নিজ নিজ দলের কারগুজারী শোনানোর পর তারা সিদ্ধান্ত নেয়, এই নাচ গান দ্বারা তেমন বেশি হাবশীকে ভিতরে ঢুকানো যাবে না। নদীর পথটা-ই বেশি উপযোগী। নৌকায় করেই অধিক থেকে অধিকতর লোক ভিতরে ঢুকতে পারবে। তাই সিদ্ধান্ত হল, মেয়েরা এই দুসৈনিক ছাড়াও আরো দু-চারজন সান্ত্রীর সঙ্গে অনুরূপ খেলা খেলবে, যাতে প্রতি রাতে নৌকা আসতে পারে। এ-ও সিদ্ধান্ত হল যে, যোহরা ও তার সঙ্গী নর্তকীকে এখানেই এক স্থানে রাখা হবে। কিন্তু তাদের কোন রহস্য জানতে দেয়া হবে না।
বৈঠক শেষ হয়ে গেছে। বাদক পুরুষরা তাদের মেয়েদের ডেকে এনে বলল, তোমাদের আপাতত কোন কাজ নেই। এ জায়গাটা খুবই মনোরম। তোমরা কয়েকটা দিন এখানে-ই অবসর কাটাও। তারা মেয়েদেরকে এমনভাবে উৎসাহিত করে যে, তারা সম্মত হয়ে যায়। অপর দলের মেয়েরা তাদেরকে আপন ও ঘনিষ্ট বানিয়ে নেয়। কিন্তু খানিকটা দূরে আলাদাভাবে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
এখন রাত। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু যোহরার চোখে ঘুম আসছে না। তার বারবার কেবল কমান্ডারের কথা মনে পড়ছে। কমান্ডারের ব্যক্তিত্ব যোহরাকে প্রভাবিত করে ফেলেছে। প্রথমত একারণে যে, কমান্ডারের মধ্যে সে তার পিতার প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই কমান্ডার-ই প্রথম পুরুষ, যে তাকে খেলনা মনে করার পরিবর্তে তার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়েছে। তৃতীয়ত, কমান্ডার তাকে বারক নয়- যোহরা নামে ডেকেছে।
যোহরা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। পা টিপে টিপে তাঁবু থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। রাস্তা তার আগে থেকেই চেনা। এবার দ্রুতপায়ে চৌকি অভিমুখে হাটা দেয় সে। যোহরা এত দ্রুত আর এত দীর্ঘ পথ হাঁটায় অভ্যস্ত নয়। কিন্তু তার আবেগ তাকে শক্তি জুগিয়ে চলেছে।
যোহরা চৌকিতে পৌঁছে যায়। কমান্ডারের তাবু তার আগে থেকেই চেনা। তাবুতে ঢুকে পড়ে সে। কমান্ডার গভীর ঘুমে অচেতন। কারো আগমন টের পেয়ে তার চোখ খুলে যায়। যোহরা অন্ধকারের মধ্যে কমান্ডারের মুখে হাত রাখে। কমান্ডার চোখ খুলেই বিড়বিড় করে উঠে হাত ধরে ফেলে। তুলতুলে নরম ছোট্ট হাত। কমান্ডার বুঝে ফেলে, এ হাত নারীর। তিনি কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন কে?
যোহরা।
কমান্ডার ধড়মড় করে উঠে বসেন। যোহরা বলল- তোমাকে দেখতে এসেছি। শুড়ে পড়, আমি চলে যাচ্ছি।
কমান্ডার বাতিটা জ্বালিয়ে দেন। যোহরাকে জিজ্ঞেস করেন, কোথা থেকে এসেছ? তার কণ্ঠে রাজ্যের বিস্ময়। যোহরা তার মনের কথা খুলে বলল। কমান্ডার বাইরে বেরিয়ে আসেন। দুটি ঘোড়া প্রস্তুত করেন এবং যোহরাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে একটিতে তাকে চড়ান এবং অপরটিতে নিজে চড়ে বসেন। ঘোড়া চলতে শুরু করে।
দুটি ঘোড়া পাশাপাশি চলছে। যোহরা আবেগের ভাষায় কথা বলছে। কমান্ডার মনোযোগ সহকারে শুনতে থাকেন। গন্তব্য থেকে কিন্তু দূরে থাকতেই যোহরা কমান্ডারকে থামতে বলে এবং তাকে ফিরে যেতে বলে। কমান্ডার ভার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ফিরে যান।
যোহরা তাঁবুতে গিয়ে পৌঁছে। তার দলের এক ব্যক্তি সজাগ বসে আছে। যোহরাকে দেখেই জিজ্ঞেস করে, কোথায় গিয়েছিলে? যোহরা বলল, একটু ঘুরতে গিয়েছিলাম। লোকটি যোহরাকে ধমকাতে শুরু করে। তার মনে সন্দেহ জাগে। যোহরা বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
আমাদের অনুমতি ছাড়া তোমরা কোথাও যেতে পারবে না। লোকটা নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
আমি তোমাদের ক্রীতদাসী নই- যোহরা বলল- আমি যে পারিশ্রমিক নিয়েছি, তার বিনিময়ে কাজ যা করার ছিল, করে ফেলেছি। এখন আর আমি কারো আদেশ-নিষেধ পালন করতে বাধ্য নই।
তোমরা সম্ভবত মালিকের নিকট জীবিত ফেরত যেতে চাও না- লোকটা বলল- এখান থেকে আমাদের অনুমতি ছাড়া কোথাও গিয়ে দেখ।
***
সুলতান আইউবীর সীমন্ত রক্ষী সৈনিকদ্বয় প্রতিদিন ডিউটিতে বেরিয়ে নদীর কূলে এসে পড়ছে আর তাদের প্রেয়সী মেয়ে দুটো তাদেরকে ভালবাসার মূলা দেখিয়ে দেখিয়ে একদিকে সরিয়ে নিচ্ছে। এই সুযোগে সুদানী হাবশী বোঝাই পালতোলা নৌকা এসে কূলে ভিড়ছে এবং সৈন্যরা তীরে নেমে পর্বতমালার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। বণিক কাফেলার চারটি মেয়ে আরো দুজন মিশরী সৈন্যকে নিজেদের বৃদ্ধ স্বামীদের স্ত্রী বানিয়ে এবং তাদের সঙ্গে চলে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে আটকে ফেলে।
মিশরের এই সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে এত অধিক সুদানী হাবশী সৈন্য এসে জড়ো হয়েছে যে, তারা ইচ্ছে করলে রাতের বেলা সীমান্ত চৌকিগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে মিশরী সৈন্যদেরকে অতি অনায়াসে খতম করে ফেলতে পারে। কিন্তু তাদের কমান্ডারগণ ভেবে রেখেছেন অন্য কিছু। সীমান্ত চৌকি হামলার সংবাদ কায়রো পৌঁছে যাবে। তার ফল এই দাঁড়াবে যে, কায়রো থেকে সৈন্য এসে যাবে এবং খৃস্টানদের আকষ্কিকভাবে কায়রো আক্রমণের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দেবে।
নীল নদের উপকূলীয় পার্বত্য এলাকায় সুদানী হাবশী সৈন্যসংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলছে। কায়রো আক্রমণ পরিচালনা করা যে খৃস্টান কমান্ডারদের দায়িত্ব, সুদানে খৃষ্টান উপদেষ্টাগণ তাদের কর্তব্য বুঝিয়ে দিয়েছে। তারা কিছুদিনের মধ্যে মিশরের সীমান্ত অতিক্রম করে পাহাড়ী এলাকায় অনুপ্রবেশ এবং হামলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। সালার আল-কিন্দ এখনো কায়রোতে বহাল তবিয়তে তার দায়িত্ব পালন করছেন। তার কোন আচরণে কারো মনে সন্দেহ জাগেনি যে, তিনি বড় রকমের একটি বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত। রাতে ঘরে বসেই তিনি রিপোর্ট পেয়ে যাচ্ছেন, গত রাতে কতজন হাবশী মিশরের সীমান্ত অতিক্রম করেছে এবং এযাবত তাদের সংখ্যা কতোয় দাঁড়িয়েছে। আক্রমণের মূল নেতৃত্ব তাকেই দিতে হবে। তিনি পরিকল্পনা প্রস্তুত করে রেখেছেন।
