একই পরিবেশ, একই আবহাওয়া এবং একই ভূখন্ডে অবস্থান করে ও দীর্ঘদিন পর্যন্ত প্রহরার দায়িত্ব পালন করতে করতে এই সৈন্যরা বিরক্তি অনুভব করতে শুরু করেছে। সুদান নিশ্চুপ। চোরাচালানী বন্ধ। বেকারত্ব ও অলসতা সৈন্যদের মন-মানসিকতার উপর ধ্বংসাত্মক ক্রিয়া ফেলতে শুরু করেছে। তাদের হাতে এখন না আছে কোন কাজ, না আছে বিনোদনের কোন উপায় উপকরণ। ঋতুতেও কোন পরিবর্তন নেই। বালির সমুদ্র, বালির টিলা ছয়মাস আগে যেমন, এখনো তেমন। আকাশের বর্ণেও কোন পরিবর্তন নেই। এই পরিস্থিতি ও সৈন্যদের বিরক্তির প্রথম ক্রিয়া এই দেখা দেয় যে, টহলরত অবস্থায় কোন পথিককে পেলে তুমি কে, কোথায় যাচ্ছ, তোমার সঙ্গে কী? এসব প্রশ্ন করার পরিবর্তে থামিয়ে তাদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিচ্ছে এবং এটা ওটা বলে চিত্তরঞ্জন করছে। যেসব চৌকির সন্নিকটে জনবসতি আছে, তারা গ্রামে ঢুকে পড়ে লোকদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, গল্প-গুজব করছে।
একটি দেশের সীমান্ত প্রহরীদের এই আচরণ দেশের জন্য ছিল বিপজ্জনক। কিন্তু তারা দায়িত্ব পালনে অতিষ্ঠ সৈনিক। কোন না কোন উপায়ে কোন না কোন স্থানে গিয়ে মনোরঞ্জন করা এখন তাদের মানবিকতার দাবি। তাদের কমান্ডারও তাদের-ই ন্যায় মানুষ। তিনিও সময় কাটানোর এবং বিনোদনের উপায় অন্বেষণে ব্যস্ত।
***
সুলতান আইউবী যখন দামেস্ক রওনা হন, তখন তিনি এতই ব্যস্ত ছিলেন যে, সীমান্ত বিষয়ে সকল প্রকার নিদের্শনা প্রদান করা সত্ত্বেও তাঁর মাথায় আসেনি যে, সীমান্তের পুরাতন বাহিনীর বদলির নির্দেশ প্রদান করে যেতে হবে। সম্ভবত তিনি নিশ্চিন্ত ছিলেন, তাঁর কমান্ডার আল-কি সব দায়িত্ব-ই পালন করে থাকবে। সুলতান আইউবীর চলে যাওয়ার পর যখন আল-আদেল সিপাহসালারের দায়িত্ব বুঝে নেন, তখন তিনি আল-কিনদকে জিজ্ঞেস করেন, সীমান্তে যে বাহিনী রয়েছে, তারা কতদিন যাবত দায়িত্ব পালন করছে? আল কি জবাব দেন, বহুদিন যাবত।
সীমান্তে আরো সৈন্য প্রেরণের প্রয়োজন আছে কি?- আল-আদেল জিজ্ঞেস করেন- আর পুরাতন বাহিনীকে প্রত্যাহার করে কায়রো নিয়ে এসে সেখানে নতুন বাহিনী প্রেরণ করার আবশ্যক রয়েছে কিনা?
না– আল-কিনদ জবাব দেন- এরা সেই বাহিনী, যারা দেশ থেকে তরি তরকারী, খাদ্যদ্রব্য, পশু এবং অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি বিদেশে চোরাচালান হওয়াকে প্রতিহত করেছে। তারা এখন সীমান্ত এবং আশপাশের এলাকায় থাকতে অভ্যস্ত। তারা দূর থেকে সন্দেহভাজন লোকের ঘ্রাণ শুঁকে-ই তাকে গ্রেফতার করে ফেলতে সক্ষম। তাদের স্থলে নতুন সৈন্য প্রেরণ করলে নতুনদের অভিজ্ঞতা অর্জন করতেই অন্তত এক বছর সময় লেগে যাবে। এমন ঝুঁকি মাথায় তুলে নেয়া আমাদের পক্ষে ঠিক হবে না।
আল-কিনদ-এর জবাবে আল-আদেল নিশ্চিন্ত হন। তাকে একথাও বলার মত কেউ ছিল না যে, এই আল- কিনদ রাতে নিজ ঘরে বসে বলছিলেন, আমার এই সীমান্ত বাহিনীটা অকর্ম হয়ে পড়েছে। আমার প্রচেষ্টা সফল হয়েছে যে, আমি তাদের বদলি হতে দেইনি। তারা সীমান্ত এলাকার লোকদের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব স্থাপন করে নিয়েছে। তাদের বর্তমান অবস্থা হল, তাদের পেট সবসময় ভরা থাকে-খাওয়ার ব্যাপারে তাদের কোন অভিযোগ নেই। আমি তাদের জন্য প্রয়োজনের চেয়েও বেশী খাদ্য সরবরাহ করি। কিন্তু তারা প্রবৃত্তির যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে আছে। কোন কাফেলা পথ অতিক্রম করতে দেখলে তারা কাফেলার মহিলাদের মুখ উদোম করে তাকিয়ে থাকে। এবার আমি আমার কাজ করতে পারি।
আল-কিনদ যার সঙ্গে কথা বলছিলেন, সে একজন সুদানী। মেহমানের বেশে আল-কি-এর ঘরে সে এসেছে। সুদান থেকে তার জন্য উপটোকন নিয়ে এসেছে। সঙ্গে ছিল একটি বার্তা। লোকটি আল-কিনৃদকে জানায়, সুদানীরা প্রস্তুত। কিন্তু সেনাসংখ্যা এখনো ততবেশী সংগৃহীত হয়নি। লোকটি জানতে চায়, সুদানী সৈন্যরা কিভাবে মিসরে প্রবেশ করবে? সীমান্ত অতিক্রম করা তার দৃষ্টিতে একটি কঠিন ব্যাপার। তারই জবাবে আল- কিনদ উপরোক্ত তথ্য পেশ করে।
আল-কিনদ সেই সালারদের একজন, যাদের উপর সুলতান আইউবীর পূর্ণ আস্থা আছে। তিনিও কারো মনে এই সন্দেহ জাগতে দেননি যে, তিনি মিশরের অনুগত নন। আলী বিন সুফিয়ানকে পর্যন্ত তিনি ধোকায় ফেলে রেখেছেন। দু-আড়াই বছর আগে তিনি যে সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানী রোধ করেছিলেন এবং সীমান্তকে সম্পূর্ণরূপে সীল করে দিয়েছিলেন, সেই ইমেজই তাকে বেশ কাজ দিচ্ছে। তিনি যে দেশের একজন গাদ্দারে পরিণত হয়েছেন, তা কেউ টেরই পেলনা।
সুলতান আইউবীর চলে যাওয়ার পর আল-কিদ আদেলকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন, আপনি সুদানের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকুন। সুদানের একটি পাখিও মিশরে প্রবেশ করতে পারবে না। আলী বিন সুফিয়ানকেও তিনি একই নিশ্চয়তা প্রদান করতে থাকেন। অথচ সুদানে হাবশীদের একদল সৈন্য মিশর আক্রমণ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। তাদের পরিকল্পনা হল, তারা ছোট ছোট দলে মিশরে ঢুকে চুপিচুপি কায়রোর নিকটে পৌঁছে যাবে এবং রাতের বেলা হামলা করে রাতেই মিশরের ক্ষমতা দখল করে নিবে।
***
সুদানের গা ঘেঁষে মিসরের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে নীল দরিয়া। কিছুটা অগ্রসর হয়ে মিশরীয় এলাকায় প্রশস্ত একটি ঝিলের রূপ ধারণ করেছে নদীটি। আরো সামনে গিয়ে ঢুকে পড়েছে পার্বত্য এলাকার ভেতর। তারপর সম্মুখের দিকে এগিয়ে গেছে নালার রূপ ধারণ করে। তারই নিকটে অবস্থিত আসওয়ান ডেম।
