তুমি ঠিকই বলছ- কমান্ডার বললেন- আমাদেরকে যখন সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল, তখন পাপ থেকে বেঁচে থাকার সবক শেখানো হয়েছিল। আমাদেরকে সামরিক ও দৈহিক প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি আত্মিক এবং চারিত্রিক প্রশিক্ষণও প্রদান করা হয়ে থাকে। একারণেই সুলতান আইউবীর একশত সৈনিকের কাছে খৃস্টান বাহিনীর এক হাজার সৈনিকও হার মানতে বাধ্য হয়।
কিন্তু তা সত্ত্বেও একটা অবলা মেয়ে তোমাকে নিরস্ত্র করে ফেলেছে! নর্তকী বলল- তোমার রূহানী ও আখলাকী শক্তি কেড়ে নিয়ে গেছে!
মেয়েটির কথায় কমান্ডার হতভম্ব হয়ে যান। তিনি অগত্যা বলে উঠেন আমার বিলকুল ধারণা ছিল না যে, এখানে এসে তুমি এ ধরনের কথা বলবে। আমি ধারণা করেছিলাম, নির্জনে এসে তুমি আমাকে প্রেম-ভালবাসা দিয়ে মাতিয়ে তুলবে। তোমার ঠোঁটের সেই হাসি কোথায়, যা আমাকে বাধ্য করেছিল, তোমার লোকদের থেকে তোমাকে ভিক্ষা চাইতে? আমি বিনিময় হিসাবে তোমাকে দুটি আরবী ঘোড়া দিতে প্রস্তুত আছি।
আর তোমার তরবারীটাও দেবে?- মেয়েটি বলল- বর্শা, ঢাল এবং খঞ্জরটাও।
হা- কিন্তু কমান্ডার নিশ্চুপ হয়ে যান। পরক্ষণে অস্থির কণ্ঠে বললেন– না, সৈনিক কখনো অস্ত্রমুক্ত হয় না।
কমান্ডার বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যান। তারপর দ্রুত পদক্ষেপে কিছুক্ষণ পায়চারী করে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে রাগত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন- একটি নর্তকীর মুখে এসব কথা আমার ভাল লাগছে না। তুমি কি আমার থেকে রক্ষা পেতে চাও? তুমি কি ভাবছ, আমি তোমার দেহে হাত লাগাব না?
হ্যাঁ- নর্তকী বলল- আমি তোমার থেকে আমার দেহকে রক্ষা করতে চাই।
তুমি কি তোমার দেহটাকে পবিত্র মনে করছ?
না- নর্তকী বলল- আমি আমার দেহটাকে নাপাক-ই মনে করি। তবে তোমার দেহটাকে আমি নাপাক করতে চাচ্ছি না।
মেয়েটির বক্তব্য কমান্ডারের মস্তিষ্কে প্রবেশ করেনি। তিনি বোকার ন্যায় হা করে নর্তকীর প্রতি তাকিয়ে থাকেন। নর্তকী বলল-কোন কন্যা তার পিতার দেহকে অপবিত্র করতে চায় না।
উহ!- কমান্ডার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- আমি বৃদ্ধ আর তুমি যুবতী। তিনি বসে পড়েন এবং মাথাটা নত করে ফেলেন।
নর্তকী একটু সম্মুখে অগ্রসর হয়ে কমান্ডারের চিবুক ধরে মাথাটা উপরের দিকে তুলে বলল, এত হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি পালাব না, তোমাকে ধোকাও দেব না। তুমি যদি একজন পুরুষ পরিচয় ধারণ করেই থাকতে চাও, তাহলে আমিও নর্তকী ও বেশ্যা হয়েই থাকব। তারপর বলল, আমি তোমাকে পিতার রূপে দেখছি। তুমি আমার দু-একটি কথা শুনে নাও। তারপর যা ইচ্ছে হয় কর, আমি পাথর হয়ে যাব আর তুমি তাকে নিয়ে খেলা করতে থাক। আচ্ছা, তোমার কি কোন মেয়ে আছে?
একটি আছে। কমান্ডার জবাব দেন।
তার বয়স কত?
বার বছর।
আচ্ছা, তুমি যদি মৃত্যুবরণ কর আর তোমার স্ত্রী অভাবের জ্বালায় বাধ্য হয়ে তোমার মেয়েটাকে গায়ক-নর্তকীদের কাছে বিক্রি করে দেয়, তাহলে তোমার আত্মার কী দশা হবে? তোমার আত্মা কি তখন এসব মরু বিয়ামবান ও পাহাড়ে-জঙ্গলে চীৎকার করে ফিরবে না?
কমান্ডার মেয়েটার প্রতি আড় চোখে তাকাতে শুরু করেন। তার কপালের উপর আরো কয়েক ফোঁটা ঘাম ফুটে উঠেছে।
তুমি একটু কল্পনা কর- মেয়েটা বলল- মনে কর, তুমি মৃত্যুবরণ করেছ এবং তোমার কন্যা এক পাপিষ্ঠ পুরুষের সঙ্গে তাঁবুতে বসে আছে এবং লোকটা তাকে বলছে, মদ আন; মদ ছাড়া নারী আর নারী ছাড়া মদ জমে না।
কমান্ডারের ওষ্ঠাধর কেঁপে ওঠে। হঠাৎ করে গর্জে উঠে বললেন, বেরিয়ে যাও তুমি এখানে থেকে। কুলটা, বেশ্যা!
মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল- আমার পিতা যদি আমাকে ও তোমাকে দুজনকেই খুন করে ফেলতেন!
মেয়েটির দুচোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসে। কমান্ডার বসা থেকে উঠে তাঁবুর মধ্যে পায়চারী করতে শুরু করেন। মেয়েটি তার মানসিক অবস্থা ও ক্ষোভ উপেক্ষা করে বলল- বৃদ্ধ বলে আমি তোমাকে ঘৃণা করছি না। আমি এমন এমন বৃদ্ধ লোকদের তাঁবুতে রাত যাপন করেছি, বার্ধক্য যাদেরকে ভিতর থেকে ফোকলা করে ফেলেছে। তারা ঐশ্বর্যের বলে তাদের মৃতদেহে আত্মার সঞ্চারণ করতে চাইত। সে তুলনায় তুমি অতটা বৃদ্ধ নও। আসল কথা হল, তোমার গঠন-আকৃতি ঠিক আমার পিতার মত। আমি তোমাকে যে কথাগুলো বললাম, তা আগে আমার মাথায় ছিল না। আমি শুধু নাচতে আর অঙ্গুলি হেলনে নাচাতে জানতাম। তুমি নিজেই ভেবে দেখ, আমার মত একটা বেশ্যা নর্তকীর মাথায় এমন সব কথা আসল কেন, যা তোমাকে বিস্মিত করে তুলেছে।
কমান্ডার মেয়েটির প্রতি তাকান। তার রাগ পানি হয়ে গেছে। মেয়েটি বলল- আমার পিতা-মাতার চেহারা ও দৈহিক গঠন আমার ভালভাবে স্মরণ আছে। তাদের গায়ের গন্ধও আমার মনে আছে। তোমার কন্যার বয়স বার বছর। আমার বয়স যখন নয়-দশ বছর ছিল, তখন বাবা মারা যান। তিনি আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। মিশরের সেনাবাহিনীর সৈনিক ছিলেন। তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীর ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বেই মারা যান। তখন আমার মা যুবতী এবং নিতান্ত অসহায়। তিনি পেটের দায়ে আমাকে অর্থের বিনিময়ে এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেন। বিনিময়টা তিনি আমার চোখের সামনে গ্রহণ করেছিলেন। লোকটা যখন আমার মাকে বলেছিল, উঁচু পর্যায়ের একজন ভাল মানুষের সঙ্গে আমি তোমার মেয়েকে বিয়ে দেব। আমি কাঁদতে শুরু করলে মা বললেন, কাঁদিনে মা, ইনি তোর চাচা। ইনি তোকে তোর পিতার কাছে নিয়ে যাচ্ছেন। তারপর আমি বার বছর পর্যন্ত পিতাকে সন্ধান করে ফিরছি। আমাকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাচ শেখানো হয়েছে যে, তোমাকে তোমার পিতার নিকট নিয়ে যাব। বয়স বাড়ার পর আমি বুঝে ফেলি যে, আমাকে যা কিছু বলা হয়েছে ও হচ্ছে, সবই প্রতারণা। ওরা কিভাবে আমাকে আমার পিতার নিকট নিয়ে যাবে? তিনি তো মারা গেছেন! ততক্ষণে নাচ-গান আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। আমাকে জীবনে কেউ প্রহার করেনি। পিতার নামে আমি নাচের প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আমার ওস্তাদ ও মনিব আমার সঙ্গে ভাল আচরণ করতেন এবং ভাল ভাল খাবার খাওয়াতেন। তারপর একদিন আমার যৌবন আসে। তখন আমি আমার মূল্য আন্দাজ করতে সক্ষম হই। সেই মূল্য আমার সব চেতনাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। আমি একটি সুদর্শন পাথরে পরিণত হয়ে যাই। কিন্তু তোমাকে দেখার পর আমার মৃত চেতনা আবার জেগে উঠেছে।
