রাত পোহাবার পর বেলা হলে হাবশী ফৌজ তাদের সঙ্গীদের লাশ দেখে। বিপুল লাশ! লাশ আর লাশ!! তারা পিছনে সরে যায়।
সূর্য অস্ত যেতে এখনো বেশ বাকি। তারা পাহাড়ী এলাকায় ঢুকে পড়ে। বাহিনীর অর্ধেক সৈন্য এখনো ভিতরে ঢুকেনি, এরই মধ্যে তাদের গায়ে উপর থেকে তীর বর্ষিত হতে শুরু করে। আল-আদেল-এর তীরন্দাজ বাহিনী আগেই সেখানে পৌঁছে ওঁত পেতে বসে থাকে। হাবশী কমান্ডারগণ হাঁক- ডাক দিয়ে সৈন্যদেরকে আড়ালে নিয়ে যায় এবং তীর ছোঁড়ার নির্দেশ দেয়। অবশিষ্ট অর্ধেক সৈন্য এখনো বাইরে। তাদেরকে পিছনে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আল-কিন্দ তাদেরকে পাহাড়ে উঠিয়ে সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এবং উপর থেকে তীর নিক্ষেপ করার পরিকল্পনা আঁটে। তার এই পরিকল্পনা বেশ সফলও হয়। বহু হাবশীসেনা পাহাড়ে উঠে যেতে সক্ষম হয় এবং তারা সফল তীরন্দাজী করে। তাতে আল-আদেল-এর অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। কিন্তু তার পরিকল্পনা বেশ চমৎকার। তিনি সেখান থেকে তার বাহিনীকে পিছনে সরিয়ে নিয়ে যান। তার আগাম নির্দেশনা মোতাবেক অপর দিক থেকে তীরন্দাজ ও অন্যান্য বাহিনী পাহাড়ের উপরে উঠে যাচ্ছে। অশ্বারোহী বাহিনীর একটি ইউনিটকে নদীর তীরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
আসওয়ানের এই পাহাড়ী অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হল। উপত্যকা ও পর্বতপৃষ্ঠে অনেক তীর ছোঁড়াছুঁড়ি হল। তারপর অশ্বারোহী বাহিনী উপত্যকায় প্রলয় সৃষ্টি করার নির্দেশ পেল। রাতে হাবশীরা লুকিয়ে থাকে বটে; কিন্তু আল আদেল তার মিনজানীক বাহিনীকে নির্দেশ দেন, স্থানে স্থানে এদিক-সেদিক সর্বত্র দাহ্য পদাথ্য ভর্তি পাতিল ছুঁড়ে আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতে থাক। কিছুক্ষণ পরই পর্বতমালার ঢালুতে ও পাদদেশে অগ্নিশিখা জ্বলে উঠে এবং চতুর্দিক আলোকিত হয়ে যায়। এই আলোতে সারা রাত যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। যখন ভোর হল, তখন হাবশীরা সর্বশান্ত-নীরব। তাদের কিছু লোক পাতাল ঠিকানায় গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে।
দিনের বেলা আল-কি-এর লাশ পাওয়া গেল। কারো তীর কিংবা তরবারীর আঘাতে নয়- লোকটি নিজের তরবারীর আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছে। তারই তারবারীটা তার লাশের হৃদপিন্ডের উপর গেঁথে আছে। অর্থাৎ আল-কি আত্মহত্যা করেছেন। কয়েকজন খৃস্টান ও সুদানী কমান্ডার জীবিত বন্দি হল। বন্দি হল এক হাজারেরও বেশি হাবশী যোদ্ধা।
আল-আদেল সেখান থেকেই সুলতান আইউবীর নিকট পয়গাম লিখে দূত প্রেরণ করেন। তাকে নির্দেশ দেন, যত দ্রুত সম্ভব সুলতানের নিকট পৌঁছে যাও; তিনি চরম অস্থিরতার মধ্যে সময় অতিবাহিত করছেন।
৪.৪ রক্ত চাই
রক্ত চাই
ইসলামী দুনিয়ার যে ভূখন্ডে আজ সিরীয় মুসলমানরা লেবাননী খৃস্টানদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ফিলিস্তিনী মুক্তি কর্মীদের উপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে, আটশত বছর পূর্বে সেই ভূখন্ডে বহু মুসলমান আমীর, শাসক ও সুলতান জঙ্গীর বালক পুত্র খৃস্টানদের মদদে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। মুসলমান মুসলমানের রক্ত ঝরাচ্ছিল। ফিলিস্তীন তখন খৃষ্টানদের কজায়। সুলতান আইউবী প্রথম কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাসের সেই ভূখন্ডটিকে কাফেরদের হাত থেকে মুক্ত করার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে ময়দানে নেমেছেন। ফিলিস্তীন উদ্ধারে তাঁর সফল হওয়াও নিশ্চিত ছিল। কিন্তু একদল মুসলমান-ই তার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বসে। ফিলিস্তীন আজো কাফেরদের কজায় এবং স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনীরা যায়নবাদী হায়েনাদের ট্যাংকের চাকায় নিষ্পিষ্ঠ হচ্ছে।
১৯৭৫ সালের মার্চ মাস। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সেই ভূখন্ডের-ই আলরিস্তান পর্বতমালার কোন এক স্থানে তার হেডকোয়ার্টারে বসে উপদেষ্টা ও কমান্ডারদের নিয়ে পরবর্তী যুদ্ধপরিকল্পনা সম্পর্কে কথা বলছেন। আগেই উল্লেখ করেছি, সুলতান আইউবী হাল অবরোধ করে পরে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। তার কারণ, আল-মালিকুস সালিহ খৃস্টান সম্রাট রেমন্ডের সঙ্গে যে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন, সে মোতাবেক সম্রাট রেমন্ড সুলতান আইউবীর বাহিনীর উপর পিছন থেকে হামলা করার পরিকল্পনা নিয়ে এসে পড়েছিলেন। সুলতান আইউবী যথাসময়ে অবরোধ তুলে নেন এবং কৌশল অবলম্বন করে রেমন্ডের রাহিনীর পিছনের চলে যান এবং রেমন্ড যুদ্ধ ত্যাগ করে প্রাণ বাঁচানো শ্রেয় মনে করেন।
হালব মুসলিম অধ্যুষিত নগরী। কিন্তু এখন তা ইসলাম ও ইসলামী রাজ্যের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মুমিন সুলতান আইউবীর দুশমন মুসলমান আমীর ও খৃস্টানদের পুতুল খলীফা আল-মালিকুস সালিহ-এর সামরিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। খলীফা ও আমীরদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে হাবের মুসলমান সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে মাঠে নামে।
সুলতান আইউবী হাবের উপর পুনরায় আক্রমণ করে গাদ্দার ও ঈমান বিক্রেতাদের এই আড্ডাটি গুঁড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা প্রস্তুত করছিলেন। ঠিক এমন সময় মিশর থেকে সংবাদ আসে যে, মিশরে তার এক সেনা অধিনায়ক আল-কি খৃস্টানদের মদদে মিশরের মাটিতে সুদানী সৈন্যের সমাবেশ ঘটাচ্ছেন। তার লক্ষ্য, সুলতান আইউবীর অনুপস্থিতির সুযোগে মিশর আক্রমণ করবে এবং সুলতান আইউবীর হাত থেকে মিশরের ক্ষমতা ছিনিয়ে নেবে। কিন্তু সুলতান আইউবীর ভাই অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সুদানী বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেন এবং আল-কি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। তবে এই সাফল্যের সংবাদ এখনো সুলতান পাননি। তিনি আলরিস্তানের পার্বত্য এলাকায় চিন্তিত মনে বসে আছেন।
