হাবশীরা তাদের খোদাকে দেখেছে কি?- একজন জিজ্ঞেস করল।
তুমি যদি উপস্থিত থাকতে, তাহলে দেখতে আমরা কিরূপ বিচক্ষণতার সাথে তাদেরকে খোদা দেখিয়েছি- লোকটি জবাব দেয়- মূর্তির সম্মুখের পাহাড় থেকে প্রজ্বলমান সলিতাওয়ালা দুটি তীর নিক্ষেপ করা হয়। তীরন্দাজরা অন্ধকারের মধ্যে এমন নিশানা করে যে, তীর গিয়ে ঠিক জায়গায় বিদ্ধ হয়। আমরা বেশ কিছু জায়গা জুড়ে জ্বালানী ছড়িয়ে রেখেছিলাম। শুরুতেই দুটি তীর তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এন্ড্রোসন একজন অভিজ্ঞ মানুষ। তিনি বলেছিলেন, আগুনের শিখায় মূর্তিটি হাসছে ও দুলছে দেখা যাবে। আমাদেরই নিকট তো মনে হচ্ছিল, যেন মূর্তিটি মুখ ও ঠোঁট নাড়াচাড়া করছে। বরং মুখটাও ডানে-বাঁয়ে নাড়াচ্ছে।
তখন হাবশীরা কী প্রতিক্রিয়া দেখাল?
তারা সেজদায় লুটিয়ে পড়েছিল- লোকটি জবাব দেয়- অভ্যন্তরে দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত তার গুঞ্জন চলতে থাকে। আমি অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাইনি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, হাবশীরা ভয়ে কেঁপে থাকবে। আল-কি এর নাটক সম্পূর্ণরূপে সফল হয়েছে। আলো নিভে গেলে আমরা আল দিকে পোশাক পরিয়ে মূর্তিটির কোলে বসিয়ে দেই। চারজন লোক পূর্ব থেকেই সেখানে একস্থানে লুকিয়ে বসেছিল। সম্মুখের পাহাড় থেকে মূর্তির গায়ে আলো বিচ্ছুরণের ধারাও বেশ সফল হয়। পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের গায়ে যে আগুন জ্বালানো হয়, তা নীচ থেকে কেউ দেখেনি। তার সন্নিকটে বড় একটি আয়না রেখে মূর্তির উপর আলোর প্রতিবিম্ব নিক্ষেপ করা হলে মনে হল, যেন এটি মূর্তির চেহারার নূর। তারই মধ্য থেকে যখন আল-কি খোদা সেজে নেমে আসেন, তখন আমাদের মেয়েরা সবাইকে নিশ্চিত করে যে, ইনিই খোদা এবং তারা পরী। আমরা এ যাবত কোন পদক্ষেপে ব্যর্থ হয়নি। এখন আল-কিনদকে এক স্থানে বসিয়ে রেখে সকল হাবশীকে তার সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করা হবে এবং বলা হবে ইনি-ই তোমাদের খোদা, যিনি যুদ্ধে তোমাদের সঙ্গে থাকবেন।
আচ্ছা, এ দুজনকে (কমান্ডার ও যোহরার প্রতি ইংগিত করে) কি আজই বলি দেয়া হবে।
সে সিদ্ধান্ত নেবে হাবশীরা। সম্ভবত তারা তাদেরকে তিন-চারদিন লালন পালন করবে এবং কিছু রীতি-নীতি পালন করবে।
তারা কারো কণ্ঠস্বর শুনতে পায়- সেনাপতিকে এমন একটা নাটক সাজাতে হবে, আমার জানা ছিল না। অপর একজন বলল- এছাড়া হাবশীদের দ্বারা যুদ্ধ করানো সম্ভবও ছিল না। এই নাটক বেশ কাজ দিচ্ছে।
কণ্ঠস্বরটা আল-কিদ ও তার সহযোগী লোকদের। তারা নিকটে এগিয়ে এলে ব্যক্তিদ্বয় বলল, এজজন পুরুষ ও একজন মেয়ে ঘটনাক্রমে আমাদের হাতে এসে গেছে। তাদেরকেই হাবশীদের হাতে তুলে দেয়া যায়। আল-কিনদ তারা কারা জিজ্ঞেস না করেই মাথা থেকে মুকুটটা সরিয়ে ফেলে কমান্ডার ও যোহরাকে যে কক্ষে রাখা হয়েছে, সে কক্ষে ঢুকে পড়েন। সে কমান্ডারকে চিনতে না পারলেও কমান্ডার তাকে চিনে ফেলেন। বাইরে কী কথা-বার্তা হয়েছিল, কমান্ডার সেসব শুনে ফেলেছেন। তিনি একাধিকবার আল-কি এর নামও শুনেছেন। তিনি এও জেনে ফেলেছেন যে, তাকে ও যোহরাকে বলি দেয়া হবে। কাজেই আল-কিদ কক্ষে প্রবেশ করার পর তিনি মোটেই বিষ্মিত হননি যে, তার সালার এখানে কেন এবং কিভাবে এলেন।
আল-কিনদ এই বলে বাইরে বেরিয়ে যায় যে, এদেরকে হাবশীদের পুরোহিতদের হাতে তুলে দাও।
***
তিন-চারদিন পর। কায়রোতে আল-আদেল আলী বিন সুফিয়ানকে ডেকে বললেন- তিন-চার দিন হল, আল-কিনৃদকে পাওয়া যাচ্ছে না। যখন-ই তলব করি, জবাব আসে, তিনি নেই। তার ঘর থেকেও একই জবাব আসছে। লোকটা কোথায় গিয়ে থাকতে পারে?
সীমান্ত বাহিনীর পরিদর্শনে যদি সীমান্ত সফরে গিয়ে থাকে, তাহলে তো আপনাকে জানিয়ে যেত। আলী বিন সুফিয়ান বললেন- এ মুহূর্তে আমার যা ধারণা, তাহল, তাকে সন্ত্রাসীরা অপহরণ কিংবা খুন করে থাকতে পারে।
এও তো হতে পারে যে, সে নাশকতাকারী সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। আল-আদেল বললেন।
তার ব্যাপারে এমন সন্দেহ তো অতীতে কখনো জাগেনি- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- আচ্ছা, আমি তার ঘরে গিয়ে খবর নিচ্ছি।
আলী বিন সুফিয়ান আল-কিনদ-এর ঘরে চলে যান। বারজন দেহরক্ষী উপস্থিত। রক্ষী কমান্ডারকে জিজ্ঞাসা করেন, আল-কিনৃদ কোথায়? কমান্ডার অজ্ঞতা প্রকাশ করে। একজন দেহরক্ষীও বলতে পারে না, আল-কিনৃদ কোথায় গেছে। পরিচারিকাকে বাইরে ডেকে এনে বললেন, আল-কিনৃদ-এর স্ত্রীদেরকে জিজ্ঞেস কর, সে কোথায় গেছে। পরিচারিকা আলী বিন সুফিয়ানকে ভিতরে নিয়ে একটি কক্ষে বসতে দেয়। বৃদ্ধা মহিলা বলল, আপনি ঘর থেকে আল-কিনৃদ-এর সন্ধান পাবেন না। আমি আজ বেশ কিছুদিন পর্যন্ত এখানে যা কিছু দেখছি, তা আপনাকে বলে দিচ্ছি। আমার জীবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনার। তবে আমি মরে গেলেও তেমন কিছু আসবে যাবে না। আমি বিধবা। স্বামী মারা গেছেন বহু আগে। আমার একটি মাত্র পুত্র ছিল। সুদানের লড়াইয়ে সে শাহাদাতবরণ করেছে। নিরূপায় হয়ে আমি এখানে চাকুরী নিয়েছিলাম। এরা আমাকে গরীব এবং সহজ-সরল মহিলা মনে করে। তাদের জানা ছিল না, একজন শহীদের মা দেশ ও ধর্মবিরোধী কোন তৎপরতা সহ্য করতে পারে না, যার জন্য তার পুত্র জীবন দিয়েছে। এ ঘরে দীর্ঘদিন যাবত সন্দেহভাজন লোকদের আনাগোনা চলছিল। এক রাতে এক ব্যক্তি আসিল। লোকটা আরবী পোশাক পরিহিত। মুখে দাড়ি। আমাকে ডেকে বলা হল, মদের ব্যবস্থা কর। লোকটা ভিতরে প্রবেশ করে মুখের কৃত্রিম দাড়ি ও গোঁফ খুলে ফেলে। তার আগে থেকেই-ই এখানে এমন সব লোকদের আসা-যাওয়া চলছিল, যাদের প্রতি আমার সন্দেহ ছিল যে, এদের উদ্দেশ্য ভাল নয়। আমার কানে আমি অর্ধেক মিশর সুদানের-মিশরের রাষ্ট্রক্ষমতা- এক রাতেই কাজ হয়ে যাবে- ইত্যাদি বাক্যও শুনেছি। সালার আল-কিদ রাতে বের হতেন। তার সঙ্গে দুজন অপরিচিত লোক থাকত। আমি সালারকে রক্ষী কমান্ডারের সঙ্গেও কানে কানে কথা বলতে দেখেছি।
