তারা সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। সম্মুখে সারি সারি পাহাড়। দলনেতা দাঁড়িয়ে যায় এবং কাফেলার সবাইকে দাঁড়াতে নির্দেশ দেয়। সে অভ্যর্থনাকারীদের সঙ্গে কানে কানে বলে- একথা ভুলে যেওনা, এরা সবাই হাবশী। তাদের ধর্ম অত্যন্ত বিস্ময়কর। তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি তোমাদেরকে অবাক করে ফেলবে। তোমাদেরকে সাবধান থাকতে হবে। তারা যদি চরম হাস্যকর কোন আচরণও করে ফেলে, তবু তাদের প্রতি পরম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে চলতে হবে। আমরা তাদেরকে ধর্মের নামে নিয়ে এসেছি। তাদেরকে প্রলোভন দেখিয়েছি, তোমাদেরকে যেখানে নিয়ে যাব, সেখানে খোদা অবস্থান করে থাকেন- সেই খোদা, যিনি বালুকারাশিকে পিপাসু রাখেন, সূর্যকে আগুন দান করেন এবং আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তোমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হবে। তাহল, এরা মানুষ বলি দিতে চাইবে। এরা মানুষ বলিদানে অভ্যস্ত।
বলি পুরুষের হবে নাকি নারীর, নাকি একজন পুরুষ ও একজন নারীর হবে, তা তাদের সরদার বলে দেবে। আমরা যদি তাদের এই রীতি পালন করার সুযোগ করে দেই, তাহলে যুদ্ধের ময়দানে দেখবে, তারা কিভাবে মিশরের ইট পাথরগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে। সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনী তাদের মোকাবেলায় একদিনের বেশি টিকতে পারবে না।
সরদার সকলকে বলল- তোমরা সেজদায় লুটিয়ে পড়; তোমরা খোদার ঘরে এসে পড়েছ।
সবাই সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। তারপর সরদারের নির্দেশে উঠে দাঁড়ায় এবং সরদারের পিছনে পিছনে হাঁটা দেয়।
এরা সুদানী হাবশী, যাদেরকে সুদান থেকে এনে মিশরে অনুপ্রবেশ করানো হচ্ছে। তাদেরকে লুকিয়ে রাখার জন্য বেছে নেয়া হয়েছে এই পার্বত্য ভূখন্ডকে। ফেরাউন আমলের গুহাসমূহ- যা মূলত পাতালপ্রাসাদ- উট ঘোড়াসহ বিশাল সেনাবাহিনীকে লুকিয়ে রাখা সম্ভব।
সুদানে রক্তখোর হাবশীদেরকে ধর্ম ও কুসংস্কারের নামে ঐক্যবদ্ধ করে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল। তারা যুদ্ধে অতিশয় পারদর্শী। গোত্রে গোত্রে লড়াই চলে তাদের। তীরান্দাজী ও অব্যর্থ বর্শাবাজীতে তারা পারঙ্গম। সুদানের শাসকরা খৃস্টানদের সঙ্গে চুক্তি করে অনেক খৃস্টান সেনাঅফিসারকে ডেকে এনেছিল। তারাই এই হাবশীদেরকে সুসংগঠিত ও নিয়মতান্ত্রিক কমান্ডের অধীনে যুদ্ধ করার প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। ইতিপূর্বে সুদানী বাহিনী দুবার পরাজিত হয়েছিল। তৃতীয় যুদ্ধ সেসময় সংগঠিত হয়, যখন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ভাই তকিউদ্দীন সুদান হামলা করেছিলেন। এই হামলাকে ব্যর্থ করে সুদানীরা তকিউদ্দীনের বাহিনীকে তছনছ করে দিয়েছিল। তকিউদ্দীন সুলতান আইউবীর সহায়তায় তার অবশিষ্ট সৈন্যকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। সে যুদ্ধে সুদানীদের ব্যর্থতা এই ছিল যে, তারা তকিউদ্দীনকে ধাওয়া করেনি এবং মিশর আক্রমণ করেনি। যদি তখন সুদানীরা। সাহস করে তকিউদ্দীনের বাহিনীকে ধাওয়া করত এবং মিশর আক্রমণ করে বসত, তাহলে তকিউদ্দীনের বাহিনী এতই পরিশ্রান্ত ছিল যে, তারা সুদানীদের হাত থেকে মিশরকে রক্ষা করতে পারত না।
এসব ব্যর্থতাকে সামনে রেখে খৃস্টানরা সুলতান আইউবীর যুদ্ধকৌশল পরীক্ষা করে দেখার পরিকল্পনা হাতে নেয়। তারা প্রত্যক্ষ করছিল যে, সুলতান আইউবী স্বল্প থেকে স্বল্পতম সৈন্য দ্বারা অধিক থেকে অধিকতর সৈন্যের উপর গেরিলা হামলা চালান এবং এক স্থানে স্থির হয়ে লড়াই করার পরিবর্তে বিক্ষিপ্ত হয়ে লড়াই করেন এবং বিশাল বিশাল বাহিনীকে ছিন্ন করে পর্যদস্ত করে ফেলেন। তাদের জানা আছে যে, এ জাতীয় আক্রমণ পরিচালনার জন্য কঠোর প্রশিক্ষণ ও বিশেষ প্রকৃতির সৈন্যের প্রয়োজন। সাধারণ সৈন্যরা জানে হুজুগের মধ্যে যুদ্ধ লড়তে। এ পেক্ষাপটেই তারা হাবশী কাবায়েলীদের মধ্যে যুদ্ধ উন্মাদনা সৃষ্টি করে ক্ষুদ্র একটি বাহিন গঠন করে নিয়েছে এবং তাদেরকে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছে। তারা কায়রোবাসীকে রাতের আঁধারে ঝাঁপটে ধরতে চাচ্ছে। সুলতান আইউবী এখন মিশরে অনুপস্থিত। তাদের বিশ্বাস, এই সুযোগে তারা ময়দান বাজিমাত করে ফেলতে সক্ষম হবে।
এই আক্রমণের কমান্ডের জন্য তাদের এমন একজন সেনা অধিনায়কের প্রয়োজন, যিনি হবেন মিশরী ফৌজের লোক, যাতে সময় ও শক্তি ব্যয় হবে কম এবং আঘাত হানবে ঠিকানামত। তাদের এই প্রয়োজন পূরণ করে দিলেন সুলতান আইউবীর সালার আল-কিন্দ। সুদানের হাবশী সৈন্যদের লুকানোর ব্যবস্থা আল-কি-ই করে দিয়েছিলেন। তিনি মিশরী ফৌজের চার পাঁচজন কমান্ডারকেও সঙ্গে ভিড়িয়ে নিয়েছেন। তিনি গোয়েন্দা মারফত সুদানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। সেই বাহিনী-ই এখন মিশরে অনুপ্রবেশ করছে।
***
গভীর রাত পর্যন্ত চৌকিতে নাচ-গান চলতে থাকে। অপর চৌকির কমান্ডার বিদায় নেয়ার সময় মেজবান কমান্ডারকে বললেন, ওদেরকে বলুন, আগামী রাতে যেন আমার চৌকিতে আসে। বাদকদল আনন্দচিত্তে কমান্ডারের আবদার মেনে নেয়। তারা আর যাবেই বা কোথায়। তারা তো সুদানী তথা আল কিদের প্রেরিত লোক। তারা যে বলেছিল, কারো আমন্ত্রণে এক গ্রামে গান গাইতে যাচ্ছিল, সে ছিল মিথ্যা কথা। তাদের কর্তব্য-ই ছিল, পানি পান করার নামে এই চৌকি দুটিতে অবতরণ করবে এবং কথা দ্বারা কমান্ডারদেরকে ফাঁদে আটকে ফেলবে। নর্তকী মেয়েরা ছিল অতিশয় চিত্তাকর্ষক। কমান্ডার তাদের জালে আটকে যান। বেজায় আবেগতাড়িত হয়ে তিনি অপর চৌকির কমান্ডারকেও ডেকে আনলেন। এই সুযোগে পঞ্চাশজন হাবশী সীমান্ত পার হয়ে পাহাড়ের অভ্যন্তরে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
