নদীর কূলে পৌঁছে বেহারারা কাঁধ থেকে পালকি দুটি নামাল। পুরোহিতগণ এগিয়ে এসে কমান্ডার ও যোহরার পরিধানের পোশাক খুলতে শুরু করে। কমান্ডার চাঁদের আলোতে দেখতে পেলেন, বর্শাধারী রক্ষীদ্বয় ও পালকি বহনকারী হাবশী বেহারারা তাদের প্রতি পিঠ দিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গেছে। সম্ভবত এমনটা করা তাদের প্রতি নির্দেশ। কমান্ডার হঠাৎ সিংহের ন্যায় এক হাবশীর হাত থেকে তার বর্শাটা ছিনিয়ে নেন। লোকটা একজন অভিজ্ঞ সৈনিক। তিনি পিছনে সরে গিয়ে বর্শাধারী অপর হাবশীর পাজরে বর্শার আঘাত হানেন। আঘাতের ধাক্কায় তার হাতের বর্শাটাও ছিটকে পড়ে যায়। কমান্ডার চীৎকার করে বলে উঠলেন- দৌড়ে এস যোহরা। বর্শাটা তুলে নাও। যোহরা ছুটে আসে। কমান্ডার পড়ে যাওয়া বর্শাটায় পা দ্বারা লাথি মারেন। সেটি যোহরার সম্মুখে চলে যায়। যোহরা বর্শাটা হাতে তুলে নেয়। কমান্ডার বললেন- এবার তুমি পুরুষ হয়ে যাও। হাবশীরা খালী হাতে মোকাবেলা করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা বর্শার মোকাবেলা করতে পারল না। পুরোহিতগণ পালাতে উদ্যত হয়। কমান্ডার তাদেরকে দূরে যেতে দিলেন না। যোহরাও কমান্ডারের সঙ্গ নেয়। উভয় পুরোহিত খতম হয়ে যায়। অন্যরা মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে। কমান্ডারের বর্শা ঠান্ডা করে দেয় সকলকে। কমান্ডার যোহরাকে নিয়ে চৌকি অভিমুখে রওনা হন। বেশ কিছু পথ অগ্রসর হওয়ার পর দুজন অশ্বারোহী শান্ত্রী দেখতে পান। কমান্ডার তাদেরকে হাঁক দেন জলদি এদিকে এস।
সান্ত্রীরা তাদের কমান্ডারকে চিনে ফেলে। কমান্ডার তাদেরকে বললেন- ঘোড়া দুটো আমাদেরকে দাও। আমরা কায়রো যাচ্ছি। তোমরা চৌকিতে ফিরে যাও। কেউ যদি আমাদের সন্ধানে আসে, বলবে, আমরা তাদেরকে দেখিনি।
সিপাহীদ্বয় পায়ে হেঁটে চৌকিতে ফিরে যায়। কমান্ডার যোহরাকে একটি ঘোড়ার পিঠে তুলে বসান এবং নিজে অপরটিতে সাওয়ার হয়ে যোহরাকে বললেন, তোমার যদি অশ্বচালনার অভিজ্ঞতা নাও থাকে, তবু ভয় নেই। ঘোড়া তোমাকে ফেলবে না। কমান্ডার ঘোড়া হাঁকান। ঘোড়া ছুটতে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে যোহরা ভয়ে চীৎকার জুড়ে দেয়। কমান্ডার ঘোড়া থামিয়ে যোহরাকে তার ঘোড়া থেকে নামিয়ে নিজের ঘোড়ার পিছনে বসিয়ে নেন এবং অপর ঘোড়াটির বাগ নিজের ঘোড়ার সঙ্গে বেঁধে যোহরাকে বললেন, তুমি আমাকে শক্ত করে ধরে রাখ।
ঘোড়া পুনরায় ছুটে চলে। কমান্ডার পাহাড়ী এলাকা এড়িয়ে বেশ দূর দিয়ে এগিয়ে চলছেন। কায়রোর দিক ও পথ তার চেনা। এখনো তিনি দুমাইল পথ অতিক্রম করেননি, একদিক থেকে আওয়াজ আসে- থাম, কে তুমি? কমান্ডার থামলেন না। এক সঙ্গে চারটি ঘোড়া তাকে ধাওয়া করতে শুরু করে। কমান্ডার তার ঘোড়ার গতি আরো তীব্র করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তার। তিনি অপর ঘোড়াটিকে পাশে নিয়ে এসে তাতে সাওয়ার হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু চলন্ত অবস্থায় যোহরাকে নিয়ে ঘোড়া বদল করবেন কিভাবে। আকাশের চাঁদটা এখন ঠিক মাথার উপরে। জোসনার আলোয় অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। ধাওয়াকারী লোকগুলো অনেক কাছে চলে এসেছে।
দুটি তীর ধেয়ে এসে কমান্ডারের পাশ দিয়ে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে হাঁক আসে,- থাম বলছি। অন্যথায় তীর তোমার মাথায় বিদ্ধ হবে।
কমান্ডার ভাবছে, থামলেও মৃত্যু অবধারিত। এরা আমাদেরকে হাবশীদের হাতে তুলে দেবে আর হাবশীরা আজই আমাদেরকে যবাই করে ফেলবে। বাঁচতে হলে পালাবারই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তিনি ঘোড়াটিকে ডানে বাঁয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দৌড়াতে শুরু করেন, যাতে তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
কমান্ডারের বুঝটা ছিল ভুল। তার ও ধাওয়াকারীদের দূরত্ব কমে গেছে। কমান্ডার তাদের বেষ্টনীতে আটকা পড়ে গেছেন। পালকের পোশাক পরিহিত হওয়ার কারণে কমান্ডারকে পাখি বলে মনে হচ্ছে। যোহরার অবস্থাও একই। কমান্ডার চার ব্যক্তির দিকে তাকান। তার মনে সন্দেহ জাগে। তাদের একজন জিজ্ঞেস করে- তোমরা কারা? এই মেয়েটি কে? একজন বলল- কী জিজ্ঞেস করছ? দেখেই তো বুঝা যাচ্ছে, এরা সুদানী। পরেছে কি দেখ।
কমান্ডার হেসে ফেললেন এবং বলে উঠেন- দোস্তরা! আমি তোমাদের-ই ফৌজের একজন কমান্ডার। তিনি যোহরার পরিচয় প্রদান করেন এবং পুরো ঘটনা খুলে বলেন।
এরা চারজন মিশরের টহলসেনা। সুদানী ফৌজের অবস্থান খুঁজে ফিরল তারা। তারা কমান্ডার ও যোহরাকে নিয়ে কায়রো অভিমুখে রওনা হয়ে যায়।
***
দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ছয়জনের কাফেলা পরদিন রাতে কায়রো গির পৌঁছে। তাদেরকে সর্বপ্রথম আলী বিন সুফিয়ানের নিকট নিয়ে যাওয়া হয়। আল-আদেলকে রাতেই ঘুম থেকে জাগিয়ে জান্নানো হয়, চার হাজারের বেশি সুদানী হাবশী ফৌজ অমুক স্থানে লুকিয়ে আছে এবং সালার আল-কিনদ তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
আল-আদেল তৎক্ষণাৎ তার বাহিনীকে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন। সুলতান আইউবীর রণকৌশল মোতাবেক তিনি সম্মুখে অশ্বারোহী বাহিনীকে রাখেন। বাহিনীর পিছন অংশে দুপার্শ্বে রাখেন দুটি দল। নিজে অবস্থান নেন বাহিনীর মধ্যখানে। তিনি জানেন, এলাকাটা পাহাড়ী। তিনি ফৌজকে দুর্গ অবরোধের বিন্যাসে বিন্যস্ত করেন এবং কমান্ডারদের স্থানটা বুঝিয়ে দিয়ে অবরোধের-ই ন্যায় নির্দেশনা প্রদান করেন। পাহাড়ে উঠার জন্য তিনি আলাদা কমান্ডো দল ঠিক করে তাদেরকে নিজের কমান্ডে রাখেন।
