ইসলামের এই মহান সেনানী চারদিক থেকে সমস্যা ও সংকটে নিপতিত হয়ে পড়েছেন। একদিকে কয়েকজন মুসলিম আমীরের সেনাবাহিনী তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। অপরদিকে খৃস্টানদের ষড়যন্ত্র। এসবের মোকাবেলায় সুলতানের হাতে যে সৈন্য আছে, তা নগন্য। কিন্তু তিনি এমন কৌশল ও কৃতিত্বের সঙ্গে সেসব সমস্যার মোকাবেলা করেন, যা কারো কল্পনায় ছিল না। তাঁর দুশমনদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, শীতের মওসুমে এই পাহাড়ী ভূখন্ডে যুদ্ধ করার কল্পনাও কেউ করবে না। উঁচু উঁচু পাহাড়গুলোতে বরফ পড়ছে। কিন্তু সুলতান আইউবী তাঁর বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে এমন এক সময় আক্রমণ পরিচালনা করেন, যখন শীত তুঙ্গে। এই দুঃসাহসী ও অপ্রত্যাশিত অভিযান পরিচালনা করে তিনি তাঁর ক্ষুদ্র বাহিনীটি দ্বারা শত্রু বাহিনীকে যে কোন সুবিধাজনক স্থানে টেনে নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত করাতে পারেন। তার সৈন্যসংখ্যা এতই কম যে, পরম আত্মবিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও মাঝে-মধ্যে তাঁর পরাজয়ের আশংকা অনুভূত হত। কিন্তু তারপরও শত্রুপক্ষ তাঁর ভয়ে তটস্থ। সুলতান আইউবীর আশংকা, রেমন্ড পরিকল্পনা ও রাস্তা বদল করে তার উপর হামলা করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে রেমন্ডের অবস্থা হল, তিনি এই ভয়ে নিজ এলাকা ত্রিপোলীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্ত করে তোলেন যে, সুলতান আইউবী হামলা করতে পারেন।
সুলতান আইউবী রেমন্ডকে যে প্রক্রিয়ায় বিতাড়িত করেন, তাতে খৃস্টান সেনাদের ধাওয়া করে সাফল্য অর্জন করার চেষ্টা করাই ছিল যুক্তিযুক্ত। কিন্তু সৈন্য কম হওয়ার কারণে তিনি সে ঝুঁকি নেননি। বড় কারণ হল, মিশরে আল কি-এর বিদ্রোহ ও গাদ্দারী তাঁকে থামিয়ে দিয়েছিল। তিনি আশংকা করছিলেন যে, মিশরের পরিস্থিতি গুরুতর রূপ লাভ করবে। সে পরিস্থিতিতে তাঁকে মিশর ফিরে যেতে হবে। আর যদি তাঁকে মিশর যেতেই হয়, তাহলে মুসলিম আমীরগণ ইসলামী দুনিয়াকে খৃস্টানদের কাছে নীলাম করে দেবে, তাতে সন্দেহ নেই। এখন সবকিছু নির্ভর করছে, মিশর থেকে কী সংবাদ আসে, তার উপর।
আলরিস্তানের হেডকোয়ার্টারে বসে উপদেষ্টামন্ডলী ও কমান্ডারদের নিকট মিশরের ব্যাপারেই তাঁর উদ্বেগের কথা ব্যক্ত করছিলেন সুলতান। এমন সময় তিনি সংবাদ পান যে, কায়রো থেকে দূত এসেছে। খবরটা পেয়ে সুলতান রাজা বাদশাদের ন্যায় বললেন না, তাকে ভিতরে পাঠিয়ে দাও। বরং সংবাদটা শোনামাত্র তিনি বসা থেকে উঠে দাঁড়ান এবং দৌড়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে বাইরে চলে যান। দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত দূত ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে তাঁবুর দিকে এগিয়ে আসছে। সুলতান উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন, কোন সুসংবাদ নিয়ে এসেছ তো?
সংবাদ খুবই ভাল মহামান্য সুলতান- দূত জবাব দেয়- মাননীয় আল আদেল হাবশী সেনা বাহিনীটিকে আসওয়ানের পার্বত্য এলাকায় এমনভাবে পরাস্ত করেছেন যে, সুদানের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের জন্য আংশকা দূর হয়ে গেছে।
সুলতান আইউবী দুহাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। তাঁবুর ভিতর থেকে অন্যান্যরাও বেরিয়ে আসে। সুলতান তাদেরকে সুসংবাদটা শোনান এবং দূতকে নিয়ে তাঁবুতে ফিরে যান। তাঁবুতে তার জন্য আহারের ব্যবস্থা করেন। সুলতান দূতের মুখ থেকে আসওয়ান যুদ্ধের বিস্তারিত শুনে তাকে জিজ্ঞেস করেন- আমাদের কতজন সৈন্য শাহাদাতবরণ করেছে?
তিনশত সাতাশজন- দূত জবাব দেয়- আর আহত হয়েছে পাঁচশরও বেশি। দুশমনের সম্পূর্ণ যুদ্ধ সামগ্রী আমাদের দখলে এসে গেছে। এক হাজার দুশত দশজন হাবশী সেনা বন্দী হয়েছে। খৃস্টান ও সুদানী নেতা-কমান্ডার যারা বন্দী হয়েছে, তারা এই সংখ্যার বাইরে। আল-আদেল বন্দীদের ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছেন।
খৃস্টান ও সুদানী সালার-কমান্ডারদেরকে কয়েদখানায় ফেলে রাখ- সুলতান আইউবী বললেন- তিনি গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর বলতে শুরু করেন- আর যে হাজারেরও বেশি হাবশী সেনাকে বন্দী করেছ, তাদেরকে আসওয়ানের পাহাড়ী এলাকায় নিয়ে যাও। তারা মিশরে অনুপ্রবেশ করে পর্বতমালার যে গুহাগুলোতে আত্মগোপন করেছিল, তাদের দ্বারা সেগুলোকে পাথর দিয়ে ভরে দাও। ওখানে ফেরাউনদের যেসব পাতালপ্রাসাদ আছে, সেগুলোকে পাথর দ্বারা পূর্ণ করে দাও। যদি পাহাড় খনন করার প্রয়োজন পড়ে, তাও ঐ হাবশীদের দ্বারা করাও। ওখানে কোন গুহা এবং পাতালপ্রাসাদ যেন অবশিষ্ট না থাকে। আল-আদেলকে বলবে, বন্দীদের সঙ্গে যেন মানবিক আচরণ করা হয়। দৈনিক তাদের দ্বারা ঠিক অতটুকু কাজ করাবে, যতটুকু কাজ সাধারণত একজন মানুষ করতে পারে। কোন কয়েদী যেন খানা-পানিতে কষ্ট না পায় এবং কারো উপর যেন শুধু এজন্য অত্যাচার করা না হয় যে, সে বন্দী। আসওয়ানের সন্নিকটে খোলামেলা জায়গায় জেলখানা তৈরী করে নাও। তোমাদের হাতে যদি অন্য কোন কাজ থাকে, তাহলে সে কাজটাও কয়েদীদের দ্বারা করাও। সুদানীরা যদি তাদের বন্দীদের ফিরিয়ে নিতে চায়, তাহলে আমাকে অবহিত করবে। আমি স্বয়ং তাদের সঙ্গে বুঝা-পড়া করব।
এই বার্তা প্রদানের পর সুলতান আইউবী দূতকে বললেন- আল-আদেলকে বলবে, আমার সাহায্যের তীব্র প্রয়োজন। নিজের প্রয়োজনের দিকেও লক্ষ্য রাখবে। সেনাভর্তির গতি বাড়িয়ে দাও। সারাক্ষণ সামরিক মহড়া অব্যাহত রাখ। গোয়েন্দা জাল আরো বিস্তৃত কর। আল-কিনৃদ-এর ন্যায় নির্ভরযোগ্য সালার-ই যদি গাদ্দারীর পথ বেছে নিতে পারে, তাহলে তোমরাও গাদ্দারও হয়ে যেতে পার, আমিও পারি। এখন থেকে কাউকে বিশ্বাস করবে না। আলী বিন সুফিয়ানকেও বলবে, সে যেন আরো সতর্ক ও তৎপর হয়।
