আল-কিনদ-এর ঘরে দুজন স্ত্রী ছিল। ছিল মদ-মাদকতার বিপুল আয়োজন। আল-কিনৃদ সম্পর্কে প্রসিদ্ধ ছিল, তিনি মদপান করেন না। এখন প্রমাণ পাওয়া গেল, রাতে ঘরে বসে তিনি মদপান করতেন। আলী বিন সুফিয়ান স্ত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে মূল তথ্য হাসিল করেন। নতুন যে যুবতী স্ত্রী বৃদ্ধা পরিচারিকাকে চাকর দ্বারা খুন করিয়েছে, তার জবানবন্দী ছিল সবচে গুরুত্বপূর্ণ। অন্য সব স্ত্রীর একই কথা, আপনার যত তথ্যের প্রয়োজন, সব নতুন বেগমের বুকে লুক্কায়িত। তথ্য পাওয়া গেল, এই নতুন স্ত্রী মিশরী নয় সুদানী এবং বাহির থেকে অপরিচিত লোকজন আসলে শুধু এ মেয়েটি-ই তাদের সঙ্গে কথা-বার্তা বলত, খোলামেলা চলত এবং মদপান করত। অন্যান্য স্ত্রীদের সরল-সহজ কথায় বুঝা গেল, তারা আর কিছু জানে না।
আল-কিনদ-এর স্ত্রীকে আলাদা করে ফেলা হল। আলী বিন সুফিয়ান বৃদ্ধা চাকরানীর খুনী চাকরকে বললেন- এখন আর কিছু লুকাবার চেষ্টা করে লাভ নেই। যা জানা আছে, বলে ফেল। আমাকেও কষ্ট দিও না, নিজেও কষ্ট পেও না।
চাকর জানে, লুকোচুরি করতে গেলে পরিণতিটা কী হবে। বলল, হুজুর! আমি একজন চাকর মাত্র। আমি হুকুমের গোলাম। দুপয়সা পাওয়ার আশায় মনিবের সব নির্দেশ মেনে চলতাম। এখন আমি আপনার অনুগত। কিছু লুকাব না; যা জানি সবই বলে দেব। শুনুন–
দেশের একজন সেনা অধিনায়কের গোপন পরিকল্পনা এক গৃহভৃত্যের জানা থাকার কথা নয়। তবু চাকর বলল, আল-কিনৃদ যাওয়ার সময় বলে গেছেন, আমার আসতে অনেকদিন বিলম্ব হবে এবং কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবে, তিনি কোথায় গেছেন, আমরা জানিনা। ভৃত্য আসলেই জানত না, আল-কিনৃদ কোথায় গেছেন।
আলী বিন সুফিয়ান আল-কিনদ-এর নতুন স্ত্রীকে দুজন লোকের সঙ্গে তাঁর বিশেষ পাতাল কক্ষে পাঠিয়ে দেন। নিজে আরো কিছু তত্ত্ব-তালাশ নিয়ে এবং আল-কিনৃদ-এর ঘরে প্রহরা বসিয়ে নিজ দফতরে চলে যান, যেখানে আল কিনৃদ-এর নিরস্ত্র দেহরক্ষীরা কঠোর প্রহরায় বসে আছে। আলী বিন সুফিয়ান এসে-ই তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন- তোমরা মিশর ও সিরিয়ার সম্মিলিত বাহিনীর সৈনিক। কিছু গোপন রাখবার চেষ্টা করলে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদন্ড। আর যদি আমার নির্দেশ পালনপূর্বক সালার আল-কি-এর তৎপরতার কথা প্রকাশ করে দাও, তাহলে মুক্তি পেতে পার।
রক্ষী কমান্ডার বলতে শুরু করে। তার বক্তব্যে প্রমাণিত হয়ে যায়, আল কিদ-এর নিকট খৃস্টান ও সুদানী লোকজন আসা-যাওয়া করত এবং তিনি গাদ্দারীতে লিপ্ত। তবে আল-কিদ কোথায় গেছেন, তা তারও জানা নেই।
দুপুর রাতে আলী বিন সুফিয়ান পাতাল কক্ষে যান। আল-কিনৃদ-এর নতুন স্ত্রী সংকীর্ণ একটি প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ। তাকে সন্ত্রস্ত করার উদ্দেশ্যে তার কক্ষে অন্য এমন এক পুরুষ কয়েদীকে রাখা হয়েছে, যে লাগাতার নির্যাতন অত্যাচারে জর্জরিত। লোকটা খৃস্টানদের গুপ্তচর। নিজে ধরা পড়লেও সতীর্থদের সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছে না। অলি-কিদ-এর স্ত্রী সেই দুপুর থেকে তার সঙ্গে এক প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ। তার তড়পানি ও ছটফটানি প্রত্যক্ষ্য করেছে সে।
এখন মধ্যরাত। মেয়েটা রাজকন্যা। এই সংকীর্ণ পাতাল কক্ষের গন্ধই তাকে পাগল বানাবার জন্য যথেষ্ট। তদুপরি বন্দি লোকটার শোচনীয় অবস্থা দেখে দেখে তার রক্ত শুকিয়ে গেছে। আলী বিন সুফিয়ান যখন সম্মুখে গিয়ে উপস্থিত হন, তখন সে হাউমাউ করে চীৎকার জুড়ে দেয়। আলী তাকে সেখান থেকে বের করে অন্য একটি কক্ষের সামনে নিয়ে যান। সেটিও একটি অপ্রশস্ত প্রকোষ্ঠ। কৃষ্ণকায় এক হাবশী তাতে আটক রয়েছে। লোকটার ভয়ানক দেহ। মহিষের মত শরীর। সে সীমান্ত বাহিনীর এক কমান্ডারকে খুন করেছিল। আলী বিন সুফিয়ান মেয়েটিকে বললেন, বাকী রাতটুকু তোমাকে এর সঙ্গে কাটাতে হবে। মেয়েটি চীৎকার করে উঠে আলীর পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে।
আপনার যা যা জানার প্রয়োজন, আমাকে জিজ্ঞেস করুন। আলীর দুপা জড়িয়ে ধরে মেয়েটি বলল।
আল-কিনদ কোথায় গেছে? কেন গেছে? তার লক্ষ্য কী? আলী জিজ্ঞেস করলেন। তার সম্পর্কে আরো যা যা তোমার জানা আছে, সব বলে দাও।
আল-কিনদ-এর স্ত্রী মাথা তুলে দাঁড়ায়। স্বামী সম্পর্কে যা কিছু জানা ছিল, সবই বলে দেয়। তবে আল-কিদ কোথায় গেছে, সেও জানেনা। মেয়েটি জানায়, সুদান থেকে হাবশী সৈন্য আনা হচ্ছে। তারা কোন এক রাতে কায়রো আক্রমণ করে সমগ্র মিশর দখল করে নেবে।
মেয়েটি মদপান করানোর দায়িত্ব পালন করত। সেই সুবাদে আল-কি এর ঘরে গমনাগমনকারী খৃস্টান ও সুদানী মেহমানরা তার সম্মুখেও কথা-বার্তা বলত। সুদানের ধনাঢ্য কোন এক ব্যক্তির কন্যা আল-কিনৃদ-এর এই স্ত্রী। আল-কিদ-এর জন্য তাকে উপহার স্বরূপ পাঠানো হয়েছিল। আল-কিনৃদ তাকে বিয়ে করে নিয়েছিল। মেয়েটা বেশ সতর্ক ও দুরন্ত। সুদানীদের লক্ষ্য তার ভালভাবেই জানা আছে। আল-কিনৃদ-এর বাসভবনে যে বিপুল পরিমাণ সোনা ও নগদ অর্থ পাওয়া গিয়েছিল, তার বর্ণনামতে সেগুলো সুদান থেকে এসেছে। এগুলো যুদ্ধের ব্যয় এবং মিশরের সেনাবাহিনী থেকে গাদ্দার ক্রয়ের মূল্য। বিপুল সংখ্যক হাবশী সৈন্য এসে কোথায় জমায়েত হয়েছে, মেয়েটি সে ব্যাপারে অবহিত নয়। সে এতটুকু জানে যে, সমুদ্র পথে এসে তারা তীরবর্তী কোন একস্থানে অবস্থান নিয়েছে এবং তাদের হামলা হবে গেরিলা ধরনের।
