কমান্ডার সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। যোহরার ঘোড়া তার পাশাপাশি দৌড়াচ্ছে। হঠাৎ তারা শুনতে পায়- তোমরা যাদেরকে ডাকছ, তারা অনেক দূরে- সম্মুখে।
তোমরা কারা?- কমান্ডার জিজ্ঞেস করেন। এদিকে এস।
আমরা পথিক- তারা জবাব দেয়। সঙ্গে সঙ্গে দুটি ঘোড়া কমান্ডারের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে। পরক্ষণেই আরো একটি আওয়াজ আসে –আপনারা সামনের দিকে অগ্রসর হোন; আমরা আপনাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব।
কমান্ডার তরবারী হাতে নেন। রাতের বেলা মুসাফিরদের ঘোড়ায় সওয়ার হওয়া এবং এই এলাকায় অবস্থান করা সন্দেহজনক। তারা কমান্ডারের নিকটে চলে আসে। একজন কমান্ডারকে বলল- ওদিকে দেখুন, ওরা আসছে। কমান্ডার যেই মাত্র ওদিকে তাকালেন, সঙ্গে সঙ্গে লোকটি এক হাতে কমান্ডারের ঘাড়টা ঝাঁপটে ধরে এবং অপর হাতে তার তরবারীধারী হাতের কনুই ধরে ফেলে। অপর ব্যক্তি মেয়েটিকে ঝাপটে ধরে। কমান্ডারকে পাকড়াওকারী লোকটি তার ঘোড়া হাঁকায়। ফলে কমান্ডার ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এমন সময়ে অন্ধকার ভেদ করে আরো দুজন লোক দৌড়ে আসে। তারা কমান্ডারকে সম্পূর্ণ আয়ত্ত্বে নিয়ে নেয়।
লোকগুলো বাদকদল, যারা মূলত প্রশিক্ষিত গেরিলা সৈনিক। যোহরা তাঁবু থেকে বের হলে তাদের-ই দু-তিনজন লোক তার পিছু নিয়েছিল। তারা পরিকল্পনা মাফিকই কমান্ডার ও যোহরাকে ধরে ফেলেছে। তাদের একজন বলল- এদেরকে জীবিত নিয়ে চল। এরূপ সন্দেহভাজন লোক ধরা পড়লে জীবিত নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
তারা কমান্ডার ও যোহরাকে পাহাড়ের দিকে নিয়ে রওনা হয়। কমান্ডার দেখতে পান, সমুদ্রতীরে বেশ কটি নৌকা থেকে হাবশীরা নামছে এবং কি যেন মাল-পত্র খালাস করছে। লোকগুলো সুদানী হাবশী যোদ্ধা এবং মাল পত্রগুলো তাদের যুদ্ধাস্ত্র ও রসদ।
***
পাহাড়ের অভ্যন্তরে হাজার হাজার হাবশী এখনো নিশ্চুপ বসে আছে। পাহাড়ের গায়ে প্রজ্বলিত শিখাঁটি নিভে গেছে অনেক আগে। হাবশীদের ধর্মীয় সঙ্গীতের সুর মুছনা শোনা যাচ্ছে। তারা ধীরে ধীরে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ছে। তারা নিজেদেরকে সেই হাবশীদের তুলনায় মর্যাদাসম্পন্ন ভাবতে শুরু করেছে, যারা সুদানে পড়ে রয়েছে।
সঙ্গীতের সুর থেমে গেছে। হঠাৎ সম্মুখের পাহাড়টির গায়ে আলোর ঝিলিক চমকে ওঠে, যেন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আবার আলো চমকায়। আলোটা আৰু সম্বল মূর্তিটির গায়ে গিয়ে পড়ছে। আলোটা কোথা থেকে আসছে, বোঝা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, যেন মূর্তিটির চেহারা নিজ আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।
আলো নিভে গেছে। কিছুক্ষণ পর আবার আলো জ্বলে উঠে। সবাই দেখছে, পাহাড়সম মূর্তিটির কোল থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এসে সামনের দিকে হাঁটছে। মূর্তিটির পিছন থেকে আত্মপ্রকাশ করে চারজন মানুষ। প্রত্যেকের গায়ে মাত্র একটি করে সাদা চাদর। সেই চাদরে তাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত আবৃত। মূর্তির কোল থেকে বেরিয়ে আসা লোকটিকে রাজার মত দেখাচ্ছে। তার মাথায় রাজমুকুট। মুকুটের উপর একটি কৃত্রিম সাপের ফনার ছায়া। গায়ের চোগাটা লাল। অজ্ঞাত স্থান থেকে আসা আলোকরশ্মিটি তার উপর পতিত হয়ে চলছে। চোগার গায়ে অসংখ্য তারকা। আলোর চমকে সেগুলো চমকাচ্ছে ও মিটমিট করে জ্বলছে। লোকটার এক হাতে বর্শা, অপর হাতে নাঙ্গা তরবারী। সাদা চাদর পরিহিত লোকগুলো তার পিছনে পিছনে হাঁটছে।
তারা পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নীচের দিকে নেমে আসছে এবং আলোটাও তাদের সঙ্গে সঙ্গে আসছে। এবার সম্মুখের লোকটি দাঁড়িয়ে যায়। পিছনের লোকগুলো সমস্বরে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠে- আমাদের খোদা ধরায় নেমে এসেছেন। তোমরা সেজদায় লুটিয়ে পড়। তারপর মাথা তুলে তোমাদের খোদাকে মন ভরে দেখ।
সব মানুষ সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। তারপর মাথা তুলে খোদাকে দেখে। খোদা একটি তরবারী উচ্চে তুলে ধরে রেখেছেন। তিনি ঢালু বেয়ে নীচে নামছেন। ময়দানে এমন নীরবতা বিরাজ করছে, যেন একজন মানুষও নেই। লোকটি নামতে নামতে জনতার ভীড়ের সন্নিকটে একটি উঁচুস্থানে এসে দাঁড়ায়। জায়গাটা প্রশস্ত। আলোটা শুধু তার এবং তার লোকদের উপর-ই পড়ছে। হঠাৎ চারটি মেয়ে সেই আলোর ভিতরে ঢুকে পড়ে। মেয়েগুলো আধা উলঙ্গ। গায়ের রং গৌর। পিঠের উপর কাঁধ থেকে সামান্য নীচে পাখির পালকের ন্যায় পালক। মাথার চুল খোলা। তারা এমনভাবে নড়াচড়া করছে, যেন তারা উড়ছে। তারা নাচের ভঙ্গিমায় হাবশীদের খোদার চার পায়ে কিছুক্ষণ চক্কর কেটে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়।
চার ব্যক্তি কমান্ডার ও যোহরাকে একটি গুহায় নিয়ে যায়। তাদেরকে গুহার একটি কক্ষে রেখে একজন বাইরে বেরিয়ে যায়। লোকটি আরো এক ব্যক্তিকে সঙ্গে করে ফিরে আসে। তাকে জানানো হল, এই লোকটিকে নদীর কূল থেকে এমন এক সময় ধরে আনা হয়েছে, যখন সুদান থেকে আগত নৌকা থেকে মালামাল খালাস করা হচ্ছিল এবং নতুন আগত হাবশীরা অবতরণ করছিল। লোকটি কমান্ডার ও যোহরার প্রতি তাকায়। তার ঠোঁটে মুচকি হাসি। পরক্ষণেই এক ব্যক্তিকে সঙ্গে করে সে বাইরে বেরিয়ে আসে।
তোমরা এদেরকে বড় উপযুক্ত সময় ধরে এনেছ- লোকটি বলল হতভাগ্য হাবশীরা মানুষ বলির দাবি করছে। আল-কিদ-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী খোদার ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে, একজন পুরুষ ও একজন নারী বলি দিতে হবে। আমাদের কোথাও না কোথাও থেকে এক পুরুষ ও এক নারীকে অপহরণ করে এনে তাদের হাতে তুলে দিতে হত। তোমরা আমাদের বিরাট এক সমস্যার সমাধান করে দিয়েছ। আমাদেরকে চিন্তামুক্ত করেছ। মনে হচ্ছে, আমরা সফল হব। আমাদের প্রতিটি কাজই পূর্ণ সফলতার সঙ্গে আঞ্জাম হয়ে যাচ্ছে। বলির জন্যও দুজন মানুষ আপনা-আপনি-ই এসে গেল।
