ওদিকে রাত পোহাবার পর এক ব্যক্তি দেখতে পেল, নদীল কূলে হাবশীদের দুজন ধর্মগুরু ও চারজন হাবশীর মৃতদেহ পড়ে আছে। আল-কিদ ও তার খৃস্টান উপদেষ্টাদেরকে সংবাদ জানানো হল। তারা ঘটনাটা কোন হাবশীকে জানতে দেয়নি। আল-কিনৃদকে এ তথ্য জানানো হয়েছে যে, যে পুরুষ ও মহিলাকে বলির জন্য রাখা হয়েছিল, তারা পালিয়ে গেছে। আল-কিদ এবার জিজ্ঞেস করেন, ওরা কারা ছিল? তাকে জানানো হল, তাদের পুরুষ লোকটি নিকটবর্তী চৌকির কমান্ডার। শুনে আল-কিনৃদ চমকে ওঠেন। তার মনে পড়ে যায়, লোকটা তাকে দেখেছিল।
লোকটা সোজা কায়রো চলে গিয়ে থাকবে- আল-কি বললেন তাকে চৌকিতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখন আমাদের আর একটি মুহূর্তও নষ্ট করা যাবে না। আমরা অতর্কিতভাবে কায়রোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম। সে সুযোগ আমাদের শেষ হয়ে গেছে। আমরা সময় নষ্ট করে ফেলেছি। এখন উল্টো আমরা-ই বেঘোরে প্রাণ হারাব। আমি আমার বাহিনীকে জানি। তারা সংবাদ পাওয়ামাত্র উড়ে এসে পৌঁছে যাবে…। আচ্ছা, একটা কাজ কর, এক্ষুণি নিহত হাবশীদের লাশগুলো নদীতে ভাসিয়ে দাও। হাবশীরা যদি জানতে পারে, তাদের পুরোহিত ও কয়েকজন লোক খুন হয়েছে এবং তারা যাদেরকে বলি দেয়ার জন্য প্রস্তুত করেছে, তারা পালিয়ে গেছে, তাহলে উপায় থাকবে না।
পুরোহিত ও হাবশীদের লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে খবর ছড়িয়ে দেয়া হল, নদীর কিনারে বলির কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। খোদা আদেশ করেছেন, এবার তোমরা দুশমনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়। কমান্ডারগণ সংখ্যা অনুপাতে যার যার অধীন হাবশী সেনাদের আলাদা করে ফেলে। তীরন্দাজগণ আলাদা হয়ে যায়। যুদ্ধ পরিকল্পনা মোতাবেত তাদেরকে বিন্যস্ত করা হয়। তাদেরকে পাহাড়ের ভিতর থেকে বের করে নদীকূলের যে স্থানে পুরোহিত ও হাবশী রক্ষীরা খুন হয়েছে, তার নিকট দিয়ে অতিক্রম করানো হল। সেখানে ছোপ ছোপ রক্ত ও দুটি পালকি পড়ে আছে। এক ব্যক্তি সেখানে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করছে- এই রক্ত সেই পুরুষ ও নারীর, যাদেরকে বলি দেয়া হয়েছে।
বাহিনীটি নদীর কূল ঘেঁষে কায়রো অভিমুখে রওনা হয়ে পড়ে। রণসঙ্গীত গাইছে হাবশীরা। দিন শেষে রাত নামে। রাত যাপনের জন্য কাফেলা ছাউনি ফেলে। পরদিন ভোরে আবার রওনা হয়। তারা পাহাড়ী এলাকা ছেড়ে অনেক দূর এসে গেছে। কেটে যায় এদিনটিও। আসে আরেকটি রাত। বাহিনী এক স্থানে ছাউনি ফেলে। তারা খাওয়া-দাওয়া সেরে শুয়ে পড়ে। অনেকটা নিশ্চিন্ত তারা।
মাঝরাতে বাহিনীর পিছন অংশের উপর আল-আদেলের একটি গেরিলা দল আক্রমণ করে বসে। কয়েকটি ঘোড়া দ্রুত ছুটে এসেই অদৃশ্য হয়ে যায়। হৈ চৈ ও তোলপাড় শুরু হয়ে যায় হাবশী ফৌজের মধ্যে। দীর্ঘক্ষণ পর এরূপ আরেকটি হামলা হয়। এবার আক্রমণকারীরা বহু হাবশী সেনাকে দলে-পিষে বেরিয়ে যায়। আল-কি বাহিনীর আগে আগে অবস্থান করছেন। সংবাদ পেয়ে তিনি পদিনের অগ্রযাত্রা মুলতবী করে দেন।
এই গেরিলা আক্রমণ প্রমাণ করছে, আমরা মিশরী বাহিনীর নজরে পড়ে গেছি- আল কি বললেন- এটা সালাহুদ্দীন আইউবীর বিশেষ রণনীতি। আমরা আর সম্মুখে অগ্রসর হতে পারব না। যতই সাহস করনা কেন, তোমরা মিশরী সৈন্যদের সঙ্গে খোলা মাঠে লড়াই করে টিকতে পারবে না। এখন আমাদেরকে পিছনে সরে গিয়ে পাহাড়ী এলাকায় লড়তে হবে। আমাদের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। কায়রোবাসী শুধু টেরই পেয়ে যায়নি- তারা বাহিনীও পাঠিয়ে দিয়েছে!
আমরা কি মিশরী সৈন্যদের খুঁজে বের করে খোলা মাঠে যুদ্ধ করতে পারব?- এক খৃস্টান কমান্ডার জিজ্ঞেস করে- তোমরা যদি সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীকে মুখোমুখি এনে লড়াই করাতে পারতে, তাহলে মিশর অন্য তোমারদেই থাকত- আল-কি বললেন- আমি সেই বাহিনীরই একজন অধিনায়ক। তাদের সঙ্গে কিভাবে লড়াই করতে হবে, আমার চেয়ে তোম। ভাল জানবেনা।
***
শেষ রাতে হাবশী ফৌজ ফেরত রওনা হয়। ছাউনির এলাকাটায় চারদিকে সর্বত্র হাবশীদের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। আল-কিনদ ঠিকই বুঝেছেন যে, তার বাহিনী মিশরী ফৌজের নজরে এসে গেছে। মিশরী ফৌজের তথ্যানুসন্ধানী দল আল-কিদ এর প্রতিটি গতিবিধি প্রত্যক্ষ করছে। সুদানী বাহিনীকে পেছনে সরিয়ে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল-আদেল বুঝে ফেললেন আল কিনৃদ পাহাড়ী এলাকায় যুদ্ধ করতে চান। তিনি তখনি অশ্বারোহী তীরন্দাজ বাহিনীটিকে দূর পথ দিয়ে পাহাড়ী এলাকা অভিমুখে রওনা করিয়ে দেন। প্রেরণ করা হল পদাতিক বাহিনীও। তবে অধিকাংশ সৈন্যকে তিনি নিজের কাছে রেখে দেন। তিনি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সেই বাহিনীকে নিয়ে হাবশী ফৌজের পিছনে পিছনে এগিয়ে চলতে শুরু করেন।
পথেই রাত হয়ে যায়। হাবশী ফৌজ ছাউনি ফেলে। আল-আদেলের কমান্ডো সেনারা তৎপর হয়ে ওঠে। একদল হাবশীসেনা জেগে আছে। তারা তীরন্দাজ বাহিনী। তারা বিপুল পরিমাণ তীর ছুঁড়ে। তাতে কিছুসংখ্যক কমান্ডোসেনা শহীদ হয়ে যায়। কিন্তু তারা সুদানী বাহিনীর যে পরিমাণ ক্ষতিসাধন করে যায়, তা অসামান্য। সবচে বেশি ক্ষতিটা এই যে, তাতে হাবশী ফৌজের যুদ্ধ করার শক্তি-সাহস ও মনোবল ভেঙ্গে পড়েছে। তারা কল্পনা করে এসেছিল অন্যকিছু। তারা মুখোমুখি লড়াই করতে অভ্যস্ত। কিন্তু এখানে দুশমন তাদের চোখেই পড়ছে না। অথচ, তারা প্রলয় ঘটিয়ে ফিরে যাচ্ছে। হাবশী ফৌজ দিকহারা হয়ে পড়ে।
