একটি পুরুষ একটি নারী- পর্বতমালার অভ্যন্তর থেকে আওয়াজ আসে তোমরা এখনো আমাকে দেখনি। আমি মানুষের রূপে তোমাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করব। তোমরা যদি আমার দুশমনের বৃক্ত না ঝরাও, তাহলে তোমাদের প্রত্যেককে আমি এই পর্বতমালার পাথরের ন্যায় পাথরে পরিণত করে দেব। তারপর চিরদিন তোমরা রোদে পুড়তে থাকবে। তোমাদের কেউ যদি যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কর, উত্তপ্ত মরুভূমির বালি তাকে চুষে খেয়ে ফেলবে। তোমরা অপেক্ষা কর- আমার অপেক্ষা করতে থাক।
নীরবতা আরো গম্ভীর হয়ে যায়। শিখাটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করে। পাহাড়ের ভিতর থেকে হাবশীদের ধর্মীয় সঙ্গীতের সুর ভেসে আসতে শুরু করে। এটা তাদের সেই সঙ্গীত, যাকে তারা ধর্মীয় উৎসবগুলোতে উপাসনার সময় গেয়ে থাকে। এখন সঙ্গীতটি গাওয়া হচ্ছে সম্মিলিত কণ্ঠে। সঙ্গে বাজছে সারো। মাঠে উপবিষ্ট হাজার হাজার হাবশী জনতা পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। সবাই নিশ্চিত, সঙ্গীতটা তাদের মধ্য থেকে কেউ গাইছে না। সুরটা অদৃশ্য থেকে আসছে।
***
যোহরা চৌকির কমান্ডারের নিকট বসে আছে। আগের চেয়ে বেশী আবেগ ঝরছে তার কথা থেকে। সে কমান্ডারকে বলল- তোমার সঙ্গে যদি আমার সাক্ষাৎ না ঘটত, তাহলে আমি অবশিষ্ট জীবনও নাচ-গানে অতিবাহিত করতাম। তোমাকে দেখার পর আমার মনে পড়ে যায়, আমি কারো কন্যা নর্তকী বা বেশ্যা নই। এখন হয়ত তুমি আমাকে মেরে ফেল; না হয় আশ্রয় দাও না হয় আমাকে আমার ঘরে পৌঁছিয়ে দাও। আজ তুমি আমাকে ফেরত যেতে দিও না।
আজ তুমি চলে যাও- কমান্ডার জবাব দেন- আমি তোমাকে আমার চৌকিতে রাখতে পারি না। ওয়াদা করছি, আমি তোমাকে তোমার ঘরে পৌঁছিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করব। আর এখান থেকে যদি তুমি চলেও যাও, তো কায়রোতে কোথায় উঠবে, ঠিকানা দিয়ে যাও, আমি সেখান থেকে তোমাকে নিয়ে যাব।
কিছুক্ষণ পর কমান্ডার দুটি ঘোড়া প্রস্তুত করেন এবং যোহরাকে বললেন, চল রওনা হই। দুজন ঘোড়ায় চড়ে রওনা হন। পথে যোহরা কমান্ডারকে বলল- আচ্ছা, রাতের বেলা এখানে নৌকা আসে কেন- অনেক নৌকা?
নৌকা?- কমান্ডার বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন- কোন্ দিক থেকে আসে?
ওদিক থেকে- সুদানের প্রতি ইংগিত করে যোহরা বলল- কদিন যাবত রাতে আমার তেমন ঘুম হয় না। মধ্যরাতে উঠে তাঁবুর বাইরে বসে থাকি। আমি ঘটনাটা দুরাত দেখছি। এক রাতে তিনটি ও এক রাতে দুটি নৌকা এসে কূলে ভিড়েছে। নৌকাগুলোর সাদা পাল অন্ধকারের মধ্যেও দেখা যায়। এখান থেকে একটু সামনের জায়গাটায় তীরে ভিড়েছে। আমি কান খাড়া করে বিষয়টা বুঝবার চেষ্টা করি। মনে হল, নৌকাগুলো থেকে অনেক মানুষ নামছে। তারপর গাছের আড়ালে আড়ালে এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের অভ্যন্তরে ঢুকে যাচ্ছে।
আচ্ছা, তুমি কি আমাদের দুজন সৈনিককে কখনো দেখেছ?- কমান্ডার জিজ্ঞেস করেন তারা ঘোড়ায় চড়ে ডিউটিতে আসে। তদের তো নদীর তীরে থাকার কথা।
না– যোহরা জবাব দেয়- কখনো তো আমি কোন সৈনিক দেখিনি! তবে দিনের বেলা দেখেছি দুজন সৈনিক আসে। সম্মুখে একটি কাফেলা অবস্থান করছে। তারা তাদের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া গল্প-গুজব করে সময় কাটায়। একদিন তাদের একজনকে কাফেলার একটি মেয়ের সঙ্গে টিলার আড়ালে বসে প্রেম-নিবেদন করতে দেখেছি।
যোহরা জানে না। মিসরের এই সীমান্ত এলাকায় কী হচ্ছে এবং কী হতে পারে। সীমান্তে নিয়োজিত সৈনিকেঁদের দায়িত্ব-ই বা কী, তা-ও তার অজানা। রাতে কিংবা দিনে সুদানের দিক থেকে কোন নৌকা এদিকে আসার তাৎপর্য কী, তাও জানেনা যোহরা। যা বলেছে, সবই তার সহজ-সরল কথা। কিন্তু কমান্ডারের জন্য এটি বিরাট এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। যোহরা যা বলেছে, তা যদি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে কমান্ডারকে সে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে। কমান্ডার এই দীর্ঘ ডিউটি এবং সীমান্ত এলাকার পরিবেশে বিরক্ত বটে; কিন্তু যোহরার বক্তব্য তাকে সজাগ করে তুলেছে। তিনি যোহরাকে বললেন- আস, আজ নদীর কূলে কূলে হাঁটব। তিনি ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে দেন।
কমান্ডার যোহরাকে নিয়ে নদীর কূলে পৌঁছে যান। তারা কূল ধরে হাঁটতে শুরু করেন। নদীর পানিতে সাঁতার কাটছে কমান্ডারের দৃষ্টি। কিছুক্ষণ পর মাঝ নদীতে দৃষ্টিসীমার শেষ প্রান্তে আলো চোখে পড়ে কমান্ডারের। তারপর আরো একটি আলো। কিন্তু পরক্ষণই আলোটা নিভে যায়। এ সময়ে এ এলাকায় যে সান্ত্রীদের ডিউটি করার কথা, কমান্ডার তাদেরকে হাঁক দেন। কিন্তু কোন জবাব এল না। তিনি কণ্ঠ উঁচু করে আবারো ডাক দেন। এবারো কোন জবাব নেই। তিনি আরো উচ্চকণ্ঠে ডাক দেন। তিনি নদীতে দুটি নৌকার পাল দেখতে পান। তিনি অস্থির হয়ে পড়েন। কমান্ডার যোহরার উপস্থিতি ভুলে যান এবং ঘোড়ায় চড়ে নদীর কূলে কূলে সামনের দিকে এগিয়ে যান। যোহরাও তার পিছনে পিছনে অগ্রসর হয়। সান্ত্রীদের ডেকে চলছেন কমান্ডার।
সান্ত্রীরা কমান্ডারের ডাক-চীৎকার শুনতে পাচ্ছে। তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে দুজন দুটি টিলার আড়ালে বৃদ্ধ স্বামীদের যুবতী স্ত্রীদের জালে আটকে আছে। তারা তাদের কমান্ডারদের কণ্ঠস্বর চিনে ফেলে এবং সেখান থেকে উঠে দাঁড়ায়। তারা যেখানে ঘোড়া বেঁধে রেখে গিয়েছিল, সেখানে ফিরে আসে। কিন্তু ঘোড়া উধাও। তারা ওখানেই অবাক বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দূরে একস্থানে দুটি ঘোড়া দৌড়াচ্ছে দেখতে পায় তারা।
