পরবর্তী রাত বাদক ও নর্তকীদল অপর চৌকিতে গিয়ে পৌঁছে। সেখানেও জাঁকজমকপূর্ণ আসর জমে যায়। দুপুর রাতে নদীর কূলে টহলদানকারী দুসৈনিক ফিরে আসে। তাদের স্থানে অপর দুসৈনিক রওনা হতে উদ্যত হয়। কিন্তু তাদের সঙ্গীরা বাধা দিয়ে বলল, পাগল হয়েছ? এই আমোদ ছেড়ে কোথায় যাচ্ছ? কমান্ডার তখন মেয়েদের নাচ-গানের আসরে মত্ত হয়ে আছেন। কিন্তু সৈনিকদ্বয় সঙ্গীদের আবদার উপেক্ষা করে বলল, না যেতে হবে; ওটা আমাদের কর্তব্য। এরা সেই দুসৈনিক, যাদেরকে মেয়েরা প্রেম নিবেদন করে বলেছিল, আমরা আমাদের স্বামীদেরকে খুন করে তোমাদের সঙ্গে চলে যাব। দায়িত্বের প্রতি তাদের অতটুকু গুরুত্ব নেই, যতটুকু আগ্রহ মেয়েদের মিলন লাভের প্রতি। মেয়েরা প্রেম নিবেদন করে বলেছিল, পরে অবশ্যই আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।
ইতিপূর্বে তারা ডিউটিতে যেত ধীর পদক্ষেপে, থেমে থেমে অসর্তকতার সাথে। কিন্তু আজ রাত চৌকি থেকে বেরিয়ে সামান্য দূরে গিয়েই ঘোড়া থামিয়ে অবতরণ করে এবং কিছুক্ষণ ধীরে ধীরে একসঙ্গে হেঁটে দুজন দুদিকে আলাদা হয়ে যায়। মেয়ে দুটো পৃথক দুজায়গায় তাদের অপেক্ষা করছে।
মেয়েদের সঙ্গে সুলতান আইউবীর সৈনিকদের সাক্ষাৎ হয়ে যায়। মেয়েরা তাদেরকে নদী থেকে দূরবর্তী এক পার্বত্য এলাকায় নিয়ে যায়। উভয় মেয়ে সৈনিকদের উপর তাদের রূপ-যৌবন ও ভালবাসার তেলেসমাতি প্রয়োগ করে এবং স্বামীদের হত্যার পরিকল্পনা আঁটতে থাকে। তারা সৈনিকদের জানায়, আমরা স্বামীদেরকে মদের সঙ্গে নিদ্ৰাজনক পাউডার মিশিয়ে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছি। সৈনিকদের একজন তার ভালবাসার পাত্রীকে নিয়ে টিলার একদিকে এবং অপরজন তার বিপরীত দিকে অবস্থান করছে। শুধু কর্তব্য-ই নয়- আশ-পাশ এবং জগতের সব কিছু-ই ভুলে গেছে তারা।
সুলতান আইউবীর এই সৈনিকদ্বয় যেস্থানে মিশরী বণিক পরিচয়দানকারী লোকদেরকে অবস্থান করতে দেখেছিল, সেখান থেকে সামান্য দূরে নদীর কূলে চারটি ছায়া এদিক-ওদিক নড়াচড়া করছে। নদীতে হালকা তরঙ্গ বইছে। লোকগুলো অন্ধকারের মধ্যে নদীর দিকে দূরপানে তাকিয়ে তাকিয়ে কিছু। একটা অবলোকন করার চেষ্টা করছে। ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে উঠছে তারা। একজন বলল- তাদের তো এতক্ষণে এসে পড়ার কথা? আরেকজন বলল তাদেরকে সংবাদ তো পৌঁছানো হয়েছে, বুঝলাম না এখনো এসে পৌঁছল না কেন। একজন কিছুক্ষণ এক নাগাড়ে তাকিয়ে থেকে বলে উঠল, পাল দেখা যাচ্ছে মনে হয়! বলেই বাতি জ্বালিয়ে লোকটি ডানে-বাঁয়ে নাড়াতে শুরু করে। পরক্ষণে দূর নদীতে দুটি প্রদীপ জ্বলে উঠে আবার নিভে যায়।
কিছুক্ষণ পর একটি পালতোলা নৌকা নদীর কূলে এসে ভিড়ে। কিনারায় দন্ডায়মান এক ব্যক্তি বলল, কোন শব্দ যেন না হয়। পূর্ণ নীরবতার সাথে কৃষ্ণকায় হাবশী লোকগুলো নৌকা থেকে তীরে নেমে আসতে শুরু করে। মুহূর্ত পর তার পাশে এসে ভিড়ে আরেকটি নৌকা। তার মধ্য থেকেও হাবশী লোক নেমে আসে। উভয় নৌকা-ই বিশাল। দুনৌকা থেকে কমপক্ষে দুশ লোক মিশরের ভূখন্ডে অবতরণ করে। তারপর ভিতর থেকে মালামাল নামাতে শুরু করে। সবই সামরিক সরঞ্জাম। মাল খালাস হওয়ামাত্র মাঝিদের নির্দেশ দেয়া হল, বিলম্ব না করে তোমরা এক্ষুণি ফিরে যাও। মাঝিরা পাল নামিয়ে গতি বদল করে নোঙ্গর তুলে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায়। হাবশীদের এই চালানটিও পার্বত্য এলাকায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
এই সৈনিকদ্বয় যখন ফিরে আসে, তখন চৌকির নাচ-গানের আসার ভেঙ্গে গেছে। আসর থেকে উঠে সৈনিকরা যার যার তাঁবুতে ফিরছে। কমান্ডার নর্তকীদের জন্য আলাদা একটি তাঁবু স্থাপন করে দিয়েছেন। একটি মেয়েকে তার খুবই ভাল লাগে। নিষ্পাপ মিষ্টি মুখ মেয়েটির। কমান্ডারের দৃষ্টিতে তারা পেশাদার মেয়ে। তিনি বাদকদের বললেন, তোমরা অমুক মেয়েটাকে আমার তাঁবুতে পাঠিয়ে দাও।
লোকগুলো মূলত শত্রুর গোয়েন্দা ও নাশকতাকারী। তাদের মিশন-ই হল, সুলতান আইউবীর এই দুটি সেনাচৌকিকে ফাঁদে আটকিয়ে রাখা এবং কমান্ডারদেরকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার চেষ্টা করা, যাতে এই সুযোগে সুদানের হাবশী সৈন্যরা মিশরে ঢুকে যেতে পারে। এমতাবস্থায় এই চৌকির কমান্ডার যখন তাদের একটি মেয়ের সঙ্গ লাভের ইচ্ছা পোষণ করলেন, সঙ্গে সঙ্গে তার আকাংখা পূরণ করে দেয়া হল। নর্তকী কমান্ডারের সঙ্গে তার তাঁবুতে ঢুকে পড়ে।
কমান্ডার মধ্য বয়সী পুরুষ আর মেয়েটা তাগড়া যুবতী। তাঁবুতে ঢুকেই মেয়েটি গম্ভীর হয়ে যায়। বাইরের আলো-প্রদীপ নিভে গেছে। তাঁবুর মধ্যে টিম টিম করে একটি বাতি জ্বলছে। কমান্ডার মেয়েটির প্রতি মুখ করে বসে গভীর দৃষ্টিতে তাকে দেখতে শুরু করে।
আমি কোনদিন মদপান করিনি। কমান্ডার বললেন।
আমার পিতাও কখনো মদপান করেননি- মেয়েটি বলল- কিন্তু আপনি মদের উল্লেখ কেন করলেন? আমি তো বলিনি মদপান করব? আপনি সম্ভবত ভেবেছেন, আমাদের সঙ্গে মদ আছে আর আমি এনে আপনাকে পান করাব?
কথায় বলে মদ ছাড়া নারী আর নারী ছাড়া মদ জমে না- কমান্ডার মুচকি হেসে বললেন- আমি মদের স্বাদ সম্পর্কে অবহিত নই এবং পরনারীর সুখ। সম্পর্কেও অনবহিত।
তবে তো তুমি নতুন পাপী- মেয়েটি অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে বলল- আমি তোমার থেকে কোন নগদ বিনিময় নেব না। তুমি আমার একটি দাবি মেনে নাও, তাহলে আমি সারারাত তোমার সঙ্গে অতিবাহিত করাকেই তার বিনিময় মনে করব। কথা হল, পাপ করার মধ্যে সেই স্বাদ নেই, যে স্বাদ আছে পাপ করার মধ্যে। তুমি পুরুষ। নির্জন পরিবেশে আমার মত একটি যুবতীর সম্মুখে উপস্থিত থাকা অবস্থায় আমার কথাগুলো তোমার নিকট বিস্ময়কর ঠেকবে। তুমি আমার কথা মানবে না। একটু ভাব, তোমার চেহারা বলছে, তুমি এই আজ প্রথমবার পাপ করার মনস্থ করেছ। এমন শীতের রাতে আমি তোমার কপালে ঘামের ফোঁটা লক্ষ করছি।
