সান্ত্রী ছুটে চলছে। এখন তার সম্মুখে ভোলা মাঠ। কিন্তু না, মেয়েটার তো কিছু-ই হয়নি! ঔ তো ঘোড়া তাকে নিয়ে ছুটে চলছে! কতটুকু অগ্রসর হয়ে তার ঘোড়া একদিকে মোড় নিয়েই আবারো চোখের আড়ালে চলে যায়। সান্ত্রী মেয়েটির চীৎকার ও ঘোড়ার পদশব্দ শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু ঘোড়া দেখা যাচ্ছে না। কতদূর অগ্রসর হয়ে সেও একদিকে মোড় ঘুরায়। কিন্তু এখন না ঘোড়া দেখা যাচ্ছে, না মেয়েটির চীৎকার শোনা যাচ্ছে। সান্ত্রী ভাবে, সম্ভবত ঘোড়া কোন গর্তে পড়ে গেছে। সে ঘোড়ার গতি কমিয়ে দেয়। এগিয়ে যায় আরো কতটুকু সামনে। এবার মেয়েটির ডাক তার কানে আসে- এদিকে আস, জলদি আমার কাছে আস।
সান্ত্রী সেদিক তাকায়। অবস্থা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় সে। একি! ঘোড়াটা বহাল তবিয়তে দাঁড়িয়ে আছে, আর মেয়েটি দিব্যি তার পিঠে বসা! তার চেহারায় ভয়-ভীতির কোন ছাপ নেই; বরং দুঠোঁটে মুচকি হাসি! সান্ত্রী একবার ভাবে, ঘোড়া হাঁকিয়ে এখান থেকে পালিয়ে যাই। সে নিশ্চিত, মেয়েটি মানুষ নয়- জিন-পরী কিংবা ভূত-প্রেত। ফাঁকি দিয়ে তাকে এই নির্জন জায়গায় নিয়ে এসেছে আর এখন তার রক্ত পান করবে। কিন্তু মেয়েটির মুখের মুচকি হাসি আর দেহের রূপ-লাবণ্যে এতই শক্তি যে, সিপাহীকে ঘোড়াসহ কাছে টেনে নিয়ে যায়।
তুমি সৈনিক- তুমি পুরুষ- মেয়েটি বলল- তুমি আমাকে ভয় করছ?
মেয়েটি সান্ত্রীর হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল- ঘোড়া বে-লাগাম হয়নি। আমি ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটে পালিয়ে এসেছি আর চীৎকার করে বুঝাবার চেষ্টা করেছি, ঘোড়া বে-লাগাম হয়ে গেছে এবং আমি পড়ে যাচ্ছি। আমার জানা ছিল, তুমি আমার পিছনে পিছনে ছুটে আসবে। আমি আনাড়ি নই- দক্ষ ঘোড়সওয়ার।
এই ধোকাটা তুমি কেন দিয়েছ? সান্ত্রী জিজ্ঞেস করে।
আমাকে তোমার সাহায্যের প্রয়োজন- মেয়েটি বলল- কথাটা সকলের সামনে বলা সম্ভব ছিল না। ঐ লোকগুলোর মধ্যে তুমি একজন বৃদ্ধলোক দেখেছ। তিনি আমার স্বামী। তুমি তার বয়স দেখ আর আমার যৌবনও দেখ। লোকটা আমাকে খুশী রাখার জন্য আমাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
অপর মেয়েরা কারা? সান্ত্রী জিজ্ঞেস করে।
ওরা দুজনই বিবাহিতা মেয়েটি জবাব দেয়। তাদের স্বামীরা যুবক। বিনোদনের জন্য তারা ওদেরকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুমি আমাকে সাহায্য কর।
লোকটা যদি তোমাকে অপহরণ করে নিয়ে আসত, তাহলে আমি তাকে ধরে চৌকিতে নিয়ে যেতাম- সান্ত্রী জবাব দেয়। কিন্তু তুমি তো তার স্ত্রী।
আমি তাকে স্বামী বলে স্বীকার করি না। তাছাড়া তোমাকে দেখার পর তার প্রতি আমার ঘৃণা আরো বেড়ে গেছে- আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মেয়েটি বলল- তোমাকে প্রথমবার দেখামাত্র আমার অন্তর থেকে আওয়াজ আসল, এই যুবক-ই তোমার স্বামী। আল্লাহ তোমাকে এই সুদর্শন যুবকটির জন্যই সৃষ্টি করেছেন।
আমি অত সুশ্রী নই, যতটা তুমি বলছ- সান্ত্রী বলল- তুমি কেন আমাকে ধোকা দিচ্ছ? তোমার মনে কী আছে, খুলে বল।
আল্লাহ জানেন আমার অন্তরে কী আছে- দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হতাশ কণ্ঠে মেয়েটি বলল- তিনিই হৃদয়ে দয়ার উদ্রেক করবেন। তুমি যদি আমার হৃদয়ের আওয়াজকে প্রতারণা মনে করেও থাক, তারপরও আমি আর বুড়োটার কাছে ফিরে যাব না। ঘোড়া হাঁকিয়ে ঘোড়াসহ সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আল্লাহর নিকট গিয়ে বলব, তুমি আমাকে হত্যা করেছ।
সান্ত্রী সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী, আলী বিন সুফিয়ান কিংবা আল আদেলের ন্যায় ব্যক্তিত্ব নয়- একজন ত্যাক্ত-বিরক্ত সাধারণ সৈনিক। তদুপরি টগবগে যুবক। মেয়েটির রূপ-যৌবন ও চলন-বলন তাকে মোমে পরিণত করে ফেলেছে। তবে তার এতটুকু অনুভূতি আছে যে- আমি একজন সাধারণ সৈনিক আর তুমি রাজকন্যার সমান। কোমল গালিচা থেকে নেমে এসে আমার সঙ্গে এই বালুকাময় প্রান্তর আর পাহাড়-উপত্যকায় টিকতে পারবে না।
নরম গালিচা ও ধন-দৌলত আমার লক্ষ যদি হত, তাহলে ঐ বৃদ্ধ অপেক্ষা ভাল স্বামী আর হতে পারে না- মেয়েটি বলল- লোকটা তো তার সমুদয় ঐশ্বৰ্য্য আমার পায়ের উপর ফেলে রেখেছে। আমার একান্ত আকাংখা, আমি একজন সৈনিকের স্ত্রী হব। আমার পিতাও সৈনিক। বড় দুভাইও সৈনিক। তারা সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে দামেস্ক ও সিরিয়ার ময়দানে যুদ্ধ করছে। আমার মা আমাকে এই বৃদ্ধের হাতে তুলে দিয়েছেন। আমরা গরীব মানুষ। আমার রূপ-সৌন্দর্যই আমাকে এই দুভাগ্যের পথে ঠেলে দিয়েছে। আমি একজন দক্ষ অশ্বারোহী। কিন্তু আমার স্বামী বিষয়টা জানেন না। আমি বহুবার আকাংখা করেছি, আমি সুলতান আইউবীর বাহিনীতে যোগ দেব। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে একজন সৈনিকের স্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করব। তুমি আমাকে বালুকাময় প্রান্তর আর পাহাড়-উপত্যকার ভয় দেখিও না। মরুভূমিতে আমার জন্ম। মরুভূমির উত্তপ্ত বালি যখন আমার রক্ত চুষে নিবে, তখন-ই কেবল আমার আত্মা নিশ্চিন্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে।
আমি কিভাবে তোমার সাহায্য করতে পারি বল। সান্ত্রীর পরাজিত কণ্ঠ।
ওঠ, আমরা ধীরে ধীরে ফিরে যাই। ওরা আমাদের পিছনে পিছনে এসে থাকবে হয়ত। পথে তোমাকে বলব, আমি কী ভাবনা ভেবে রেখেছি। মেয়েটি বলল।
সান্ত্রী ও মেয়েটি যার যার ঘোড়ায় চড়ে ধীরে ধীরে পাশাপাশি চলছে। মেয়েটি বলছে, আমি তোমাকে বলব না যে, তুমি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাও। এটা আইনত অপরাধ হবে। আমার স্বামী আদালতে মামলা করবে, আমরা উভয়ে শাস্তি ভোগ করব। আমাকে আগে স্বামীটা থেকে মুক্ত হতে হবে। তার পন্থা হল, তাকে এমনভাবে হত্যা করতে হবে, যা মূলত হত্যা বলে মনে হবে না। তুমি না পারলে কাজটা আমি করব। একটা পদ্ধতি এই হতে পারে যে, মদের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে তাকে পান করাব আর রাতের বেলা নদীর কিনারে নিয়ে ধাক্কা মেরে নদীতে ফেলে দেবে। মানুষ মনে করবে, লোকটা নিজেই নেশা করে পানিতে পড়ে গেছে। এর জন্য দু-চারদিন অপেক্ষা করতে হবে। তার জন্য আমি তাকে এখানেই রেখে দেব।
