অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়গাম নিয়ে এসেছি- কমান্ডার বলল- আল্লাহ পাকের নিকট মুমিনের ভালোর-ই আশা রাখা উচিত।
সুলতান আইউবী কমান্ডার থেকে পত্ৰখানা বুঝে নিয়ে তাকে নিয়ে ভিতরে চলে যান। তিনি বার্তাটি পাঠ করে গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান।
এখনো কি জানা যায়নি যে, সুদানী সৈন্যরা মিশরে প্রবেশ করে কোন্ স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেছে? সুলতান জিজ্ঞেসা করেন।
তথ্য সগ্রহের জন্য গুপ্তচর ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কমান্ডার জবাব দেয়।
আমার অবর্তমানে মিশরে অবশ্যই কোন না কোন সমস্যা সৃষ্টি হবে, সে আশংকা আমার ছিল- সুলতান আইউবী বললেন- আমার ভাইকে বলবে, ভয় পেও না। কায়রোর প্রতিরক্ষা শক্ত কর। তবে শুধু প্রতিরক্ষা যুদ্ধ-ই লড়বে না। বেশির ভাগ সৈন্য নিজের কাছে রাখবে এবং জবাবী হামলার জন্য তাদের মধ্যে থেকে অভিজ্ঞ লোকদের বাছাই করে রাখবে। কিন্তু তাদেরকে শহরের বাইরে যেতে দেবে না। আমাদের বাহিনীর কোন তৎপরতা যেন শত্রুপক্ষ টের না পায়, যাতে তারা এই আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত থাকে যে, তারা আমাদের অসর্তকতার মধ্যে মিশর দখল করতে সক্ষম হবে। বুঝতে হবে, কায়রো আক্রান্ত হচ্ছে, সে খবর কায়রোবাসী জানে না। শক্ররা যাতে শহরকে অবরোধ করতে না পারে। তার আগেই পাল্টা হামলা করবে। আক্রমণ হওয়ার আগেই দুশমনের অবস্থান খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে হবে। যদি তাদের অবস্থানের সন্ধান মিলে যায়, তাহলে বেশি সৈন্য দ্বারা হামলা করাবে না। বরং যথাসম্ভব অল্প সৈন্য দিয়ে গেরিলা হামলা চালাবে। সীমান্ত বাহিনীতে সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি কর, যাতে শত্রুরা পালাতে না পারে। আমি ভেবে পাচ্ছিনা, এত বিপুলসংখ্যক সৈন্য সীমান্ত অতিক্রম করে কোন্ দিক থেকে প্রবেশ করল! কোন না কোন সীমান্ত চৌকির সহযোগিতা কিংবা উদাসীনতা ছাড়া এ ঘটনা ঘটতে পারে না। আল্লাহ তোমাদের সাফল্য দান করুন। দুশমন রসদ ও পিছন থেকে সাহায্য ছাড়া যুদ্ধ করতে পারবে না। তুমি. সীমান্তকে শক্তভাবে সীল করে দাও। যুদ্ধ যাতে দীর্ঘতর হয়, সে চেষ্টা করতে হবে, যাতে দুশমন না খেয়ে মরতে বাধ্য হয়। আমি তো তোমাদেরকে হাতে-কলমেই শিখিয়েছি, দুশমনকে বিক্ষিপ্ত করে কিভাবে যুদ্ধ করতে হয়। বিপুল সৈন্যের মোকাবেলা বিপুল সৈন্য দিয়ে মুখোমুখি যুদ্ধ করা আবশ্যক নয়।
আল-কিনদও একদিন গাদ্দার প্রমাণিত হবে, আমি কখনো ভাবিনি। তারপরও আমি বিষ্মিত নই। মানুষের ঈমান বিক্রি করতে সময় লাগে না। রাজত্বের শুধু কল্পনাই মানুষকে ঈমানহারা করতে পারে। ক্ষমতার নেশা কুরআনকে গেলাবদ্ধ করে সরিয়ে রাখে। আমার আফসোস আল-কিনৃদ-এর জন্য নয়- আমি ইসলামের ভবিষ্যৎ চিন্তায় অস্থির। আমার ভাইয়েরা একের পর এক খৃস্টানদের হাতে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এখানে আমার ভাইয়েরা আমার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আমার পীর ও মুরশিদ নুরুদ্দীন জঙ্গী দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। কাল-পরশু আমরাও চলে যাব। তার কী হবে? এই প্রশ্নটাই আমাকে অস্থির করে তুলছে। যা হোক, আমাদের চেষ্টা করতে হবে, যে কদিন বেঁচে থাকি, ইসলামের পতাকা অবনমিত হতে দেব না। আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। তোমরা আমাকে নিয়মিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করবে।
সুলতান আইউবী বার্তাবাহক কমান্ডারকে বিদায় করে দেন।
***
যে চৌকির কমান্ডার যোহরার সঙ্গে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল, তার এক সিপাহী কায়রো এসে রিপোর্ট করে, চৌকির কমান্ডারকে কয়েকদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। চৌকিতে যে নাচ-গানের আসর বসেছিল এবং এক নর্তকী কমান্ডারের তাঁবুতে ঢুকেছিল, সে তথ্য জানায়নি সিপাহী। এ তথ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, কমান্ডার দুশমনের সঙ্গে গিয়ে যোগ দিতে পারে এবং শক্র বাহিনী তার ই সহযোগিতায় সীমান্ত অতিক্রম করেছে। আলী বিন সুফিয়ান অভিমত ব্যক্ত করেন, চৌকিটি যেহেতু নদীপথ পাহারার জন্য স্থাপিত, সেহেতু দুশমন সেই নদীপথেই এসে থাকবে। সিদ্ধান্ত হল, একজন বিচক্ষণ কমান্ডারকে একদল রক্ষীসেনাসহ এই চৌকির দায়িত্ব পালনে প্রেরণ করা হবে।
চৌকির কমান্ডার ও যোহরা হাবশীদের হাতে আবদ্ধ। কিন্তু বন্দি হয়েও তারা বন্দি নয়। এখন তাদের পরনে রং-বেরংয়ের পক্ষীপালকের তৈরি পোশাক। তাদেরকে যে কক্ষে রাখা হয়েছে, সেটিও পাখির পালক ও ফুল দ্বারা সজ্জিত। বিশেষ ধরনের খাবার খাওয়ানো হচ্ছে তাদের। হাবশীদের পুরোহিত তাদের সামনে সেজদা করছে ও বিড়বিড় করে কি যেন পাঠ করছে। অন্য কাউকে তাদের সম্মুখে আসতে দেয়া হচ্ছে না। একবার তাদেরকে গাছের শক্ত ডাল ও লতার তৈরি পালকিতে করে নদীতে গোসল করিয়ে আনা হয়েছে। তারা ভেবেছিল, তাদেরকে বলী দেয়া জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাতে তারা একা থাকছে। কিন্তু বাইরে আট-দশজন হাবশী পাহারা দিচ্ছে। কমান্ডার একাধিকবার পালাবার পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোন সুযোগ মিলেনি।
এক রাতে হাবশীদের দুজন পুরোহিত তাদের কক্ষে আসে। কমান্ডার ও যোহরা তখন ঘুমিয়ে ছিল। তাদেরকে জাগানো হল। তারা ভাবে, তাদের মৃত্যু, এসে গেছে। পুরোহিতগণ তাদের সম্মুখে সেজদাবনত হয়ে উঠে বাইরে বেরিয়ে যায়। বাইরে দুটি পালকি রাখা আছে। তার একটিতে কমান্ডারকে, অপরটিতে যোহরাকে তুলে বসানো হল। দুজন করে হাবশী পালকি দুটি কাঁধে তুলে নেয়। পুরোহিতদ্বয় সামনে হাঁটতে শুরু করে। তারা সমকণ্ঠে কি যেন পাঠ করছে। পালকির পিছনে আরো দুজন হাবশী। তাদের হাতে বর্শা। তারা রক্ষীসেনা। কমান্ডার ও যোহরা নীরব। পাহাড়ী এলাকা থেকে বের হয়ে তারা নদীর দিকে এগিয়ে যায়। সময়টা মধ্য রাত। জোসনার আলোয় চারদিক ফক ফক করছে।
