গোমস্তগীন ছিলেন স্বাধীনচেতা, তথা স্বেচ্ছাচারী চরিত্রের মানুষ। হাররানে কার্যত তারই শাসন চলত। তিনি ইবনুল খাশিব আবুল ফজল নামক তার অনুগত এক ব্যক্তিকে কাজী তথা বিচারকের পদে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। ইবনুল খাশিব ছিল চাটুকার ও দুশ্চরিত্র মানুষ। ইসলামের কাজীগণ তাদের ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞার কারণে মানুষের কাছে প্রসিদ্ধ। কিন্তু জনসমাজে ইবনুল খাশিবের খ্যাতি ছিল অবিচার ও গোমস্তগীনের চাটুকারিতার কারণে। শামসুদ্দীন ও শাদবখত তার অন্যায়-অবিচারের কাহিনী সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। কিন্তু তারা কিছু বলতেন না। তারা দেশের সামরিক শাখার কর্মকর্তা। কাজীর বিচার ফয়সালা ও নাগরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক ছিল না। গোমস্তগীনের উপর কাজী সাহেবের বেশ প্রভাব ছিল। প্রভাব তিনি সৃষ্টি করে রেখেছিলেন। গোমস্তগীন তাকে কিছু বলতে সাহস করতেন না।
নুরুদ্দীন জঙ্গীর ওফাতের পর শত শত সৈন্য নিয়ে সুলতান আইউবী যখন দামেস্ক আসেন, তখন তিনি অত্র অঞ্চলগুলোতে তাঁর বহু গুপ্তচর ছড়িয়ে দেন। তাদের একজনের নাম আনতানুন। আনতানুন তুর্কী বংশোদ্ভূত সুদর্শন এক যুবক। তুর্কী ভাষা ছাড়াও আরবীতে কথা বলতে পারে অনর্গল। দায়িত্ব পালনার্থে আনতানুন চলে যায় হাররান। সাক্ষাৎ করে গোমস্তগীনের সঙ্গে। গোমস্তগীনকে নিজের কাহিনী শোনায় গড়া কাহিনী।
আমি জেরুজালেমের বাসিন্দা। খৃস্টানরা সেখানকার মুসলমানদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে। তারা আমার দুটি যুবতী বোনকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে এবং ভাই ও পিতাকে আটক করে রেখেছে। আমি পালিয়ে আপনার নিকট চলে এসেছি। আমি খৃস্টানদের থেকে এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীতে যোগ দিতে চাই।
আনতানুন এমন একটা বেশ ধারণ করে রেখছিল যে, তাতে মনে হচ্ছিল, সে জেরুজালেম থেকে পায়ে হেঁটে এসেছে এবং ক্ষুধা ও ক্লান্তিতে শোচনীয় অবস্থা। গোমস্তগীন তার প্রতি সেনানায়কের দৃষ্টিতে তাকান। তার দৈহিক গঠন তার পছন্দ হয়। তাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি ঘোড়সওয়ারী ও তীরন্দাজী জান? জবাবে আনতানুন বলল, এ মুহূর্তে আমার খানিক বিশ্রাম ও খাবার প্রয়োজন। তারপর দেখাব, আমি কী জানি। গোমস্তগীন তাকে খানা খাইয়ে শুইয়ে দেন। দীর্ঘক্ষণ পর ঘুম থেকে জাগ্রত হলে তাকে গোমস্তগীনের দরবারে হাজির করা হয়। গোমস্তগীন একটি ঘোড়া তলব করেন। আনতানুনকে বাইরে নিয়ে গিয়ে তাকে এক দেহরক্ষীর ধনুক ও একটি তীর দিয়ে বললেন, তুমি তোমার খুশীমত কোথাও নিশানা করে যোগ্যতার প্রমাণ দাও। তারপর ঘোড়া দৌড়াও।
নিকটেই একটি বৃক্ষ ছিল। তার ডালে নানা প্রজাতির কতগুলো পাখি বসা। সবচে ছোট পাখিটি হল চড়ুই। আনতানুন চড়ুইটিকে নিশানা করে তীর ছোঁড়ে। তীর পাখিটির গায়ে বিদ্ধ হয়ে তাকে নিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। আনতানুন আরো একটি তীর চেয়ে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে এবং বলে, আমি ফিরে আসলে তোমরা কোন একটি বস্তু আকাশে ছুঁড়ে মারবে। গোমস্তগীনের এক দেহরক্ষী সেখানে দাঁড়ান ছিল। সে দৌড়ে গিয়ে তার খাওয়ার থালাটা নিয়ে আসে। আনতানুন ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটে যায়। বেশ কিছুদূর গিয়ে আবার পিছন দিকে মোড় নেয়। এবার ধনুকে তীর সংযোজন করে। এক দেহরক্ষী থালাটা শূন্যে নিক্ষেপ করে। আনতানুন ধাবমান ঘোড়ার পিঠ থেকে থালাটা লক্ষ করে তীর ছোঁড়ে। তীরের আঘাত খেয়ে থালা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে শূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। সে ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে অশ্বচালনার আরো কিছু কৃতিত্ব প্রদর্শন করে সকলকে তাক লাগিয়ে দেয়। উপস্থিত কারুর-ই জানা ছিল না যে, আনতানুন একজন অভিজ্ঞ গুপ্তচর ও কমান্ডো সেনা।
আনতানুনের দৈহিক কাঠামো, গাত্রবর্ণ ও যোগ্যতা দেখে গোমস্তগীন অত্যন্ত প্রীত ও প্রভাবিত হন এবং তাকে তারই দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ দেন। গোমস্তগীনের বাসভবন পাহারা দেয়ার দায়িত্বও তার উপর ন্যস্ত হয়।
একবারের ঘটনা। আনতানুন গোমস্তগীনের বাসভবন প্রহরায় নিয়োজিত। এ দায়িত্ব তাকে লাগাতার আট-দশদিন পালন করতে হবে। বিলাসপ্রিয় মুসলিম শাসকদের ন্যায় গোমস্তগীনের হেরেমও জাঁকজমকপূর্ণ। বার-চৌদ্দটি সুন্দরী মেয়ে বাস করে তার হেরেমে। আনতানুন ডিউটিতে গিয়েই প্রথমে ভবনের প্রতিটি দরজা-জানালা ও. প্রতিটি কোণ ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে নেয়। ভবনের সকল চাকর-চাকরানী ও মেয়েদের বলল, যেহেতু এই ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ করা আমার কর্তব্য, তাই এর প্রতিটি স্থান সম্পর্কে অবহিত হওয়া আমার আবশ্যক। ঘরের প্রতিটি কক্ষের কোথায় কী আছে, আমার জানা থাকতে হবে। আনতানুন অত্যন্ত চতুর মানুষ। কথার যাদু চালাতে পারঙ্গম। হেরেমের সর্বত্র অবাধ যাতায়াতে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকতে দিল না সে। বারান্দায় একটি মেয়ের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হল। মেয়েটি গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, তুমি কে? এখানে কী করছ?
আমি এই ভবনের মোহাফেজ সৈনিক- আনতানুন জবাব দেয়- ভবনে প্রবেশ-নির্গমনের দরজা কটি, কিরূপ ও কোথায় কোথায়, তা ঘুরে-ফিরে দেখছি। এও দেখছি যে, আপনি ছাড়া এখানে আর কারা থাকে।
এখানে মোহাফেজ তো এর আগেও ছিল- মেয়েটি খানিক বিস্মিত কণ্ঠে বলল- তাদের কেউ-ই তো কখনো ভিতরে প্রবেশ করেনি! এই রীতি আমি পছন্দ করি না।
