মিশরের দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় হাজার হাজার সুদানী হাবশী সৈন্যের সমাগম। এবার তাদের ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী বলি দেয়ার পালা- মানুষ বলি। প্রথমে তাদের পরস্পরে কানাঘুষা চলে। তাদের দাবি, মানুষ বলি দিতে হবে। আল-কিনৃদ-এর লোকেরা তাদেরকে এ দাবি প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু হাবশীদের পুরোহিত দাবিতে অটল। হাবশীরা তাকে বিরক্ত করে তোলে যে, বলুন, মানুষ বলী কবে হবে? তাদের স্পষ্ট কথা, অন্যথায় আমরা ফিরে যাব। পুরোহিতদের বলা হল, আপনারা আপনাদেরই মধ্য থেকে একজনকে ধরে বলি দিয়ে দিন। তারা জবাব দেয়, না, এই বলি কবুল হয় না। বলির জন্য সেই অঞ্চলের মানুষ হতে হয়, যেখানে হামলা হবে। যারা আক্রমণ করে, তারা নিজেদের লোক বলি দেয়ার নিয়ম নেই।
অবশেষে তাদেরকে বলা হল, হামলার একদিন আগে মিশরের কোন এক ব্যক্তিকে ধরে এনে তোমাদের হাতে তুলে দেয়া হবে। হাবশীদের পুরোহিতগণ বলল- না, আমরা মানুষ এখনই চাই। অনেকদিন পর্যন্ত তাকে বিশেষ ধরনের খাবার খাইয়ে পুষতে হবে, মোটাতাজা করতে হবে এবং তার উপর বিশেষ আমল প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি এই বলি উপলক্ষে আমাদেরও পূজা অর্চনা করতে হবে। আরো কথা আছে। আমাদের হিসাব-নিকাশ করতে হবে, বলি পুরুষের দিতে হবে, না নারীর নাকি উভয়ের।
সে রাতে-ই আল-কিনদকে সংবাদ পাঠানো হয়, হাবশীরা বলি দেয়ার জন্য মানুষ দাবি করছে। জবাবে আল-কি বললেন- এতে ভাবনার কী আছে। একটা মানুষ ধরে নিয়ে তাদের হাতে তুলে দাও।
কিন্তু তারা এখনো বলেনি যে, বলি একজন পুরুষের হবে নাকি নারীর কিংবা উভয়ের।
তারা যা-ই দাবি করে পূরণ কর- আল-কি বললেন- কদিন পর যখন আমরা কায়রোতে হামলা চালাব, তখন কতগুলো মানুষ প্রাণ হারাবে, তার ঠিক নেই। তার আগেই যদি দু-একজন মেরে ফেলা হয়, তাতে ক্ষতির কী আছে!
আল-কিনদ গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান। এমন সময়ে এক খৃস্টান কমান্ডার ভিতরে প্রবেশ করে। লোকটির পরনে মিশরী পোশাক। ভিতরে প্রবেশ করেই সে মুখের কৃত্রিম দাড়ি খুলে ফেলে। সে আল- কিনদকে জিজ্ঞেস করে, আপনাকে অস্থির এবং চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
হাবশীরা তাদের রীতি পালন করতে চাচ্ছে- আল-কিনৃদ জবাব দেয় তারা বলি দেয়ার জন্য মানুষ চাচ্ছে।
তা আপনি ভাবছেন কী?
আমি ভাবছি, হামলার একদিন আগে একজন মানুষ তাদের হাতে তুলে দেব।
না- খৃস্টান কমান্ডার বলল- তারা যদি এখনই বলি দিতে চেয়ে থাকে, আপনি তাদের দাবি পূরণ করুন। এখন-ই তাদের প্রথা পালনের ব্যবস্থা করুন। আপনি সুদান যাননি। আমরা তাদেরকে ধর্মের নামে এ পর্যন্ত এনেছি। আপনি সম্ভবত মানুষকে কাজে লাগাতে জানেন না। সালাহুদ্দীন আইউবী আপনাকে শুধু লড়াই করতে শিখিয়েছেন। কিন্তু মানুষকে বিনা তলোয়ারে কিভাবে খুন করা যায়, তা আপনাকে আমাদের নিকট শিখতে হবে। একজন লোককে কাজে লাগাতে হলে তার ধর্মকে ব্যবহার করুন। তাদের মধ্যে তাদের ধর্মীয় উন্মাদনা উস্কে দিয়ে তাদের বিবেককে মুঠোয় নিয়ে আসুন। তাদের কাজে এবং অর্থহীন প্রথা-পার্বনের বিরোধিতা না করে বরং তার অনুসরণ করুন। সাধারণ মানুষের মন-মস্তিষ্ক ধর্ম আর কুসংস্কার বেশি। প্রভাবিত হয়ে থাকে। আমরা বহু মুসলমানকে হাতে এনেছি এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছি। সবাইকে ধর্ম ও কুসংস্কারের অস্ত্র দ্বারা হাত করেছি। মুসলমান ধর্মের নামে অতি তাড়াতাড়ি আমাদের জালে এসে ধরা দেয়। এই হাবশীরা তো জংলী। আমরা তাদেরকে এক বছরেরও অধিক আগে দুই সুদানীকে ধরে তাদের হাতে তুলে দিয়ে বলেছি, এরা মিশরী। তারা তাদেরকে যবাই করে মিশরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল।
তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তারা বলির জন্য পুরুষ চায়, না নারী। আল কিন্দ বললেন।
এই মুহূর্তে আপনার কিন্তু ওখানে যাওয়া খুবই জরুরী- খৃস্টান কমান্ডার বলল- কিন্তু আমি আপনাকে তাদের সম্মুখে অন্য এক পন্থায় নিয়ে যাব। ওরা অত্যন্ত জংলী ও রক্তপিপাসু যোদ্ধা। এ মুহূর্তে মিশরে তাদের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। আমরা যদি তাদের উপর ধর্মের ভুত চাপিয়ে রাখি এবং তাদেরকে এই নিশ্চয়তা প্রদান করি যে, এটা আমাদের নয়- তোমাদের-ই যুদ্ধ, তাহলে তাদের মাত্র এক হাজার যোদ্ধা-ই কায়রোর সব সৈন্যকে লাশে পরিণত করে ফেলতে সক্ষম হবে। আমরা তাদেরকে এই বলে এনেছি যে, আমরা তাদেরকে তোমাদের খোদার ঘরে নিয়ে যাচ্ছি এবং তোমাদের দুশমনরা তোমাদের খোদার ভূখন্ড কজা করে আছে।
আমি যাব। আল-কিনদ বললেন।
আল-কিনদ মিশরের উপর সুদানীদের শাসন কামনা করতেন। কিছুদিন আগে তিনি একজন গাদ্দারের নিকট তার এই মনোবাঞ্চার কথা প্রকাশ করে বসেন। গাদ্দার তার আকাঙ্খকে দৃঢ় প্রত্যয়ে পরিণত করে দেয় এবং খৃস্টানদের সঙ্গে তার যোগাযোগ করিয়ে দেয়।
খৃস্টানরা তার সঙ্গে এই মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, মিশরকে দুভাগে বিভক্ত করে এক অংশ তোমাকে দিয়ে দেব আর অবশিষ্টাংশ সুদানকে দেব। ঐতিহাসিকগণ আল-কিনৃদ-এর বিশ্বাসঘাতকতা ও বিদ্রোহের কাহিনী বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেননি। সে যুগের মহান ব্যক্তিত্ব কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তার রোজনামচায় এ বিষয়টা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আল-কি খৃস্টান ও সুদানী নেতৃবৃন্দের সহায়তায় সভ্যতা-বিবর্জিত হিংস্র হাবশীদের উপর তাদের ধর্মের ভুত সাওয়ার করে তাদের উপর যুদ্ধ-উন্মাদনা সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন এবং তিনি স্বয়ং তাদের ধর্মগুরুতে পরিণত হন। হাবশীদেরকে বলা হয়েছিল, ইনি তোমাদের খোদার সেই দূত, যিনি শত শত বছর ধরে খোদার নিকট আসা-যাওয়া করছেন।
