সুলতান আইউবীর আমলে আসওয়ান ডেমের চারপাশের ভৌগলিক অবস্থা ছিল ভিন্ন রকম। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত টিলা আর পাহাড়। ফেরাউনদের বিশেষ সুদৃষ্টির প্রমাণ বহন করছে টিলা ও পাহাড়গুলো। তারা পাহাড় কেটে কেটে তৈরী করেছিল বিশাল বিশাল মূর্তি। সবচে বড় মূর্তিটির নাম আবু সম্বল। কোন কোন পর্বতের চূড়া কেটে কেটে উপাসনালয়ের গম্বুজ কিংবা কোন এক ফেরাউনের মুখের আকৃতি তৈরী করা হয়েছে। পর্বতমালার পাদদেশে তৈরী করা হয়েছে গুহা। অভ্যন্তর অতিশয় প্রশস্ত ও বিস্তৃত। কোন গুহা এমনও তৈরী করা হয়েছে, যার ভিতরে অসংখ্য কক্ষ ও রাস্তা-ঘাট বিদ্যমান।
ফেরাউনরা এই রহস্যময় জগতটা কেন আবাদ করেছিল, তা বলা মুশকিল। পাহাড় কেটে কেটে এই মূর্তি নির্মাণ ও গুহা ইত্যাদি তৈরী করতে অতীত হয়েছে তিনটি বংশধারা। ফেরাউনরা ছিল সে যুগের খোদা। জনসাধারণের কাজ ছিল ফেরাউনদের সেজদা করা এবং তাদের যে কোন আদেশ-নিষেধ মান্য করে চলা। সেই মজলুম ও ক্ষুধা-পীড়িত প্রজাদের দ্বারাই খোদাই করা হয়েছে এই পাহাড়, পর্বত। আজ সেখানে কোন মূর্তি নেই। নেই কোন গুহা বা পাহাড়। বর্তমানে সে স্থানে বিরাজ করছে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত আসওয়ান ডেম। এই ডেম তৈরীর আগে পাহাড়ের ন্যায় বৃহৎ বৃহৎ মূর্তিগুলোকে মেশিনের সাহায্যে সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ডিনামাইটের সাহায্যে পাহাড়গুলোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। ফেরাউনরা যদি মানুষের হাতে এসব পাহাড়-পর্বতকে এভাবে উড়ে যেতে ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে দেখত, তাহলে তারা খোদা হওয়ার দাবি থেকে হাত গুটিয়ে নিত।..
সুলতান আইউবীর আমলে এই পার্বত্য এলাকাটার চিত্র ছিল অন্য রকম। সে যুগে এই পর্বতমালার উপত্যকা ও গুহায় পৃথিবীর সব সৈন্য লুকিয়ে থাকতে পারত। সীমান্তের যে স্থান দিয়ে নীলদরিয়া মিশরে প্রবেশ করেছে, সুলতান আইউবীর সে এলাকাটির প্রতি বিশেষ মনোযোগ ছিল। সুদানীরা নৌকায় করে এস্থান দিয়ে মিশর ঢুকে যেতে পারত। এই নদী পথটির উপর দৃষ্টি রাখার জন্য নদী থেকে বেশ দূরে সুলতান আইউবী একটি সেনাচৌকি বসিয়েছিলেন। চৌকি থেকে নদী দেখা যেত, নদী থেকে চৌকি দেখা যেত না। সুলতান আইউবী পরিকল্পিতভাবেই এই দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন, যাতে অনুপ্রবেশকারীরা এই আত্মপ্রবঞ্চণায় লিপ্ত থাকে যে, তাদেরকে দেখার ও ধরার মত কেউ নেই। গোপন প্রহরার মাধ্যমে নদীতে চলাচলকারী নৌযানের প্রতি নজর রাখা হত। দুজন অশ্বারোহী প্রতিক্ষণ টহল দিয়ে ফিরত।
সুলতান আইউবীর মিশরে অনুপস্থিতির সময়কার ঘটনা। একদিন দিনের বেলা সীমান্ত চৌকির দুঅশ্বারোহী ডিউটিতে বের হয় এবং প্রতিদিনের ন্যায় দূরে চলে যায়। নদীর কূলে একস্থানে কতটুকু সবুজ-শ্যামল এলাকা। বড় বড় ছায়াদার বৃক্ষ আছে সেখানে। জায়গাটা খুবই মনোরম। টহল সেনারা সুযোগ পেলে এখানে এসে বিশ্রাম নেয়, সময় কাটায়। দীর্ঘদিন পর্যন্ত তারা কোন সুদানীকে নদী পার হয়ে এপার আসতে দেখেনি। প্রথমদিকে তারা অনেক লোককে গ্রেফতার করেছে। তাদের অনেকে ছিল নাশকতাকারী ও গুপ্তচর। তারপর থেকে এই নদীপথে লোক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সান্ত্রীরা আসে শুধু ডিউটি পালন করার জন্য এবং চৌকির দৃষ্টির বাইরে চলে এসে কোথাও বসে আরাম করে সময় কাটায়।
এই দু’অশ্বারোহীর নিয়মও একই ছিল। এখন তারা বিরক্ত ও অতিষ্ঠ। নদীকূলের এমন সবুজ-শ্যামল জায়গাও এখন তাদের কাছে ভাল লাগে না। প্রতিদিন নদী দেখে দেখে তারা তার সৌন্দর্যের প্রতি নির্মোহ হয়ে পড়েছে। বহিঃজগতের কোন বস্তু এখানে চোখে পড়ে থাকলে তাহল মরু শিয়াল। ওরা নদীতে পানি পান করতে আসে আর সান্ত্রীদের দেখে পালিয়ে যায়। আর দেখা যেত দু-চারজন মৎস্যশিকারী। সুলতান আইউবীর সান্ত্রীরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করত, তোমরা কোথাকার লোক। পরে তারা এই প্রশ্ন করাও ছেড়ে দিয়েছে আর এক সময় ওরাও আসা বন্ধ করে দিয়েছে। সেদিন সান্ত্রীরা টহল এলাকায় পৌঁছে বলাবলি করতে শুরু করে। আমাদের সঙ্গীরা কায়রো, ইস্কান্দারিয়া ও অন্যান্য শহরে বসে আয়েশ করছে আর আমরা এই জঙ্গল–বিয়াবানে পড়ে রয়েছি। তাদের কণ্ঠে ক্ষোভ ও অস্থির আভাস।
সান্ত্রীরা দূর থেকেই দেখতে পায়, সবুজ এলাকায় চার-পাঁচটি উট বাঁধা রয়েছে। পার্শ্বে এক স্থানে উপবিষ্ট আট-দশজন লোক। চারজন মানুষ নদীতে গোসল করছে। অশ্বারোহী সান্ত্রীদ্বয় কতটুকু সামনে অগ্রসর হয়ে থমকে দাঁড়ায়। গোসলরত প্রাণীগুলো সম্ভবত মানুষ নয়। তারা পরী। গায়ে হালকা কাপড়। কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে গোসল করছে তারা। তাদের গায়ের রং মিশরী নারীদের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয়। তারা গোসল করছে আর হাসাহাসি করছে। সান্ত্রীদ্বয় এই ভেবে ঘাবড়ে যায় যে, ওরা কি জলপরী, আকাশপরী, নাকি ফেরাউনদের রাজকন্যাদের প্রেতাত্মা! সান্ত্রীদ্বয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের দেখছে। তারা আর সামনে অগ্রসর না হয়ে সেখান থেকেই ফিরে যাওয়ার মনস্থ করে। কিন্তু এমন সময় উটের পার্শ্বে উপবিষ্ট লোকগুলোর দু ব্যক্তি উঠে তাদের দিকে এগিয়ে আসে। মেয়েরাও তাদেরকে দেখে ফেলে। তারা নদী থেকে উঠে কূলবর্তী ডাঙ্গায় একস্থানে লুকিয়ে যায়। সান্ত্রীদের ভয় কিছুটা কেটে যায়। তারা অগ্রসরমান ব্যক্তিদ্বয়ের নিকট এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, তোমরা কারা? এখানে কী করছ? তারা মাথা ঝুঁকিয়ে সান্ত্রীদের সালাম করে। লোকগুলো মরুবাসীর পোশাক পরিহিত। তার বলল, আমরা কায়রোর ব্যবসায়ী। সীমান্তবর্তী এলাকায় মাল বিক্রি করে ফিরে যাচ্ছি।
