তোমার সঙ্গে কি বিষ আছে? সান্ত্রী জিজ্ঞেস করে।
থাকতে হবে না- খিলখিল করে হেসে উঠে মেয়েটি বলল- তুমি আসলে আস্ত একটা বন্ধু সৈনিক। আমি কায়রো থেকে অনেক দূরে এক উঁচু এলাকার বাসিন্দা এই নদীটা যেখান থেকে এসেছে ঠিক সেখানে আমার বাস। আমাদের প্রধান খাদ্য হল মাছ। মাছের পিত্ত বিষে পরিপূর্ণ থাকে। তুমি দেখেছ, আমরা এখানেও মাছ শিকার করে থাকি। রান্না করার সময় আমি মাছের একটা পিত্ত লুকিয়ে রাখব আর তার কয়েক ফোঁটা বিষ নিয়ে মদের সঙ্গে মিশিয়ে বুড়োকে খাইয়ে দেব। তারপর ভ্রমণের নাম করে নদীর কূলে নিয়ে গিয়ে একটা ধাক্কা দিয়ে বেটাকে নদীত ফেলে দেব।
তারপর আমি তোমাকে কিভাবে নিয়ে যাব? সান্ত্রী জানতে চায়।
বৃদ্ধ মরে গেলে আমি স্বাধীন হয়ে যাব- মেয়েটি জবাব দেয়- আমি সকলকে বলব, তোমরা কেউ আমার অভিভাবক নও যে, তোমরা আমার পছন্দের বিয়ে প্রতিহত করবে। তারপর আমি তোমার সঙ্গে চলে যাব। তুমি আমাকে আমার বাড়ী পৌঁছিয়ে দেবে। আর শোন, মাঝে-মধ্যে আমার খোঁজ খবর নেবে কিন্তু। আচ্ছা, এখন চলে গেলে তুমি আবার কবে আসবে?
আমি শুধু টহলের সময়টায় আসতে পারব- সান্ত্রী জবাব দেয়- চৌকি এখান থেকে অনেক দূরে। টহলের ডিউটি ছাড়া ঘোড়া ব্যবহার করা যায় না। আগামী কাল দুপুরে এই সঙ্গীর সাথেই এখানে আমার ডিউটি পড়বে। তখন আসব।
এখান থেকে একটু দূরে থেক- মেয়েটি বলল- আমি পথে তোমার সঙ্গে দেখা করব। তারপর কোথাও লুকিয়ে বসে কথা বলব।
মেয়েটি সান্ত্রীর একটি হাত তার মুঠোয় নিয়ে নেয়। সান্ত্রী তার প্রতি তাকিয়ে থাকে। মেয়েটিও তার চোখে চোখ রাখে। সান্ত্রীর সব সংশয় দূর হয়ে যায়। সে মেয়েটির ডান হাতটা টেনে নিয়ে নিজের বুকে লাগিয়ে চেপে ধরে রাখে।
***
মেয়েটি যেখান থেকে পাথরের আড়ালে গিয়ে লুকিয়েছিল, সান্ত্রী ও মেয়েটি সেখানে গিয়ে পৌঁছে। কাফেলার মানুষগুলো তাদের চোখে পড়ে। তারা এদিকে তাকিয়ে রয়েছে। সান্ত্রী ও মেয়েটি সেদিকে ছুটে যায়। দুজন ঘোড়া থেকে অবতরণ করে। মেয়েটির বৃদ্ধ স্বামী উঠে এগিয়ে এসে সান্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে। মুখ দিয়ে কথা সরছে না তার। ঠোঁট কাঁপছে। অন্য লোকেরাও আপুত কণ্ঠে সান্ত্রীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। মেয়েটি তাদেরকে মিথ্যা কাহিনী শোনায়- এই সান্ত্রী নিজের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে আমাকে উদ্ধার করে এনেছে। অন্যথায় ঘোড়া আমাকে গর্তে নিক্ষেপ করে মেরেই ফেলেছিল।
নাটকের প্রথম পর্ব এখানেই শেষ হয়। সান্ত্রীদ্বয় চৌকির অভিমুখে ফেরত রওনা হয়। পথে এই সান্ত্রী তার সঙ্গীকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করে। সঙ্গীও জানায়, তুমি চলে যাওয়ার পর অন্য একটি মেয়ে আমাকে প্রেম নিবেদন করে। মেয়েটি প্রথমে আমার প্রতি এক বিস্ময়কর ভঙ্গিমায় তাকাতে থাকে। কাফেলার পুরুষ লোকগুলো অন্যমনস্ক হয়ে কথা বলছে। আমি তোমার সন্ধানে উঠে কিছুদূর অগ্রসর হই। কিন্তু পায়ে হেঁটে গিয়ে তোমাকে ধরা সম্ভব ছিল না বলে বেশীদূর এগুয়নি। দুটি মেয়ে আমার পিছনে পিছনে এগিয়ে আসে। একজন আমার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। কথায় কথায় মেয়েটি আমার প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করে এবং আমাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি এদিকে আবার কবে আসবে? তোমার সঙ্গে আমার আবার কোনদিন দেখা হবে? আমি বললাম, আগামীকাল দুপুরের সময় এখানে আমাদের ডিউটি থাকবে। মেয়েটি বলল, আমার স্বামী একজন বৃদ্ধ লোক। আমি তাকে ছেড়ে পালাতে চাই।
দুই সৈনিকের একই কাহিনী। তারা ভাবতে শুরু করে, মেয়ে দুটোকে কিভাবে সঙ্গে করে নেয়া যায়। তারা ভাবছে, মেয়েরা যদি তাদের স্বামীকে খুন করতে না পারে, তাহলে আমরা-ই তাদেরকে খুন করব। সুদর্শন এক কল্পনার জাল বুনতে বুনতে চৌকিতে গিয়ে পৌঁছে সুলতান আইউবীর দুই সিপাহী।
তারা চৌকির কমান্ডারকে রিপোর্ট করে- অমুক জায়গায় কায়রোর একটি বণিক কাফেলা অবস্থান নিয়ে আছে। আমরা তাদের তল্লাশী নিয়েছি। তাদের নিকট সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি।
সিপাহীরা কমান্ডারকে মেয়েদের সম্পর্কেও অবহিত করে। কমান্ডার রিপোর্টের প্রথম অংশটি মনোযোগ সহকারে শ্রবণ না করলেও তিনটি রূপসী যুবতী মেয়ের উল্লেখে চমকিত হয়ে ওঠে। মেয়েগুলোর সংখ্যা, বয়স, গঠন আকৃতি, উচ্চতা, রং-রূপ ইত্যাদি সবকিছু খুটিয়ে খুটিয়ে জেনে নেন তিনি।
চৌকিতে অন্য এক চৌকির এক সৈনিক অবস্থান করছিল। সে চৌকিটা এখান থেকে আট-দশ মাইল দূরে অবস্থিত। তার কমান্ডার এই সৈনিককে একটি বার্তা দিয়ে এখানে পাঠিয়েছেন- আজ সন্ধ্যার পর আমার চৌকিতে আসবেন; জরুরী কাজ আছে। একসঙ্গে যাওয়ার জন্য কমান্ডার বার্তাবাহক সৈনিককে বসিয়ে রেখেছেন।
সূর্যাস্তের পর কমান্ডার সিপাহীর সঙ্গে রওনা হয়ে যান। আট-দশ মাইল পথ অতিক্রম করে তারা যখন অপর চৌকিতে পৌঁছেন, তখন অনেক রাত।
চৌকিটা সবুজ-শ্যামল মনোরম একটা এলাকায় অবস্থিত। আজ অতিরিক্ত আরো কিছু জাকজমক চলছে। চৌকির সকল সৈনিক- যাদের এখন ডিউট নেই- চৌকির বাইরে বৃত্তাকারে বসে আছে। স্থানে স্থানে বাতি জ্বলছে। কমান্ডার এখানে নেই। মেহমান কমান্ডার তার তাঁবুতে যান। তাঁবুতে কমান্ডারের সঙ্গে উপবিষ্ট দুটি মেয়ে ও তিনজন মরুবাসী পুরুষ। তাদের সন্নিকটে পড়ে আছে বাদ্যযন্ত্র।
