কায়রো যাওয়ার পথ তো এটা নয়। এক সান্ত্রী বলল।
আমাদের সঙ্গে কয়েকটা মেয়ে আছে। তাদের শখ, তারা নদীর কূলে কূলে যাবে- একজন জবাব দেয়- আমাদের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন আর কোন তাড়া নেই। দু-তিনদিন এখানেই অবস্থান করব। আপনাদের যদি সন্দেহ হয়, তাহলে আসুন, আমাদের মাল-পত্র পরীক্ষা করে দেখুন। আমাদের নিকট প্রচুর অর্থ আছে। তাও দেখুন। তাতেই আপনারা নিশ্চিত হবেন যে, আমরা সত্যিই মিশরী ব্যবসায়ী।
অশ্বারোহী সান্ত্রীদ্বয় তাদের সঙ্গে হাঁটা দেয় এবং তাদের তাঁবুতে গিয়ে পৌঁছে। দেখে অন্য সবাই ওঠে দাঁড়িয়ে তাদের সম্মান প্রদর্শন করে। সবাই মাথানত করে সালাম জানিয়ে তাদের সঙ্গে হাত মিলায়। একজন সরলমনে জিজ্ঞেস করে, আমাদের মাল-পত্র খুলে দেখবেন কি? সান্ত্রীদ্বয় পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে এবং বলে, না, দেখার প্রয়োজন নেই। একজন সুলতান আইউবীর ফৌজের প্রশংসা করতে শুরু করে। তারপর তারা সান্ত্রীদের যৌবন, বীরত্ব ও কর্তব্যনিষ্ঠার তারিফ করে। তারা মুখে এমন একটি শব্দ উচ্চারণ করল না, যার ফলে তাদের ব্যাপারে সান্ত্রীদের মনে সন্দেহ জাগতে পারে।
ইত্যবসরে মেয়ে চারটি পোশাক পাল্টিয়ে ও মাথার চুল ঝেড়ে তাঁবুতে এসেছে। কিন্তু তারা সরাসরি সামনে না এসে লাজুক মুখে আড়ালে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সান্ত্রীরা এই বিরানভূমিতে দু-আড়াই বছরে এই প্রথম কয়েকজন মানুষের মজমা দেখতে পেল এবং এই দীর্ঘ সময়ে এই প্রথমবারের মত তারা নারীর মুখ দেখল। তারা মেয়েগুলোর মধ্যে নারীর সব রূপ-ই দেখতে পেল। মা, বোন, স্ত্রী এবং সেই নারী, যে না বোন, না মা, না স্ত্রী। সান্ত্রীদের চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিয়ে গেছে যেন মেয়েগুলো। মেয়েগুলো তাদের প্রতি তাকিয়ে তাকিয়ে লজ্জা প্রকাশ করছে এবং মুখ লুকিয়ে হাসছে। তাদের লাজ-শরম প্রমাণ করছে, তারা সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা।
লোকগুলোর সহজ-সরল কথামালা আর মেয়েগুলোর রূপের জাদুতে ফেঁসে যায় সুলতান আইউবীর দুই সীমান্ত প্রহরী। কর্তব্যের কথা ভুলে যায় তারা। দীর্ঘদিন পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় পড়ে থাকা এবং কাজ-কর্ম না থাকার প্রতিক্রিয়ায় ভয়াবহ এই যৌন পিপাসা তাদের ঘায়েল করে ফেলছে। এক ব্যক্তি নদীর কূলে দাঁড়িয়ে বঁড়শি দ্বারা মাছ ধরছিল। লোকটা অনেকগুলো মাছ শিকার করেছে। একজন মেয়েদের বলল, যাও মাছগুলো রান্না কর। নির্দেশ পাওয়ামাত্র চারটি মেয়ে ছুটে যায়। তারা মাছগুলো কেটে রান্না করে ফেলে।
***
অশ্বারোহী সীমান্ত প্রহরীদ্বয় তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারেও ত্যাক্ত বিরক্ত। তাদেরকে উন্নত খাবার পরিবেশন করা হয় বটে; কিন্তু প্রতিদিন একই খাবার খেয়ে খেয়ে অরুচি ধরে গেছে। নীল নদের কূলে যখন তাদের সামনে ভুনা মাছ আর রান্না করা শুকনো গোশত পরিবেশন করা হল, দেখেই তাদের জিহ্বায় পানি এসে গেল। তার উপর যখন সবাই একসঙ্গে খাওয়া শুরু করে, খাবার আরো সুস্বাদু হয়ে ওঠে। আহারের মাঝে তারা দেখল, একটি মেয়ে তাদের একটি ঘোড়ার ঘাড় ও শিং-এ হাত বুলাচ্ছে এবং ঘোড়াটাকে আদর করছে। মেয়েরা পুরুষের সঙ্গে খেতে বসেনি। এই ঘোড়াটা যে সান্ত্রীর, সে মেয়েটির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখে। মেয়েটিও তার উপর চোখ পড়ামাত্র মুচকি একটা হাসি দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সান্ত্রীরা এত রূপসী মেয়ে আগে কখনো দেখেনি।
এক বৃদ্ধ সান্ত্রীদের বলল- আমাদের এই মেয়েরা কখনো ঘোড়ায় চড়েনি। যে মেয়েটা ঘোড়ার নিকট দাঁড়িয়ে আছে, ওর ঘোড়ায় চড়ার বড় শখ। কিন্তু কখনো-ই তার ঘোড়ার পিঠে বসার সুযোগ হয়ে ওঠেনি।
আমরা চারজনের-ই শখ পূরণ করব। এক সান্ত্রী বলল।
আহার শেষে সান্ত্রী উঠে তার ঘোড়ার নিকট চলে যায়। মেয়েটি মাথানত করে লাজুক মুখে একদিকে সরে দাঁড়ায়। সান্ত্রী তাকে বলল- আস, আমি তোমার ঘোড়ার পিঠে চড়ার শখ পুরণ করব। একজন একজন করে সবাইকে ঘোড়ায় চড়াব।
পিছন দিক থেকে আওয়াজ ভেসে এল- লজ্জা কর না; এরা তোমাদের ইজ্জত ও দেশের মোহাফেজ। এরা না থাকলে খৃস্টান ও সুদানীরা তোমাদের কী দশা ঘটাবে, আল্লাহ-ই ভাল জানেন।
মেয়েটি মাথার ওড়নাটা নীচের দিকে টেনে নিয়ে ঘোমটার মত করে পা টিপে টিপে ঘোড়ার নিকটে চলে যায়। সান্ত্রী তার পা রেকাবে তুলে দিয়ে পাজাকোলা করে তাকে ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দেয়। এমন সময় কে একজন পিছন থেকে সান্ত্রীকে ডাক দিয়ে কি যেন বলতে শুরু করে। সান্ত্রী সে দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করে। হঠাৎ ঘোড়াটা একদিকে ছুটতে শুরু করে। মেয়েটা চীৎকার জুড়ে দেয়। সান্ত্ৰী ঘাড় ফিরিয়ে দেখে ঘোড়া দ্রুতগতিতে দৌড়াচ্ছে এবং পিঠে বসা মেয়েটি এদিক-ওদিক দুলে পড়ছে আর সামলে বসে থাকার চেষ্টা করছে। সবাই হৈ-হুঁল্লোড় জুড়ে দেয় যে, ঘোড়া নিয়ন্ত্রণহারা হয়ে পড়েছে মেয়েটা পড়ে মরে যাবে। সান্ত্রীর নিকটে তার সঙ্গীর ঘোড়াটা দাঁড়ান ছিল। সে এক লাফে তাতে চড়ে বসে চারুক মেরে ছুটে চলে। মেয়েকে বহনকারী ঘোড়া চোখের আড়ালে চলে গেছে। সান্ত্রী তার ঘোড়ার গতি যতটুকু সম্ভব বাড়িয়ে দেয়। তার জানা মতে এতক্ষণে মেয়েটি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেছে, তার পা দুটো রেকাবের সঙ্গে আটকে গেছে। হাড়-গোড় ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে এবং ঘোড়া তাকে টেনে-হেঁচড়ে হাড়-মাংস আলাদা করে ফেলছে।
