আমি দেখতে পাচ্ছি, এই ভূখন্ড খুনের মাঝেই ডুবে থাকবে- সুলতান আইউবী বললেন- শাসনক্ষমতা হয়ত মুসলমানদের-ই হাতে থাকবে; কিন্তু তাদের মন-মস্তিষ্কের উপর খৃস্টানরা শাসন করবে।
***
সুলতান আইউবী তাঁর বাহিনীকে এমন এক পজিশনে বিভক্ত ও বিন্যস্ত করে রাখেন যে, কোন একটি দুর্গ জয় হওয়ার পর শত্রুপক্ষ তার উপর সরাসরি হামলা চালাতে পারবে না। তিনি বিজিত দুর্গগুলোতে স্বল্পসংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করে রেখেছেন। কারণ, তিনি দুর্গে অবরুদ্ধ হয়ে লড়াই করার পক্ষপাতী নন। পার্বত্য অঞ্চলে প্রতিটি পবর্তচূড়ায় তিনি তীরন্দাজ বসিয়ে রেখেছেন। যে পথটি সংকীর্ণ, তার উপর পাহাড়ে বড় বড় পাথরসহ কিছু লোক নিয়োজিত রেখেছেন। তাদের দায়িত্ব হল, দুশমন এই পথ অতিক্রম করার সময় উপর থেকে পাথর গড়িয়ে ফেলে দিবে। দামেস্ক থেকে আসা পথটিকে তিনি কমান্ডো ধরনের টহল সেনাদের দ্বারা নিরাপদ করে রেখেছেন, যাতে দুশমন তার রসদের কোন ক্ষতি করতে না পারে। একটি জায়গা এমন যে, সেটি হামাতের শিং নামে খ্যাত। প্রশস্ত একটি উপত্যকা। তাতে বেশ উঁচু একটি পাথর বিদ্যমান। পাথরটির মাথা শিং-এর ন্যায় দুভাগে বিভক্ত হয়ে আছে বলে তাকে হামাতের শিং বলা হয়। সুলতান আইউবী পার্বত্য এলাকায় এই উপত্যকাটিকে ফাঁদ হিসেবে নির্বাচিত করেন। তিনি তার সালারদেরকে কৌশল শিখিয়ে দেন যে, দুশমন যদি বাইরে থেকে এসে যুদ্ধ করতে চায়, তাহলে এই উপত্যকায় টেনে নিয়ে এসে যুদ্ধ করাবে।
সুলতান আইউবী সমগ্র এলাকায় এমন জায়গাগুলোতে পজিশন গ্রহণ, করেছেন যে, সেসব জায়গা থেকে দুশমনকে পছন্দমত যে কোন স্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তাড়াছাও তার গেরিলা যোদ্ধারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে দূর দূরান্ত পর্যন্ত টহল দিয়ে ফিরছে। গুপ্তচরবৃত্তির ব্যবস্থাপনা এতই শক্তিশালী যে, দুশমনের দুর্গগুলোতে পর্যন্ত আইউবীর চর রয়েছে। তারা খবরা-খবর প্রেরণ করছে। সুলতান তথ্য পেয়েছেন, আল-মালিকুস সালিহ তার গভর্নর গোমস্তগীন ও মসুলের শাসনকর্তা সাইফুদ্দীনকে সাহায্যের জন্য তলব করেছেন এবং তারা শর্তসাপেক্ষে সাহায্য দেবেন বলে জানিয়েছেন। গুপ্তচররা সুলতানকে আরো অবহিত করে যে, মুসলমান শাসক ও আমীরগণ বাহ্যত আল-মালিকু সালেহের সাথে ঐক্যবদ্ধ হলেও তাদের মাঝে পরস্পর মনের মিল নেই। তারা প্রত্যেকেই যুদ্ধ করে অধিক থেকে অধিকতর ভূখণ্ডে নিজ নিজ দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়ে। খৃস্টানরা তাদেরকে যত না সাহায্য দিচ্ছে, উস্কানি দিচ্ছে তার চে বেশি। তারা তাদের পারস্পরিক মতবিরোধকে জিইয়ে রাখার চেষ্টায় লিপ্ত।
আচ্ছা, শামসুদ্দীন এবং শাদবখত-এর কোন সংবাদ আসেনি, না? সুলতান আইউবী হাসান ইবনে আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেন।
না, তাজা কোন সংবাদ আসেনি- হাসান বিন আব্দুল্লাহ জবাব দেন তারা। বড় সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। গোমস্তগীন কোন পদক্ষেপ নিলে তারা তাদের যোগ্যতার পরাকাষ্ঠা দেখাবে। তাদের পরিকল্পনা হচ্ছে, তারা পরিস্থিতি অনুপাতে অভিযান পরিচালনা করবে।
হাসান বিন আব্দুল্লাহ সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মকর্তা আলী বিন সুফিয়ানের নায়েব। আলী বিন সুফিয়ান বর্তমানে মিশরে অবস্থান করছেন। সেখানকার পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। মিশরে তাকে একান্ত প্রয়োজন।
সুলতান আইউবী হাসান ইবনে আব্দুল্লাহর সঙ্গে বাইরে পায়চারি করছেন। হঠাৎ করেই তিনি শামসুদ্দীন ও শাদবখত-এর প্রসঙ্গটা উল্লেখ করেন। এরা দুজন বর্তমানে গোমস্তগীনের সেনাঅধিনায়ক। গোমস্তগীন নামে মুসলমান হলেও শয়তান চরিত্রের একজন লোক। পদমর্যাদায় আল-মালিকুস সালিহ-এর গভর্নর। অবস্থান করছেন হাররান-এর দুর্গে। এই দুর্গের ভিতরে ও বাইরে তিনি বিপুলসংখ্যক সৈন্য সমবেত করে রেখেছেন। লোকটা তথাকথিত খেলাফতের অধীন এবং খলীফার অনুগত। কিন্তু বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার বলে সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এমন অবস্থান তৈরি করে রেখেছেন যে, কাউকে তিনি পাত্তা ই দিচ্ছেন না। কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে খৃস্টানদের সঙ্গে রয়েছে তার ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক। তার দুর্গে নুরুদ্দীন জঙ্গীর ধৃত খৃস্টান কয়েদী ছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন কমান্ডারও ছিল। জঙ্গীর মৃত্যুর পর কারো সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করেই তিনি তাদেরকে মুক্ত করে দেন। এটা করেছেন তিনি খৃস্টানদের সন্তুষ্টি ও সুদৃষ্টি লাভের আশায়। গোমস্তগীন এখন খৃস্টানদের বিরোধী নয়। বরং তাদের সাহায্য নিয়ে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
গোমস্তগীনের দুজন বিশেষ সালার রয়েছে। বিচক্ষণতা ও সামরিক যোগ্যতার কারণে তারা তার অত্যন্ত আস্থাভাজন। তারা দুজন আপন ভাই। একজনের নাম শামসুদ্দীন, অপরজনের নাম শাদবখত। দুজন ভারতীয় মুসলমান। ইরাকের তৎকালীন ঐতিহাসিক কামালুদ্দীন হালবের ইতিহাস নামক একটি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- শামসুদ্দীন ও শাদবখত সহোদর ভাই ছিলেন এবং সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর জীবদ্দশায় ভারত উপমহাদেশ থেকে তার নিকট গিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে সেনাবাহিনীর উচ্চপদে অধিষ্ঠিত করে হাররান প্রেরণ করেছিলেন।
কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদও তাঁর রোজনামচায় এদের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি এও লিখেছেন- আরবে যেহেতু মানুষের নামের সঙ্গে পিতার নামও উল্লেখ করার নিয়ম ছিল, তাই এই দুভাই-এর নাম শামসুদ্দীন আলী বিন জিয়া এবং শাদবখত আলী বিন জিয়া বলে উল্লেখ করা হত। কিন্তু এই জিয়া কে ছিলেন, তার কোন বিবরণ ইতিহাসে উল্লেখ নেই। তারা ইতিহাসে আলোচিত হওয়ার পিছনে একটি ঘটনা আছে। ঘটনাটা এরকম
