ওখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে- মেয়েটি জবাব দেয়- মদের ঘ্রাণে আমার মাথা ধরে যায়।
আপনি মদপান করেন না?- আনতানুন জিজ্ঞেস করে।
না- মেয়েটি জবাব দেয়- এখানকার কোন কিছুতেই আমি অভ্যস্ত নই। তুমি বস। মেয়েটি একটি পাথরের উপর বসতে বসতে বলল।
আমি একজন রাণীর সমান হওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারি না- আনতানুন বলল- কেউ যদি দেখে ফেলে?
যারা দেখবে, তারা মদে মাতাল হয়ে আছে- মেয়েটি বলল- তুমি বস এবং বোনদের কাহিনী শোনাও।
আনতানুন তার বিদ্যার পরাকাষ্ঠা দেখাতে শুরু করে। মেয়েটি তার ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে। আনতামুনের বোনদের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে সে নিজের কথা বলতে শুরু করে। আনতানুন তার মনের সব গরিমা পানি করে দিয়েছে। এক পর্যায়ে আনতানুন তাকে পরিমাপ করার জন্য বলল- এবার আপনার চলে যাওয়া উচিত। দুর্গপতি আপনার সন্ধানে লোক পাঠাতে পারেন। তখন চরম বিপত্তি দেখা দেবে। মেয়েটি বলল- আমার অনুপস্থিতি কেউ টের পাবে না। ওখানে মেয়ের অভাব নেই।
আনতানুন আগামী রাতে আবার দেখা হবে বলে চলে যায়।
মেয়েটি আনতানুনকে নিজের ব্যাপারে যা বলেছে, তা হল, সে মদ-মাদকতাকে ঘৃণা করে। তাকে যে ভোগের উপকরণ বানানো হয়েছে, তাতেও তার ঘৃণা। সে হাবের বাসিন্দা। তার পিতার এক বন্ধু তাকে গোমস্তগীনের জন্য নির্বাচন করেছেন এবং নামমাত্র বিবাহ পড়িয়ে পিতা তাকে বিদায় করে দিয়েছেন।
পরদিন রাতেও দুজনের সাক্ষাৎ হয়। এবার আগে আসে মেয়েটি। এসে আনতামুনকে না পেয়ে অস্থির হয়ে পড়ে সে। কিছু সময় অপেক্ষা করার পর আনতানুন এসে হাজির হয়। মেয়েটি প্রথমেই বলল- যদি তুমি আমাকে একটি রূপসী মেয়ে মনে করে অন্য কোন উদ্দেশ্যে এসে থাকে, তাহলে ফিরে যাও। তোমার নিকট আমার এরূপ কোন মনোবাসনা নেই।
যদি কখনো আমি তোমার নিকট অসৎ মনোবাসনা প্রকাশ করি, তখন তুমি আমার মুখে থু থু নিক্ষেপ করে চলে যেও- আনতানুন বলল- আমি তোমাকে আমার বোনদের-ই ন্যায় পবিত্র মনে করি।
না, আমাকে তুমি তোমার বোনদের সঙ্গে তুলনা কর না- মুখের গাম্ভীর্যকে মুচকি হাসিতে পরিবর্তন করে মেয়েটি বলল- কখন কী সিদ্ধান্ত নিয়ে বসি বলা যায় না।
তার মানে তুমি আমার সঙ্গে কোথাও পালিয়ে যাওয়ার মতলব আঁটছ? আনতানুন বলল।
এটা নির্ভর করে তোমার উপর- মেয়েটি বলল- চিরজীবন তো আর লুকিয়ে চলা যাবে না। এখানে তুমি আট-দশদিনের জন্য এসেছ। চলে যাওয়ার পর তোমার মুখটা মনে পড়লে আমি বেজায় কষ্ট পাব।
এক রাতেই তারা একজন অপরজনের হৃদয়রাজ্যে আসন গেড়ে ফেলে। পরদিন মেয়েটি এতই অস্থির ও বেচাইন হয়ে পড়ে যে, আনতানুনকে দিনের বেলায়ই তার কক্ষে ডেকে নিয়ে যায়। সেদিন গোমস্তগীন মহলে ছিলেন না। হাররানের বাইরে অন্য কোথাও গিয়েছিলেন। এই সাক্ষাৎ তাদের উভয়ের জন্য ই ছিল বিপজ্জনক। মেয়েটি আবেগের কাছে পরাজিত হয়ে ভুলে গেছে, এই মহলে ষড়যন্ত্র চলে এবং হেরেমের মেয়েরা একজন অপরজনকে স্বামী থেকে দূরে সরিয়ে রাখার সুযোগের সন্ধানে থাকে। কিন্তু আনতানুনের ব্যক্তিত্ব ও তার যাদুমাখা বক্তব্য তাকে অন্ধ করে ফেলে। এ হল প্রেম-পিপাসার ফল। আনতানুন তাকে কল্পনা করতেও সুযোগ দেয়নি যে, তার দেহ নিয়ে তার কোন আগ্রহ আছে। মেয়েটির জন্য সে আপাদমস্তক হৃদ্যতার রূপ ধারণ করে। আনতানুন যখন কক্ষ থেকে বের হয়, তখন মেয়েটির মানসিক অবস্থা এই ছিল, যেন এক্ষুণি সে তার সঙ্গে বেরিয়ে যাবে।
দুপুর রাতে তাদের পুনরায় মিলন হওয়ার কথা।
আনতানুন যখন মেয়েটির কক্ষ থেকে বের হয়, তখন অপর একটি মেয়ে তাকে দেখে ফেলে। এই মেয়েটি কক্ষে প্রবেশ করার সময়ও তাকে দেখেছিল।
***
গোমস্তগীন রাতেও ফিরে আসেননি। মেয়েটি নির্দিষ্ট সময়ে বাগানে চলে যায়। আনতানুনও এসে পড়ে। এবার তাদের মাঝে কোন অন্তরায় নেই, না কোন প্রতিবন্ধকতা। খোলামেলা কথা বলছে দুজন।
তুমি বলেছিলে, তোমার বোনদের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তুমি সুলতান আইউবীর ফৌজে যোগ দিতে এসেছ- মেয়েটি বলল- তাহলে এই বাহিনীতে ভর্তি হলে কেন?
এটা কি সুলতান আইউবীর ফৌজ নয়?- আনতানুন মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, যেন সে কিছুই জানে না- এটাও তো ইসলামী ফৌজ। সুলতান আইউবী ছাড়া আর কার হতে পারে এ বাহিনী?
এ ফৌজ ইসলামী বটে- মেয়েটি বলল- কিন্তু এদেরকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তাই নাকি?- আনতানুনের কণ্ঠে বিস্ময়, কপালে ভাজ- এতো বড় দুঃসংবাদ! তোমার ধারণা কী? যে ফৌজ সুলতান আইউবীর বিপক্ষে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে, আমার কি সে বাহিনীতে থাকা ঠিক হবে? তুমি হয়ত জান না, খৃষ্টানরা জেরুজালেমসহ যেসব অঞ্চল দখল করে আছে, সেসব অঞ্চলের মুসলমানরা সুলতান আইউবীকে মাহদী বলে বিশ্বাস করে। তাদের সর্বক্ষণ খৃষ্টানদের অত্যাচারের ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকতে হয়। মসজিদের ইমামগণ বলছেন- এ জাতি তাদের পাপের শাস্তি ভোগ করছে। দামেস্ক থেকে সালাহুদ্দীন আইউবীর রূপ ধারণ করে মাহদী আমাদেরকে মুক্ত করতে আসছেন। তুমি বল, এমতাবস্থায় আমি কী করব?
যদি সাহস হয়, আমাকে নিয়ে এখান থেকে পালিয়ে যাও- মেয়েটি বলল আমি তোমাকে সুলতান আইউবীর বাহিনীর নিকট নিয়ে যাব। এই ফৌজে থাকা তোমার ঠিক হবে না। তবে আমাকে এখানে ফেলে তুমি পালিয়ে যাবে, তা হতে দেব না।
