***
সে রাতটা ছিল অন্ধকার। মিশরের আকাশ ছিল তারায় তারায় উজ্জ্বল। কায়রো শহর গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। দিন কয়েক পরই তাদের উপর কী মহাপ্রলয় সংঘটিত হতে যাচ্ছে, তা কারো জানা ছিল না। মিশরের সীমান্তরক্ষী বাহিনীও ঘুমিয়ে পড়েছে। জেগে আছে শুধু কয়েকজন টহলসেনা। তারাও জেগেই আছে শুধু কর্তব্যের প্রতি তাদের কোনই মনোযোগ নেই।
নদীপথে আগ্রাসন রোধকল্পে নীল নদের কোল ঘেঁষে যে চৌকিটি স্থাপন করা হয়েছিল এবং তার থেকে মাইল চারেক দূরে অপর যে চৌকিটি পার্বত্য এলাকাকে নিরাপদ করার জন্য বসানো হয়েছিল, সেই দুটি চৌকির দুজন করে চারজন টহলসেনা চারটি মেয়ের রূপের জালে আটকে আছে। মেয়েগুলো তাদেরকে আলাদা আলাদা নিয়ে যাচ্ছে। আজ তারা আরো বেশি তৎপর।
যোহরা ও তার সঙ্গী নর্তকীর দল থেকে কিছু দূরে একটি তাঁবুতে শুয়ে আছে। দলের বাদক পুরুষরা বাহ্যত ঘুমিয়ে থাকলেও মূলত তারা সজাগ। তাদেরকে বলা আছে, আজকের রাতটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তোমরা জেগে থাকবে। উভয় দলের প্রতি নির্দেশ, বাইরের কোন মানুষ যেন নদীর কূলে এবং এই পার্বত্য এলাকার কাছে আসতে না পারে। কেউ এসে পড়লে তাকে যেন ধরে ভিতরে নিয়ে আসা হয়।
কিছুক্ষণ পর এক বাদক শোয়া থেকে উঠে পড়ে। সে প্রথমে তাবু থেকে বের হয়ে বাইরে ঘোরাফেরা করে। তারপর মেয়ে দুটো যে তাঁবুতে আছে, তার ভিতরে উঁকি দিয়ে তাকায়। কিন্তু ভিতরে কিছুই দেখা গেল না। বাদক ভিতরে ঢুকে পড়ে। গভীরভাবে দেখার চেষ্টা করে। তার মনে সন্দেহ জাগে। এবার দেয়াশলাই জ্বালিয়ে দেখে। যোহরা নেই। অপর মেয়ে গভীর ঘুমে অচেতন। বাদক তাকে জাগাল না। তার জানা আছে, যোহরা কোথায় গিয়ে থাকতে পারে। চৌকির কমান্ডার ছাড়া আর কোথায় যাবে সে! এখন সমস্যা, এই হতে পারে যে, কমান্ডার যোহরার সঙ্গে এদিকে আসবে আর তার প্রহরীদের না পেয়ে অনুসন্ধান করবে। এমনও হতে পারে, তিনি নদীর কূলে সেই জায়গাটায় পৌঁছে যাবেন, যাকে আজ রাত বাইরের জগত থেকে লুকিয়ে রাখা আবশ্যক।
বাদক তার দুজন সঙ্গীকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে জানায়, আমাদের একটি মেয়ে উধাও হয়ে গেছে। সম্ভবত সে চৌকিতে গিয়ে থাকবে। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, নদী থেকে দূরে কোথাও ওঁত পাততে হবে এবং কমান্ডার যদি মেয়েটির সঙ্গে এদিকে আসে, তাহলে উভয়কে ধরে আমাদের কমান্ডারের হাতে তুলে দিতে হবে। প্রয়োজনে দুজনকে হত্যা করে লাশ দুটো নদীতে ফেলে দেয়া হবে।
এই পার্বত্য এলাকার ভিতরের জগত জেগে আছে। বিশাল-বিস্তৃত এই এলাকা সম্পর্কে বাইরের মানুষ সম্পূর্ণ অনবহিত। প্রথমত, ভূখন্ডটা লোকালয় থেকে বহুদূরে এবং আশ-পাশ দিয়ে মানুষ চলাচলের কোন রাস্তা নেই। আরো একটি কারণ হল, জনমনে প্রসিদ্ধ আছে, পাহাড়গুলোর মধ্যে প্রেতাত্মারা লড়াই করে বেড়ায় এবং কোন মানুষ যদি তার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে, তাহলে তার শরীরের গোস্ত উধাও হয়ে কংকালটা শুধু অবশিষ্ট থাকে। আরো কথিত আছে, এই পার্বত্য অঞ্চলের অভ্যন্তরে পাহাড় কেটে কেটে ফেরাউনদের বিরাট বিরাট প্রতিকৃতি নির্মাণ করা হয়েছে এবং পাহাড়গুলোকে ভিতর থেকে ফোকলা করে প্রাসাদোপম ভবন তৈরী করা হয়েছে।
আজ রাতে পাতাল প্রাসাদগুলো আলোয় জ্বলমল করছে। চারদিক পাহাড় বেষ্টিত একটি ময়দান। হাজার হাজার সুদানী হাবশী সমবেত আজ। তাদেরকে উঁচু শব্দে কথা বলতে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। আজ তাদেরকে তাদের খোদাকে দেখানো হবে।
হাবশীরা ভয়ে প্রকম্পিত ও আবেগে আপ্লুত। ভয়ে তারা পরস্পর কানাঘুষাও করছে না। এই পাহাড়-পর্বত সম্পর্কে তারা সম্যক অবহিত। তারা জানে, এই মুহূর্তে তারা যে পাহাড়টির প্রতি মুখ করে বসে আছে, তার মধ্যভাগে উঁচুতে বিশাল এক মূর্তি বিদ্যমান। এটি আবু সম্বল মূর্তি। এই মূর্তি সম্পর্কে-ই হাবশীদের জানানো হয়েছিল, এটি তাদের খোদার প্রতিকৃতি এবং কোন এক রাতে তাদের এই খোদা মানুষের রূপে তাদের সম্মুখে এসে উপস্থিত হবেন।
সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে সারা মাঠে। হঠাৎ বিকট একটা শব্দ শোনা গেল, যেন বজ্রপাত হয়েছে। হাবশীরা পূর্ব থেকেই নীরব। এই গর্জন তাদের নিঃশ্বাসও বন্ধ করে দেয়। তার পরক্ষণেই একটি শব্দ ভেসে আসে- খোদা জাগ্রত হচ্ছেন। তোমরা সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাও- উপর দিকে দৃষ্টিপাত কর। বেশ কিছুক্ষণ পর্যন্ত পর্বতমালার অভ্যন্তরে শব্দটা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে কানে বাজতে থাকে। আকাশে দুটি আগুনের গোলা উড়তে দেখা যায়। শূন্যে কয়েকটা চক্কর কেটে গোলা দুটো সম্মুখের পাহাড়ের দিকে ছুটে যায় এবং পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। গোলা দুটো পাহাড়ের যে অংশের সঙ্গে ধাক্কা খায়, সেখান থেকে একটি অগ্নিশিখা তৈরী হয়ে যায়। আবু সম্বল মূর্তিটির অবস্থান শিলাটির পিছনে এবং কিছু উপরে। শিখার কম্পমান আলো মূর্তিটির ভয়ানক চেহারায় নিপতিত হলে দেখা যাচ্ছে, যেন মূর্তিটি দুচোখের পাতা ও মুখ খুলছে আর বন্ধ করছে। এমনও মনে হচ্ছে, যেন তার চেহারাটা ডানে-বাঁয়ে দুলছে।
সমবেত হাবশী জনতা সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। তাদের পুরোহিতগণ সেজদা থেকে মাথা তোলেন। তারা হাত উপরে তুলে বাহু প্রসারিত করে প্রার্থনা করতে শুরু করেন। প্রধান পুরোহিত উচ্চশব্দে বলে উঠেন- আগুন ও পানির। খোদা! আগুন দ্বারা কাঠ ভষ্মকারী ও নদী-সমুদ্রকে পানি দানকারী খোদা! আমরা তোমাকে দেখে ফেলেছি। বল, আমরা তোমার পায়ে কটি মানুষ অর্পণ করব? বল, পুরুষ চাই না নারী?
