মেয়েটির দুচোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। সে অশ্রু ঝর ঝর নেত্রে বলতে শুরু করল, এ মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে, আমার পিতার আত্মা এই ভাবুটার চার পার্শ্বে ঘুরে ফিরছে। এই তাবুতে প্রবেশ করার আগে কখনো আমার এমনটা মনে হয়নি। মাঝে-মধ্যে মনে হত, যেন আমার অস্তিত্ত্বটা-ই আমার পিতার আত্মা, যিনি দিগ্বিদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
তুমি যদি একটি মূল্যবান নর্তকী-ই ছিলে, তাহলে এই পাহাড়-জঙ্গলে কী অর্জন করতে এসেছ? কমান্ডার জিজ্ঞাসা করেন।
আমি ভাড়ায় এসেছি- নর্তকী জবাব দেয়- আমি ওদেরকে চিনিনা। অন্যান্য নর্তকীদেরও পূর্বে চিনতাম না। আমাকে বলা হয়েছিল, সীমান্ত এলাকায় যেতে হবে এবং ওখানকার সেনাচৌকিতে যদি প্রয়োজন পড়ে, বিনা পরিশ্রমে নাচতে হবে। মিশরের ইজ্জত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী সৈনিকদেরকে খুশী করে আমি যে আনন্দ পাচ্ছি, অন্য কিছুতে আমি ততটা আনন্দ পেতাম না। আমার অনেক সময় মনে হয়, আমার নাচে আমার মুজাহিদ পিতার, আত্মাও খুশী হন। আমি একটি প্রতারণা– নিজের জন্যও, অন্যের জন্যও। কিন্তু আমি স্বদেশের মুজাহিদদের দেহকে অপবিত্র করতে পারি না। আগের চৌকির কমান্ডার আমাকে তার তাঁবুতে ডেকে পাঠিয়েছিল। কিন্তু আমি তার আবেগ প্রত্যাখ্যান করেছি। তোমার কাছে শুধু এজন্য এসেছি যে, চেহারা সুরতে তোমাকে আমার পিতার মত মনে হয়েছিল।
নর্তকী কমান্ডারের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। কমান্ডারের একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে তুলে চোখের সঙ্গে লাগায়। তারপর সেই হাতে চুম্বন করে। কমান্ডার নিজের অপর হাতটা তার মাথায় রেখে জিজ্ঞাসা করেন তোমার নাম কী?
আমার মনিব আমাকে বারক নামে ডাকেন। আব্বা ডাকতেন যোহরা নামে। নর্তকী জবাব দেয়।
যাও, যোহরা!-কমান্ডার স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন- নিজ তাঁবুতে চলে যাও।
তুমি ঘুমিয়ে পড়- যোহরা বলল- আগে তুমি ঘুমাও, আমি তারপর যাব।
***
রাত কেটে যাচ্ছে। বাদক দলের দুসদস্য তাঁবুতে জাগ্রত বসে আছে। অন্যান্য নর্তকী ও অবশিষ্ট বাদকরা গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে আছে। জাগ্রতদের একজন অপরজনকে বলল, আমাদের কর্মপদ্ধতি সঠিক বলে মনে হচ্ছে না। আমরা মেয়েগুলোকে এই বলে এনেছিলাম যে, তারা নেচে-গেয়ে সৈন্যদের মনোরঞ্জন করবে। তাদেরকে বলে দেয়া আবশ্যক ছিল, আমাদের আসল উদ্দেশ্য কী।
একজন নর্তকীকে বিশ্বাস করা যায় না- অপরজন বলল- যে মেয়েটি এখন কমান্ডারের তাঁবুতে অবস্থান করছে, সে আবেগের বশবর্তী হয়ে আলাদা পুরস্কার গ্রহণ করে কমান্ডারকে বলে দিতে পারে, আমরা সীমান্ত চৌকিগুলোর জন্য ধোকা ও প্রতারণা হয়ে এসেছি। এজন্যে কোন নর্তকীকে আসল রহস্য বলা ঠিক হবে না। আমাদের পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করে বিনিময় পাওয়া-ই ওদের জন্য যথেষ্ট। আমরা তাদেরকে দাবি অনুপাতে পারিশ্রমিক দিয়েছি। কাজ আমাদের হয়ে গেছে।
আমাদের উদ্দেশ্য কী, যদি মেয়েটাকে বলে দিতাম, তাহলে সে কমান্ডারকে ভালভাবে অন্ধ করে ফেলত। তাকে সে এমনভাবে ফেঁসে ফেলত যে, তারই সহযোগিতায় আমরা হাবশীদেরকে ভিতরে নিয়ে আসতাম।
ওস্তাদ আমাদের চেয়ে ভাল বুঝেন। এই মেয়েগুলো আমাদের হাতিয়ার কেউ হাতিয়ারকে রহস্য জানায় না। এটা নিরাপদ নয়। কমান্ডার এই চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন যে, মেয়েটি তাকে পাপ থেকে রক্ষা করেছে এবং তার হৃদয়ে পিতৃবোধ জাগিয়ে দিয়েছে। মেয়েটি দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত তার মাথার কাছে বসে থাকে। তারপর এক সময়ে ধীর পায়ে বের হয়ে নিজের তাঁবুতে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
এখন ভোর। নায়ক-নর্তকীরা যখন জাগ্রত হয়, তখন সূর্য উপরে ওঠে গেছে। মেয়েরা জানেনা, এখন তাদের গন্তব্য কোথায়। বাদক পুরুষরা যখন তাদেরকে একদিকে নিয়ে রওনা হয়, কমান্ডার তখন তাঁর তাঁবুর বাইরে দন্ডায়মান। যোহরা দৌড়ে তার নিকট এসে সামনে দাঁড়িয়ে বলল- আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। কমান্ডার আর মাথায় হাত রাখেন। যোহরা কমান্ডারের অপর হাতটি ধরে টেনে নিয়ে নিজের চোখের সঙ্গে লাগায় এবং আদ্র চোখে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসে।
তারা নদীর দিকে রওনা হয়ে যায়। পথে একদিক থেকে দুটি উট এসে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। দুউটের দুআরোহী নীচে অবতরণ করে উটগুলোকে বসিয়ে নর্তকী মেয়ে দুটোকে উটের পিঠে বসিয়ে রওনা হয়ে যায়। এই উষ্ট্ৰোরোহীদ্বয় তাদের-ই দলের মানুষ। তারা নিকটেই কোথাও তাদের অপেক্ষায় লুকিয়ে ছিল।
চারটি মেয়েসহ বণিক কাফেলা যে স্থানে অবস্থান করেছিল, এরা সেখানে গিয়ে পৌঁছে। উভয় দল পরস্পর এমনভাবে মিলিত হয়, যেন কারো সঙ্গে কারো পরিচয় নেই। বণিক কাফেলার মেয়েরা গায়কদলের মেয়েদেরকে পুরুষদের থেকে সরিয়ে নদীর কূলে নিয়ে যায়। বণিক কাফেলার মেয়েরা যোহরা ও তার সঙ্গী মেয়েকে জানায়, আমরা তাদের স্ত্রী-কন্যা; ভ্রমণের উদ্দেশ্যে তাদের সঙ্গে এখানে এসেছি।
ওদিকে পুরুষদের আসরে আসল মিশন নিয়ে আলোচনা চলছে। বাদকরা তাদের দুরাতের কারগুজারী শোনায়। বণিক কাফেলার লোকেরা জানায়, তোমাদের নাচ-গানের আসরের সুযোগে অত্তত একশত হাবশী মিশর ঢুকে পড়েছে। আর আমাদের মেয়েরা দুজন সৈনিককে ফাঁদে ফেলে ঢুকিয়েছে। দুশ-রও বেশি হাবশীকে।
