজন করে থাকেন। এই দু-তিন দিনের সাক্ষাতে আনতানুন সাদিয়াকে প্রশিক্ষিত করে তুলেছে। বিনোদনের এই আয়োজনটা তাকে করতে হয়।
আজকের আসরে সাদিয়া বেজায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। গোমস্তগীন যুগপৎ বিস্মিত ও আনন্দিত যে, মেয়েটার মধ্যে পরিবর্তন এসে গেছে। সাদিয়া আসরের বাইরে হাসিমুখে একজনের সঙ্গে কথা বলছে। পরক্ষণে সালার শামসুদ্দীনের নিকট গিয়ে দাঁড়িয়ে যায় এবং এ-কথা ও-কথা বলার পর জিজ্ঞেস করে আলরিস্তানে বরফ গলছে কি?
সালার শামসুদ্দীন চমকে ওঠেন। গোমস্তগীনের ন্যায় অতিশয় বিচক্ষণ ও কঠিনপ্রাণ দুর্গপতির হেরেমের কোন মেয়ের মুখ থেকে এমন কথা বের হতে পারে, শামসুদ্দীনের ধারণা ছিল না। কেননা, বাক্যটা সুলতান আইউবীর গুপ্তচরদের সাংকেতিক বাক্য। এই কোড বাক্য দ্বারা তারা পরস্পর পরিচয় লাভ করে থাকে। গোয়েন্দা ছাড়া অন্য কারো এই বাক্যটি জানা থাকার কথা নয়। শামসুদ্দীনের এও জানা আছে যে, এই দুর্গে কোন গোয়েন্দা বন্দী নেই, যে এই গোপন সংকেত বলে দিতে পারে। তিনি সংকেতের পরবর্তী বাক্য উচ্চারণ করলেন- তুমি আলরিস্তান যাচ্ছ নাকি?
সাদিয়া মুচকি হেসে বলল- ইচ্ছা তো এমনই।
শামসুদ্দীন কথা বলতে বলতে সাদিয়াকে নির্জনে নিয়ে যায়। অন্য সবাই মদ নারীতে ডুবে আছে। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন- তুমি কি জান, আমি সালার?
