***
মিশর থেকে সাহায্য এসে না পৌঁছা পর্যন্ত কোন অভিযান পরিচালনা না করাই ভাল হবে- দূতকে বিদায় দিয়ে সালার ও অন্যান্য দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে সুলতান আইউবী বললেন- সে পর্যন্ত আমরা এতদিনের সাফল্য ধরে রাখার কাজে নিয়োজিত থাকব। তোমরা বর্তমান পরিস্থিতিটার উপর একটু দৃষ্টি দাও। তোমাদের ভাই-ই তোমাদের বড় দুশমন! তোমাদের শক্তিশালী দুশমন তিনজন। এক, আল-মালিকুস সালিহ, যিনি হাবে জেঁকে বসে আসেন। দুই. তার কেল্লাদার গোমস্তগীন, যিনি হাররানে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে সময়ের অপেক্ষা করছেন এবং তিন, মসুলের শাসনকর্তা সাইফুদ্দীন। এ তিনটি বাহিনী যদি সংঘবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে তাদের মোকাবেলা করা আমাদের পক্ষে সহজ হবে না। তোমরা রেমন্ডকে হটিয়ে দিয়েছ ঠিক; কিন্তু সে এই অপেক্ষায় আছে যে, মুসলিম বাহিনী পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়বে আর সে পিছন দিক থেকে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমি অবরুদ্ধ হয়েও যুদ্ধ করতে জানি; কিন্তু সেই পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে চাই।
আচ্ছা, আল-মালিকুস সালিহ, গোমস্তগীন ও সাইফুদ্দীনকে ইসলাম ও কুরআনের দোহাই দিয়ে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার একটা চেষ্টা চালালে কেমন হয়? এক সালার বললেন।
না- সুলতান আইউবী বললেন- যারা নিজেদের মন-মস্তিষ্ককে সত্যের আওয়াজের জন্য সীল করে রাখে, আল্লাহর কহর ও গজব ছাড়া তাদের মন মস্তিষ্ক উন্মুক্ত হয় না। আমি কি চেষ্টা করিনি? তার জবাবে আমি নানা রকম হুমকি-ধামকি লাভ করেছি। এখন যদি আবার আমি সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে দূত প্রেরণ করি, তারা ভাববে, সালাহুদ্দীন ভয় পেয়ে গেছে। এখন আমি তাদের উপর আল্লাহ গজব হয়ে নিপতিত হয়ে চাই, যা তাদের বিবেক-বুদ্ধির বদ্ধ দুয়ার খুলে দেবে। সেই গজব হচ্ছে তোমরা এবং এই ফৌজ।
সুলতান আইউবী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন—
তোমরা হাল অবরোধ করার পর হাবের মুসলমানরা যে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করল, তা তোমরা কখনো ভুলবে না। তারা নিশ্চয় আমাদের বিপক্ষে লড়াই করেছে। কিন্তু আমি তাদের প্রশংসা করি, এমন দুঃসাহসী লড়াই কেবল মুসলমানই লড়তে পারে। হায়! যদি এই চেতনা ও এই শক্তি ইসলামের পক্ষে ব্যবহৃত হত! তোমরা তো জান, আমি রাজা হতে চাই না। আমার লক্ষ্য হল, ইসলামী দুনিয়া ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাক এবং মুসলমানদের বিক্ষিপ্ত শক্তিগুলো কেন্দ্রীভূত হয়ে খৃস্টানদের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হোক এবং ফিলিস্তীনকে মুক্ত করে আমরা সালতানাতে ইসলামিয়াকে বিস্তৃত করি।
আমরা নিরাশ নই মাননীয় সুলতান!- এক সালার বললেন- নতুন সেনা ভর্তি চলছে। এ অঞ্চলেও বিপুলসংখ্যক যুবক ভর্তি হচ্ছে। মিশর থেকেও বিশেষ সাহায্য আসছে। আমরা আপনার প্রতিটি বাসনাকে পূর্ণ করব ইনশাল্লাহ।
কিন্তু তোমরাই বল, আমি কতদিন বেঁচে থাকব?- সুলতান আইউবী বললেন- তোমরা-ই বা কদিন জীবিত থাকবে? শয়তানী শক্তি দিন দিন জোরদার হচ্ছে। তাদের সীমানার পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে। যে বন্ধুদের উপর আমার পূর্ণ আস্থা ছিল, তারা খৃস্টানদের হাতে খেলছে আর আমার হাতে খুন হচ্ছে। আল-কিদ তোমাদের-ই মধ্যকার একজন বিশ্বস্ত সালার ছিল। সেই আল কি সুদান থেকে হাবশী সৈন্যদের ডেকে এনে মিশর হামলা করার চেষ্টা করেছে শুনে কি তোমরা অবাক হওনি? লোকটা আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছে যে, সে নিজেই নিজেকে হত্যা করেছে। আমি তাকে মৃত্যুদন্ড দেইনি। ক্ষমতার নেশা, সম্পদের লোভ আর নারীর মোহ ভাল ভাল মানুষকেও অন্ধ করে দেয়। ঈমান সোনার ন্যায় চমকায় না। ঈমান নারীর ন্যায় বিলাসিতার বস্তু নয়। ঈমান মানুষকে রাজা ও ফেরাউনে পরিণত হতে দেয় না। আত্মার দ্বার বন্ধ করে দেখ, ঈমান নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। তারপর বিবেকের উপর আবরণ পড়ে যাবে।
স্পেন থেকে তোমাদের পতাকা হারিয়ে গেল কেন? ইতিহাস বলছে, স্পেনের মুসলমানদের এই পতন ছিল কাফেরদের ষড়যন্ত্রের ফল। কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্র সফল হল কেন? কারণ, মুসলমানরা নিজেরাই নিজেদেরকে কাফেরদের ক্রীড়নকে পরিণত করেছিল। তারা তাদের ঈমান নীলাম করে দিয়েছিল। স্পেন ছিল তাদের, যারা সমুদ্র পার হয়ে পারাপারের নৌকাগুলো পুড়ে ফেলেছিল, যাতে পালাবার কিংবা ফিরে যাওয়ার চিন্তা-ই মাথায় না আসে। স্পেনের মূল্য তারা-ই বুঝে, যারা বাহন পুড়ে ফেলেছিল। স্পেন ছিল শহীদদের। খুনের নজরানা আদায় করে যারা রাজ্য জয় করে, তাদের দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর সেই লোকগুলো দেশের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, যারা এক ফোঁটাও রক্ত ঝরায়নি। ভবিষ্যতেও এমনই ঘটবে। তারা যেহেতু দেশটা বিনামূল্যে পেয়ে যায়, তাই দেশটাকে তারা বিলাসিতার উপকরণে পরিণত করে এবং সিংহাসনের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য ঈমানদার দেশপ্রেমী লোকদের জবান বন্ধ করে দেয়, তাদের গলা টিপে ধরে রাখে।
স্পেনেও এটাই ঘটেছে। কাফেররা আমাদের রাজা-বাদশাহদেরকে হীরা জহরত ও ইউরোপের সুন্দরী মেয়েদের বিনিময়ে হাত করে নিয়েছিল। তাদেরকে তাদের-ই সৈন্যদের বিপক্ষে দাঁড় করিয়েছিল। মুজাহিদেরকে অপরাধী সাব্যস্ত করেছিল। এভাবে স্পেনের ইসলামী রাজ্য ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়। রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর সহচরগণ দেহের রক্ত দ্বারা বাতি জ্বালিয়ে আধা পৃথিবীকে সত্যের আলোয় আলোকিত করেছিলেন। সেই চেরাগ এখন কোথায়? সেই চেরাগ এখন একটি একটি করে নিভে যাচ্ছে। সেই চেরাগ এখন রক্ত চায়। কিন্তু রক্ত দেয়া যাদের কর্তব্য ছিল, তারা খৃস্টানদের মদ ও নারীর নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। তারই ধারাবাহিকতায় প্রথম কেবলা মুসলমানের হাতছাড়া। আর আমরা মুসলমানরা একজন আরেকজনের রক্ত ঝরাচ্ছি। . কাফেরদের আগে গাদ্দারদের হত্যা করা আবশ্যক- একজন উপদেষ্টা বললেন আমরা যদি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি, তাহলে আমরা ব্যর্থ হব না।
