বৃদ্ধা পরিচারিকা আরো কিছু কথা বলে আলী বিন সুফিয়ানকে স্বপ্রমাণিত করে দেয়, সালার আল-কিনৃদ না অপহরণ হয়েছে, না খুন, না সে রাষ্ট্ৰীয় দায়িত্ব পালন করতে কোথায় গিয়েছে। মিশরে নাশকতা ও গাদ্দারী এতই বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বেড়ে চলছে যে, একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকেও সন্দেহ না করে পারা যাচ্ছিল না। কিন্তু তথাপি আল-কিনৃদ-এর উপর কখনো কারো সন্দেহের চোখ পড়েনি। লোকটা তার সন্দেহজনক সকল অপতৎপরতা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে গোপন রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে আলী বিন সুফিয়ানও অতিশয় দূরদর্শী গোয়েন্দা। এক্ষেত্রে তার জন্য সমস্যা হচ্ছে, সালার পদমর্যাদার ব্যক্তির ঘরে উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া তল্লাশী নেয়া যায় না। এ কাজের জন্য মিশরের অস্থায়ী সুপ্রীম কমান্ডার আল-আদেল-এর অনুমতি আবশ্যক। তাই তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে নিজের একজন রক্ষীসেনাকে প্রেরণ করে তিন চারজন গোয়েন্দা ডেকে আনেন এবং তাদেরকে আল-কি-এর ঘরে এদিক ওদিক লুকিয়ে রাখেন। তাদেরকে নির্দেশ প্রদান করেন, কোন পুরুষ কিংবা নারী ঘর থেকে বের হলে তার পিছু নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবে।
আল-কিনদ-এর ঘর থেকে বের হয়ে আলী বিন সুফিয়ান রক্ষী কমান্ডারকে নির্দেশ দেন, তোমার নিজের এবং অধীন সকল রক্ষীসেনার অস্ত্র ভিতরে রেখে দাও এবং সবাই আমার সঙ্গে চল। বার সদস্যের রক্ষী বাহিনীটিকে নিরস্ত্র করে আলী বিন সুফিয়ান সঙ্গে করে নিয়ে যান এবং আল-আদেলকে বিস্তারিত রিপোর্ট প্রদান করেন। আল-আদেল তাঁকে আল-কিনৃদ-এর ঘরে হানা দিয়ে তল্লাশী নেয়ার অনুমতি দিয়ে দেন। আলী বিন সুফিয়ান সময় নষ্ট না করে অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান।
ওদিকে ইতিমধ্যে আল-কিনদ-এর ঘরে ঘটে গেছে আরেক ঘটনা। আলী বিন সুফিয়ান যখন সেখান থেকে বের হয়ে আসেন, তখন আল-কিনৃদ-এর এক স্ত্রী- যে বয়সে যুবতী- পরিচারিকাকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, আলী বিন সুফিয়ান তোমাকে কী বললেন এবং তুমি কী জবাব দিলে? উত্তরে বৃদ্ধা বলল, তিনি আমাকে সালার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছেন এবং আমি বলেছি, আমি গরীব মানুষ, এই ঘরের একজন চাকরানী। তিনি কোথায় গেছেন, আমি তা জানিনা।
তোমার অনেক কিছু জানা আছে- স্ত্রী বলল- তাকে তুমি অনেক তথ্য বলে দিয়েছ।
বৃদ্ধা তার বক্তব্যে অটল থাকে। স্ত্রী এক চাকরকে ডেকে তাকে সব ঘটনা শুনিয়ে বলল- এই বৃদ্ধার মুখ থেকে কথা বের কর। বলছে, ও নাকি কিছুই বলেনি।
চাকর বৃদ্ধার মাথার চুল মুঠি করে ধরে এমন ঝটকা টান মারে যে, বৃদ্ধা চক্কর খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। চাকর তার ধমনিতে পা রেখে চাপ দেয়। বৃদ্ধার চোখ দুটো বাইরে বেরিয়ে আসে। চাকর দাঁতে দাঁত পিষে বলল, বল, ওকে কী কী বলেছিস? সে পা সরিয়ে নেয়।
বৃদ্ধা নিথর-নিস্তব্ধ পড়ে আছে। উঠে দাঁড়াবার শক্তি নেই। চাকর তার পাজরে লাথি মারে। বৃদ্ধা ছটফট করতে শুরু করে। চাকরের নির্যাতনে বৃদ্ধা আধমরা হয়ে পড়ে থাকে। এবার সে বলল- আমাকে জীবনে মেরে ফেল। আমি আমার শহীদ পুত্রের আত্মার সঙ্গে গাদ্দারী করতে পারব না। তুমি একজন ঈমান-বিক্রেতার অসৎ স্ত্রী। আমি তোমাকে পরোয়া করি না।
একে পাতাল কক্ষে নিয়ে শেষ করে দাও- স্ত্রী বলল- রাত হলে লাশ গুম করে ফেলবে। আমরা এখনো বিপদমুক্ত নই। লোকটা আমাদের রক্ষী সেনাদেরকে নিরস্ত্র করে সঙ্গে নিয়ে গেছে। এই হতভাগা বৃদ্ধার অনেক তথ্য জানা আছে। একে তথ্যসহ মাটিতে পুঁতে ফেল।
বৃদ্ধা মেঝেতে পড়ে আছে। অবস্থা তার মৃতপ্রায়। চাকর তাকে গাষ্টির মত করে কাঁধে তুলে নেয়। কক্ষ থেকে বের হয়ে বারান্দা অভিমুখে পা বাড়ায়। এমন সময় আওয়াজ আসে- থাম। লোকটি ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। অনেক সৈন্য ধেয়ে আসছে। ঘর তাদের অবরুদ্ধ। আলী বিন সুফিয়ানের নির্দেশে তারা মহলের সমস্ত কক্ষ ও বারান্দায় ছড়িয়ে পড়ে। চাকর পালাতে ব্যর্থ হয়। তার কাঁধ থেকে বৃদ্ধাকে নামানো হল। বৃদ্ধার মুখ থেকে রক্ত বের হচ্ছে। সে চোখ খুলে তাকায়। সম্মুখে আলী বিন সুবিয়ানকে দেখামাত্র তার চেহারায় হাসি ফুটে ওঠে। সে বলল- ইতিপূর্বে আমার ঠিক জানা ছিল না, এই ঘরে কী হচ্ছে। তুমি আসার পর আমার সন্দেহ পোক্ত হয়ে যায় যে, সমস্যা একটা আছে।
বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে আসছে। সে বড় কষ্টে বলল যে, আল-কিদ-এর নতুন বেগম এবং তার এই চাকর আমার মুখ থেকে বের করবার চেষ্টা করেছে যে, আমি তোমাকে কী বলেছি। ওরা আমাকে পিটিয়ে শেষ করে ফেলেছে।
আলী বিন সুফিয়ান এক সিপাহীকে বললেন- একে এক্ষুণি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। বৃদ্ধা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল- আমাকে কোথাও পাঠিও না। আমি আমার শহীদ পুত্রের নিকট চলে যাচ্ছি। তোমরা আমাকে বাঁধা দিও না।
বৃদ্ধা চিরদিনের জন্য নীরব হয়ে যায়।
আল-কিনদ-এর বাসগৃহের প্রতিটি কোণ তল্লাশী নেয়া হল। পাতাল কক্ষে গিয়ে থ খেয়ে যান গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ান। যেন এক অস্ত্রগুদাম। ঘর থেকে উদ্ধার হল বিপুল পরিমাণ সোনা ও নগদ অর্থ। পাওয়া গেল আল-কিদ-এর নামাংকিত একটি সীল, যাতে আল-কিনৃদকে ভূষিত করা হয়েছে সুলতানে মেসের অভিধায়। বিজয়ের ব্যাপারে আল কিনৃদ এতই নিশ্চিত যে, মিশরের সুলতান হিসেবে নিজ নামে সীল মোহরও তৈরী করে রেখেছেন! এই সীলমোহর আলী বিন সুফিয়ানের সব। সন্দেহকে দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত করে দেয়।
