এটা আমার কর্তব্য- আনতানুন বলল- হেরেম থেকে একটি মেয়েও যদি হারিয়ে যায়, তার জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।
ও, তার মানে তুমি তোমার বোনের হেফাজতের জন্য এসেছ- মেয়েটি মুচকি হেসে বলল।
আজ তার হেফাজত যদি আমি করতে পারতাম, তাহলে আজ একটি মেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারত না, তুমি কে? এখানে কী করছ?- আনতানুন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল- আমি আমার বোনটাকে রক্ষা করতে পারিনি। তাই আপনার রক্ষণাবেক্ষণে আমি পূর্ণ সাবধানতা অবলম্বন করছি। সেও দেখতে আপনার-ই মত ছিল। আপনি আমার কর্মতৎপরতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন না।
আনতানুন অন্ধকারে যে তীর ছুঁড়ল, সেটি নিশানায় গিয়ে আঘাত হানল। সে মেয়েটির আবেগের উপর তীর ছুঁড়েছিল। মেয়েটিও যুবতী। সে জিজ্ঞেস না করে পারল না, তুমি তোমার যে বোনকে রক্ষা করতে পারনি, তার কী হয়েছিল? তোমার বোনকে কি কেউ অপহরণ করেছিল?
অপহরণকারীরা যদি মুসলমান হত কিংবা যদি নিজে কোন মুসলমানের সঙ্গে পালিয়ে যেত, তাহলে আমার এত দুঃখ হত না- আনতানুন বলল- অন্তরকে এই বলে সান্ত্বনা দিতাম, কেউ না কেউ তাকে বিয়ে করে নেবে নতুবা কোন মুসলিম আমীরের হেরেমে পৌঁছে যাবে। আমার বোনটাকে অপহরণ করেছে খৃস্টানরা। একটি নয়- দুটি বোন। আমি তাদেরকে রক্ষা করতে পারিনি!
মেয়েটি জিজ্ঞেস করল- তারা কোথা থেকে কিভাবে অপহৃত হয়েছে? আনতানুন সেই জেরুজালেমের কাহিনী শোনায় এবং নিজের পালিয়ে বাঁচার ও এখানে আসার কাহিনী এমন আবেগময় ভঙ্গিতে বিবৃত করে যে, মেয়েটির চেহারা বলছে, সে প্রভাবিত হয়ে পড়েছে, যেন আনতানুনের ছোঁড়া তীর তার হৃদয়ে গেঁথে গেছে। আনতানুন বলল- আমি জেরুজালেম থেকে পায়ে হেঁটে এখানে এই প্রত্যয় নিয়ে এসেছি যে, সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজে যোগ দিয়ে শুধু নিজের বোনদের-ই নয়, ঐ সমস্ত বোনেরও প্রতিশোধ নেব, যাদেরকে খৃস্টানরা অপহরণ করেছে। দুর্গপতি আমাকে তার মোহাফেজ বাহিনীতে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন।
আনতানুন আরো এমন কিছু আবেগময় কথা বলল, যা মেয়েটির অন্তরে গেঁথে গেছে।
আনতানুন ভালভাবেই জানে, হেরেমের মেয়েদের আবেগ-চেতনা স্পর্শকাতর হয়ে থাকে। কিন্তু স্বভাব-চরিত্রে তারা দুর্বল। কারণ স্পষ্ট। একজন পুরুষের যদি এক ডজন কিংবা আরো বেশি বউ বা রক্ষিতা থাকে, তাহলে একজনও দাবি করতে পারে না, স্বামী আমাকেই কামনা করে। আর যখন রক্ষিতাগুলোকে বিবাহ ব্যতীত হেরেমে আবদ্ধ করে রাখা হয়, তাহলে তো তারা স্বামীর ভালবাসার কল্পনাও করতে পারে না। যুবতী মেয়েদের আলাদা কিছু আবেগ থাকে। হেরেমের মেয়েরা জানে, বছর কয়েক পর তার কোন মূল্য থাকবে না। আনতানুন জানে, হেরেমের মেয়েরা তাদের স্বপ্ন-সাধ চাপা দিয়ে রাখে এবং স্বামী কিংবা মনিবের কোন যুবক বন্ধু, অন্য কোন যুবক বা কোন সুদর্শন চাকরের সঙ্গে প্রেম-ভালবাসার নেশা পূর্ণ করে।
এই মেয়েটি ঘটনাক্রমে আনতানের সম্মুখে এসে পড়ে। তাই সে তার আবেগ নিয়ে খেলা করার চেষ্টা করে। সফল গুপ্তচরবৃত্তির জন্য তাকে হেরেমের একটি মেয়ের সঙ্গে খাতির পাতানো আবশ্যকও বটে। প্রশিক্ষণের সময় তাকে জানানো হয়েছে যে, গোমস্তগীনের ন্যায় বিলাসী গভর্নর ও আমীরগণ নাচ-গান ও মদের আসর বসিয়ে থাকে। তাতে হেরেমের মেয়েরাও যোগ দেয়। মদ আর নারীর নেশায় তাদের জবান নিয়ন্ত্রণ হারিয় ফেলে। ফলে এই আসরগুলোতে গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যায়। আনতানুন আলী বিন সুফিয়ানের হাতেগড়া গুপ্তচর। দায়িত্ব পালনের স্বার্থে সুলতান আইউবী তাকে পর্যাপ্ত অর্থ ও নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রেখেছেন।
আনতানুন মেয়েটির উপর এমন প্রভাব সৃষ্টি করে ফেলে যে, তার চেহারা থেকেই তা প্রতিভাত হচ্ছে। তার মনে আশাবাদ জাগতে শুরু করে, মেয়েটি তার জালে আটকা পড়বে। কথোপকথন শেষে সে স্থান ত্যাগ করতে উদ্যত হলে মেয়েটি তাকে চাপাকণ্ঠে বলল–
মহলের পিছনে একটি বাগান আছে। রাতের দ্বিতীয় প্রহরে ওখানে গিয়েও তদারকি করে নিও। ওদিক থেকে কেউ মহলে প্রবেশ করতে পারে। মেয়েটির ঠোঁটে মুচকি হাসি। মনের কথা ব্যক্ত করে ফেলেছে সে।
***
রাতে পাহারা দেয়া বডিগার্ডদের দায়িত্ব নয়। তারা মূল্যবান পোশাক পরিধান করে চকমকে তরবারী কিংবা বর্শা হাতে নিয়ে প্রধান ফটকের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। বডিগার্ডদের কর্তব্য মনিবকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। তাদের আসল কাজ হল যুদ্ধের ময়দানে মনিবের সঙ্গে থাকা।
আনতানুন রাতের দ্বিতীয় প্রহরে মহলের পিছনের বাগিচায় গিয়ে পায়চারি করতে শুরু করে। মহলের ভিতর থেকে গান-বাজনা ও নাচের শব্দ কানে আসছে। আনতানুন আগত মেহমানদেরকে গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছে। তাদের দু-তিনজন খৃস্টান। বেশ কিছুক্ষণ বাগিচায় হাঁটাহাঁটি করার পর পিছন দরজা দিয়ে মেয়েটি বের হয়ে তার নিকট চলে আসে।
আপনি কেন এসেছেন? আলতানুন যেন কিছুই জানে না।
তুমি কেন এসেছ?- মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
আপনার নির্দেশ পালন করার জন্য- আনতানুন জবাব দেয়- আপনি আদেশ করেছিলেন, রাতের দ্বিতীয় প্রহরে বাগিচায় এসে দেখতে, মহলের পিছন দিক থেকে অনুপ্রবেশের কোন সুযোগ আছে কিনা। আচ্ছা, আপনি এত সরগরম আসর ছেড়ে বাইরে আসলেন কেন?
