তুমি এখান থেকে পালাতে চাও কেন?- আনতানুন জিজ্ঞেস করে স্বামী তোমাকে দাসীর মত করে রেখেছে, সেজন্য, নাকি স্বামী বৃদ্ধ, সেকারণে? নাকি লোকটি সুলতান আইউবীর বিরোধী, সেজন্য?
আমি লোকটাকে ঘৃণা করি- মেয়েটি জবাব দেয়- যে কটি কারণে আমি এখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তা তুমি নিজেই বলে ফেলেছ। লোকটা আমাকে দাসীর ন্যায় হেরেমে আবদ্ধ করে রেখেছে। তাছাড়া সে বৃদ্ধও। সবচে বড় কারণ, গোমস্তগীন সুলতান আইউবীর দুশমন, খৃস্টানদের, দোস্ত। তার হেরেমে আসার আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমি বিয়ে করব না। নুরুদ্দীন জঙ্গীর নিকট গিয়ে বলব, আপনি আমাকে যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করুন। আমি খৃস্টানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাই। আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর নাম জানতাম। তীরন্দাজী এবং নিশানামত বর্শা নিক্ষেপ করা শিখেছি। কিন্তু দেশদ্রোহী ও ইসলাম বিরোধী এই লোকটার হেরেমে আবদ্ধ করে আমার সেই চেতনাকে মদের পেয়ালায় ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে। আশা করি, তুমি বিশ্বাস করবে, এই দুর্গে এসে প্রথমে আমি খুশী হয়েছিলাম যে, আমি এমন একজন বীর যোদ্ধার স্ত্রী হয়ে এসেছি, যিনি খৃস্টানদের বিরুদ্ধে নিজের জীবনকে কোরবান করে দিয়েছেন। কিন্তু নুরুদ্দীন জঙ্গীর ওফাতের পরক্ষণেই লোকটা সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
তিনি কি কখনো সুলতান আইউবীর মুখোমুখি হয়েছেন আনতানুন জিজ্ঞেস করে।
হননি- মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন- মেয়েটি জবাব দেয় লোকটা গভীর পানির মাছ। খলীফা আল-মালিকুস সালিহ ও তার দরবার আমীরগণ তার বন্ধু। তারা সবাই সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। গোমস্তগীন তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন যে, তিনি তাদেরকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করবেন। তিনি চাচ্ছেন, খৃস্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে স্বাধীনভাবে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। যুদ্ধ করে বিপুল এলাকা দখল করে নিতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী। তা-ই যদি হয়, তাহলে তিনি হাররান এর অন্যান্য বিজিত এলাকার সম্রাট হয়ে যাবেন।
তুমি কি কখনো তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছ?
বলেছি- মেয়েটা জবাব দেয়। তিনি আমাকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেছেন। আমি সুলতানকে আমার পীর বলে মান্য করি। গোমস্তগীনের বক্তব্য আমার মধ্যে কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। ফলে তারপর থেকেই তিনি আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেন। তিনি আমাকে মারধরও করতেন। এক পর্যায়ে তিনি আমাকে বললেন- তুমি সুলতান আইউবীর এলাকায় চলে যাও। তুমি যুবতী মেয়ে, রূপসীও। আইউবীর তিন-চারজন সালারকে তোমার রূপের ফাঁদে ফেলে তার বিপক্ষে দাঁড় করাও। তিনি আরো বললেন- আমি তোমার সঙ্গে আরো দুটি বিচক্ষণ ও সুন্দরী মেয়ে দেব। তারা হবে খৃস্টান। চেষ্টা করলে তিনজন মিলে পাহাড়কেও অনুগত বানিয়ে ফেলতে পারবে। তিনি আমাকে কৌশল শিখিয়ে দিয়ে বললেন- যাও, তুমি গিয়ে গোয়েন্দাগিরি কর। যদি সাফল্য দেখাতে পার, তাহলে তোমার পরিবারকে আমি বিপুল সোনা-দানা দান করব। তারা তোমাকে এখন মুক্ত করে নিয়ে সম্ভ্রান্ত কোন পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দিবে। কিন্তু আমি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করি।
কেন, তুমি প্রস্তাবটা মেনে নিতে! আনতানুন বলল- এখান থেকে বেরিয়ে তুমি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট চলে যেতে।
ঐ শয়তানটা আর তার খৃস্টান বন্ধুরা- মেয়েটি বলল- এমন ব্যবস্থা করে রেখেছে যে, কোন মেয়ে কিংবা পুরুষ গুপ্তচর যদি তাদের শত্রুর এলাকায় গিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে তাকে হয়ত অপহরণ করে নিয়ে আসে নতুবা ওখানেই খুন করে ফেলে। হাসান ইবনে সাব্বাহর ঘাতক দলের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক আছে। আমার আত্মা মরে গিয়েছিল। রয়ে গিয়েছিল শুধু দেহটা। একবার ভেবেছিলাম, তুমি যা বলেছ, সে ভাবেই মরব। কিন্তু সাহস হয়নি। অবশেষে আমি তোমাকে দেখলাম। তুমি আমার ঘনিষ্ঠ হয়েছ। এখন আমার আত্মা পুনরায় জীবন লাভ করল। তোমার অনুগ্রহ আমি জীবনেও ভুলব না যে, তুমি আমাকে তোমার হৃদয়ে স্থান দিয়েছ। কিন্তু এতটুকুই যথেষ্ট নয়। আস, আমরা এখান থেকে বেরিয়ে যাই।
তুমি এখানেই- এই দুর্গেই খৃস্টান ও সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পার।
তা কিভাবে?
তোমার মনিব গোমস্তগীন যেমন তোমাকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর এলাকায় পাঠাতে চান, দ্রুপ সুলতান আইউবীরও গুপ্তচর প্রয়োজন, যারা এখানে অবস্থান করে তাকে এদের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করবে।
তুমি কিভাবে জানলে যে, সুলতান আইউবীর গুপ্তচর প্রয়োজন? মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
আমি স্বয়ং সুলতান আইউবীর প্রেরিত গোয়েন্দা। আনতানুন বলল। শুনে মেয়েটি এমনভাবে চমকে উঠে, যেন কেউ তার বুকে খঞ্জরের আঘাত হেনেছে।
কী, অবাক্ হলে? মিথ্যা বলিনি। আমি জেরুজালেম থেকে নয়- কায়রো থেকে এসেছি। আমার কোন বোনও অপহরণ হয়নি।
তাহলে তো যেখানে তুমি এতগুলো মিথ্যা বলেছ, সেখানে তোমার এই দাবিও মিথ্যা যে, তুমি আমাকে ভালবাসা দিয়েছ!- মেয়েটি বলল- তোমার প্রেম, তোমার প্রতিশ্রুতি সবই মিথ্যা!
আমি যে তোমাকে ভালবাসি, তার প্রমাণ হল, আমি আমার গোপনীয়তা তোমাকে ফাঁস করে দিয়েছি- আনতানুন বলল- এক কথায় বলতে পার, আমি আমার জীবনটা তোমার দুহাতে অর্পণ করেছি। এখন তুমি গোমস্তগীনকে আমার আসল পরিচয় বলে দিয়ে আমাকে খুন করাতে পার। কোন গুপ্তচর তার আসল পরিচয় ফাঁস করে না। কিন্তু তোমার আবেগ ও ভালবাসা আমাকে বাধ্য করেছে তোমাকে আমার আসল পরিচয়টা বলে দিতে। আমি তোমার প্রতি আমার ভালবাসার দ্বিতীয় প্রমাণ তখন দেব, যখন আমি এখানকার কর্তব্য সম্পাদন করে ফিরে যাব। আমি একা যাব না- তোমাকে নিয়ে যাব। তবে একটি কথা স্পষ্ট শুনে রাখ, যদি কখনো তোমার ভালবাসা আর আমার কর্তব্যের মাঝে সংঘাত সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ যদি আমি এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে পড়ি যে, হয়ত তোমাকে বরণ করে নেব, নতুবা দায়িত্ব পালন করব, তাহলে আমি দায়িত্বকেই প্রাধান্য দেব। তোমার সঙ্গে আমি প্রতারণা করব না- তোমার ভালবাসাকে কোরবান করে দেব। তুমি হয়ত জান না, একজন গুপ্তচরের কর্তব্য তার নিকট থেকে কিরূপ কোরবানী দাবি করে। একজন সৈনিক যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করে জীবন দেয়। বন্ধুরা তার লাশটাকে পরিজনের নিকট পৌঁছিয়ে দেয় এবং সম্মানের সাথে দাফন করে। কিন্তু গোয়েন্দা নিহত হয় না- বন্দী হয়। দুশমন তাকে কয়েদখানায় নিয়ে এমন সব নির্যাতন করে, যা শুনলে তুমি অজ্ঞান হয়ে যাবে। গুপ্তচর মরেও না, বাঁচেও না। গুপ্তচরের জন্য লোহার ন্যায় শক্ত ঈমান আবশ্যক। আমি তেমনই ঈমান নিয়ে এসেছি। আমি তোমার সঙ্গে ভালবাসার সম্পর্ক স্থাপন করেছি বটে; কিন্তু আমি লোহার ন্যায় শক্ত থাকব, ঈমান থেকে একবিন্দু নড়তে পারব না।
