যে পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভবপর ছিল, আলী বিন সুফিয়ান তা করে ফেলেছেন। তিনি আল-আদেলকে বিস্তারিত রিপোের্টও প্রদান করে প্রস্তাব পেশ করেছেন যে, পর্যবেক্ষণের জন্য দুজন দুজন ও চারজন চারজন করে সৈন্য চতুর্দিক ছড়িয়ে দেয়া হোক। তারা সুদানী ফৌজের অবস্থান খুঁজে বের করবে এবং তথ্য সংগ্রহ করবে, সুদানী হাবশী বাহিনী সত্যিই যদি ভিতরে ঢুকে গিয়ে থাকে, তাহলে তারা কোন্ দিক থেকে এল। তিনি আল-আদেলকে এই পরামর্শ প্রদান করেন যে, সুলতান আইউবীকে বিষয়টা না জানানো হোক। কেননা, সংবাদটা পেয়ে তিনি পেরেশান হওয়া ছাড়া কোন সাহায্য করতে পারবে না। কিন্তু আল-আদেলের মতে সুলতানকে বিষয়টা অবহিত করা আবশ্যক। তার আশংকা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তখন সুলতান আইউবীর উপস্থিতি আবশ্যক হয়ে পড়বে। তাই তিনি পূর্ণাঙ্গ একটি রিপোর্ট লিখে চারজন রক্ষীসহ এক সিনিয়র কমান্ডারকে সুলতানের উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দেন এবং তাকে নির্দেশ প্রদান করেন, প্রতিটি চৌকি থেকে ঘোড়া বদল করে নেবে এবং কোথাও দাঁড়াবে না।
***
রণাঙ্গনে সুলতান আইউবীর হেডকোয়ার্টার স্থির থাকছে না। তিনি দিনে এক জায়গায় থাকছেন, তো রাতে অবস্থান করছেন অন্য জায়গায়। ঘুরে-ফিরে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। কিন্তু তিনি এমন ব্যবস্থা কর রেখেছেন যে, প্রয়োজনে তাকে পাওয়া সহজ ব্যাপার। স্থানে স্থানে লোক বসিয়ে রাখা হয়েছে। তারা জানে, সুলতান কখন কোথায় অবস্থান করছেন। সুলতান আইউবীর অবস্থান একটি গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই নির্দেশক লোকগুলোকে নির্বাচন করা হয়েছে বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান দেখে।
তিনদিন পথ অতিক্রম করে আল-আদেলের বার্তাবাহক কমান্ডার চার রক্ষীসহ দামেস্ক পৌঁছে যায়। সুলতান এখন আলরিস্তানের পার্বত্য এলাকায় অবস্থান করছেন। প্রচন্ড শীত পড়ছে। লাগাতার দীর্ঘ পথচলার কারণে বার্তাবাহী কমান্ডার ও তার রক্ষীদের অবস্থা শোচনীয়। ক্ষুধা-তৃষ্ণা, অনিদ্রা ও অবিরাম চলার ফলে তাদের মুখমন্ডল লাশের ন্যায় শুকিয়ে গেছে। তবু তারা এক্ষুণি- এই মুহূর্তে সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে উদগ্রীব। সামান্য পানাহার করে কালবিলম্ব না করে তারা আলরিস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।
***
ত্রিপোলীর খৃস্টান সম্রাট খলীফা আল-মালিকুস সালিহ-এর সাহায্যে এসেছিলেন এবং যুদ্ধ না করেই ফিরে গিয়েছিলেন। কারণ, সুলতান আইউবীর বাহিনী তার বাহিনীর উপর অপ্রত্যাশিতভাবে গেরিলা হামলা চালায় এবং পিছন থেকে রসদ সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। পিছনে সুলতান আইউবীর বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে রেমন্ড তার বাহিনীকে অন্য দিক দিয়ে সরিয়ে নিয়ে যায়। সুলতান আইউবী তার পশ্চাদ্ধাবন সংগত মনে করলেন না। কেননা, তাতে সময় ও শক্তি দু-ই নষ্ট হত। তিনি অধিকাংশ গেরিলা সৈন্যকে রেমন্ডের রসদ দখল কিংবা ধ্বংস করার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বর্ষাও শুরু হয়ে গেছে। খৃস্টানদের রসদ বহর ছিল বিশাল।
রাতের বেলা। রেমন্ডের রসদ রক্ষণাবেক্ষণকারী সৈন্যরা ঘোড়াগাড়ির নীচে ও তাঁবুতে নিশ্চিন্তে শুনে আছে। এই রসদ তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আগামীকাল ভোরে রওনা হবে। দিন থেকেই যে কয়েক জোড়া চোখ পাহাড় ও পাথরের আড়াল থেকে তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে চলেছে, তা তারা জানে। না। সম্ভবত তাদের ধারণা, এই শীত আর বৃষ্টি-বাদলের মধ্যে কেউ তাদের উপর হামলা করতে আসবে না। কিন্তু রাতে হঠাৎ তাদের ক্যাম্পের একদিকে হৈ চৈ শুরু হয়ে যায়। ক্যাম্পে আগুন ধরে যায়। তাঁবুগুলো জ্বলছে। বিষয়টা সুলতান আইউবীর গেরিলা যোদ্ধাদের অভিযানের ফসল। তারা প্রথমে ছোট ছোট মিনজানীক দ্বারা দাহ্য পদার্থভর্তি পাতিল নিক্ষেপ করে। তারপর জ্বলন্ত সলিতাওয়ালা তীর ছোঁড়ে। ক্যাম্পে আগুন ধরে যাওয়ার পর জ্বলন্ত আগুনের আলোতে তারা হামলা করে বসে। বর্শা ও তীরের আক্রমণে বহু খৃস্টান সেনাকে খতম করে তারা পর্বতমালার অভ্যন্তরে অদৃশ্য হয়ে যায়।
দ্বীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত সন্নিকটস্থ পাহাড় থেকে খৃস্টানদের ক্যাম্পের উপর তীর বর্ষিত হতে থাকে। তারপর হামলা চালায় অপর একটি কমান্ডো দল। সকাল নাগাদ দেড় মাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত সুবিশাল ক্যাম্পটিতে যা কিছু পড়ে আছে, তা খৃস্টানদের ফেলে যাওয়া রসদ, নিহতদের লাশ আর গুরুতর আহত ক্রুসেডসেনা। অনেকগুলো ঘোড়া হাঁকিয়ে নিয়ে গেছে খৃস্টানরা। ফেলেও গেছে বহুসংখ্যক। কমান্ডোদের বিরতির সময়টায় খৃস্টানরা কিছু ঘোড়াগাড়ি নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছে। ফেলে যাওয়া রসদ ও ঘোড়াগুলো সুলতান আইউবীর সৈন্যরা কজা করে নিয়ে যায়।
হালবের অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছিল। সুলতান আইউবী এই গুরুত্বপূর্ণ নগরীটিকে পুনরায় অবরোধ করার পরিকল্পনা করেছেন। দিনের বেলা গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার সুলতানকে বিগত রাতের কমান্ডো অভিযানের রিপোর্ট প্রদান করছে। এমন সময় দারোয়ান তাঁবুতে প্রবেশ করে সুলতানকে সংবাদ দেয়, কায়রো থেকে এক কমান্ডার বার্তা নিয়ে এসেছেন। বার্তা বহন করে থাকে দূত। সে জায়গায় কমান্ডারের নাম শুনে সুলতান আইউবী দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং কোন ভূমিকা ছাড়াই বললেন- খরব ভাল তো?….তুমি কেন এসেছ?
