মেহমান কমান্ডারের তাবুতে প্রবেশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে খাওয়ার আয়োজন করা হল। সবাই খানা খেলেন। আহার শেষে কমান্ডারের নির্দেশে বাদক পুরুষ ও মেয়েরা বেরিয়ে যায়। মেহমান কমান্ডার জিজ্ঞেস করেন, এরা কারা? বাইরে কী হচ্ছে?
|||||||||| মেয়েগুলো নর্তকী- কমান্ডার জবাব দেন- সঙ্গের পুরুষরা বদক, তারা এ পথ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিল। পানি পান করার জন্য অবতরণ করলে আমি ডেকে এনে বসাই এবং কথা বলি। মেয়েগুলোকে আমার ভাল লেগেছে। আমি তাদেরকে খানা খাওয়ালাম। এই রাত তাদেরকে এখানেই রাখব। ওরা বড় ভাল মানুষ।
এই ধারা আমার পছন্দ হয় না- মেহমান কমান্ডার বললেন- এই বিলাসিতা সৈনিকদেরকে নষ্ট করে ফেলবে।
এসব ছাড়া সৈনিকরা নষ্ট হচ্ছে আরো বেশি- মেজবান কমান্ডার বললেন আমাদের সহকর্মীরা শহরে-নগরে আয়েশ করছে আর আমরা এখানে দেউলিয়ার ন্যায় ঘুরে মরছি। এই বিড়ম্বনা থেকে কবে নাগাদ নিস্তার পাব, জানি না। এভাবে জীবন কাটানো যায় না। তোমার সৈনিকরা কি তোমাকে কখনো বলেনি, আমাদেরকে বদলি করা হোক? আমার সৈনিকরা তো আমাকে অস্থির করে ফেলছে।
তা বটে, আমার চৌকিতে তো এ নিয়ে দুসৈনিকের মধ্যে মারপিটও হয়ে গেছে- মেহমান কমান্ডার বললেন- এখন তো সৈনিকরা সামান্য ব্যাপারেও রেগে ওঠে।
আমি আমার সালার আল-কিনৃদ-এর নিকট আবেদন প্রেরণ করেছি যে, এবার আমাদের প্রতি রহম করুন এবং আমাদেরকে প্রত্যাহার করে নিন মেজবান কমান্ডার বললেন- কিন্তু তিনি কোন জবাব দেননি। আমি বলেছি, আমাদেরকে সেই ময়দানে পাঠিয়ে দিন, যেখানে ঘোরতর লড়াই চলছে। যেখানে কোন কাজ নেই, সেখান থেকে আমাদের সরিয়ে নিন। এখানে যে কাজ ছিল, তা আমরা সম্পন্ন করেছি। এখানে অন্য বাহিনী প্রেরণ করা হোক।
অপর চৌকি থেকে আসা কমান্ডারের ভাবনাও একই। উভয় কমান্ডার ও তাদের অধীন সৈনিকরা একই পরিস্থিতির শিকার। উপরের সামান্য অবহেলা ভয়ঙ্কর এক পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে দেশটাকে। দুশমনের উপর বিদ্যুতের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ত অকুতোভয় যে ফৌজ, তারা আজ চরম মানসিক বিপর্যয়, নৈতিক অধঃপতন ও বিশৃংখলার শিকার। তারা আজ বিনোদনের উপায় খুঁজে ফিরছে এবং কর্তব্য পালনের পরিবর্তে নাচ-গান ও বাদ্য-বাজনা দ্বারা মন ভুলানোর চেষ্টা করছে।
***
রাত কেটে যাচ্ছে। মেয়েরা পালাক্রমে নাচছে-গাইছে। তারা ক্লান্ত হয়ে পড়লে গানের সুর ধরে বাদকরা। সৈনিকরা চীৎকার ও করতালি দিয়ে তাদের প্রশংসা করছে, উৎসাহ প্রদান করছে। তিন-চারজন সৈনিক মেয়েদের দিকে পয়সা ছুঁড়ে মারে। কিন্তু মেয়েরা এই বলে সেগুলো ফিরিয়ে দেয় যে, আমরা দেশের অতন্দ্র প্রহরী মোহাফেজদের নিকট থেকে পয়সা নেই না। বাদকরা দর্শক-শ্রোতাদের উদ্দেশে বলে, আমরা বিনিময় নেব না। আমাদের নাচ গানে যদি আপনারা আনন্দ পেয়ে থাকেন, তাহলে আবার তলব করবেন। যখনই বলবেন, আমরা এসে যাব। কোন বিনিময় ছাড়াই আমরা আপনাদের আনন্দ দিয়ে যাব।
দর্শনাথীদের দুজন কমান্ডার। পদমর্যাদায় উচ্চ না হলেও দায়িত্বশীল লোক তো বটে। কিন্তু তারা তাদের দায়িত্বের কথা ভুলে গেছে। এই গায়ক-নর্তকীরা কোথা থেকে আসল এবং কোথায় যাবে এবং নিজেদের যে পরিচয় প্রদান করল, তা সঠিক কিনা, তাও তারা জানবার চেষ্টা করল না। কমান্ডারগণ এ ও দেখল না যে, আসরে শ্রোতা-দর্শনার্থীদের মাঝে মিশরের মরুবাসীর পোশাকে যে কজন অপরিচিত লোক এসে বসল, তারা কারা এবং কোথা থেকে এসেছে। তারা এটাও লক্ষ্য করল না, চৌকির চারজন সৈনিক টহল প্রহরা থেকে আগে-ভাগে ফিরে আসল এবং তাদের পরিবর্তে অন্য সৈনিক পাঠানো হল না।
চৌকি থেকে দূরবর্তী একটি স্থান। অমাবশ্যার রাতের ন্যায় কালো চেহারার অন্তত পঞ্চাশজন লোক একজন অপরজনের পিছনে দল বেঁধে সুদানের দিক থেকে এদিকে আসছে। কাফেলার অনেক সম্মুখে অবস্থান করছে আরো দুব্যক্তি। কাফেলা সামান্য পথ অগ্রসর হয়ে থেমে যাচ্ছে। সম্মুখের লোক দুজন এদিক-ওদিক দেখে কাফেলাকে পথনির্দেশ করছে। কখন কোন্ দিকে যাবে, কোন্ পথে চলবে, স্থির করে তারা শকুনের ন্যায় শব্দ করছে আর তাদের সংকেত অনুসারে পিছনের কাফেলা অগ্রসর হচ্ছে। কাফেলাকে থামাতে হলে তারা শিয়ালের ন্যায় রা করছে।
চৌকির বাদ্য-রাজনার উচ্চ শব্দমালা মিশর সীমান্তের নীরব পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
সম্মুখে পার্বত্য এলাকা। কাফেলার কালো মানুষগুলো ঘোড় অন্ধকারাচ্ছন্ন পর্বতমালার ফাঁকে ঢুকে পড়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে বর্শা, তীর-ধনুক, তরবারী ও খঞ্জর। তাদেরকে স্বাগত জানানোর লক্ষ্যে সেখানে অবস্থান করছে জনাচারেক মানুষ। তাদের একজন আগত কাফেলার সরদারকে অভিবাদন জানিয়ে হাসিমুখে বলল মেয়েরা কাজ করে ফেলেছে স্যার।
হ্যাঁ, খবর পেয়েছি- সরদার বলল- আমরা বাদ্যের সুর শুনতে এসেছি। দশ-বারজন লোককে আমরা আগেই সেখানে পাঠিয়ে রেখেছিলাম। তাদের একজন এসে সংবাদ দিয়ে গেল, আসর তুঙ্গে উঠে গেছে এবং রাস্তা পরিষ্কার। টহলদার সিপাহীরাও আসরে চলে এসেছে।
নীল নদ থেকেও ভাল সংবাদ এসেছে- অভ্যর্থনাকারীদের একজন বলল তারা মেয়েদের দ্বারা ঠিক ঠিক কাজ নিয়েছে। আগামীকাল রাতে ওখানে যে দুসিপাহীর ডিউটি থাকবে, তাদেরকে ফাঁদে আটকে ফেলা হয়েছে। আমি সংবাদ পাঠিয়ে দিয়েছি। আগামীকাল রাত পর্যন্ত কমপক্ষে তিনটি বড় নৌকা এসে যাবে।
