সুলতান আইউবী আলরিস্তানের পর্বতমালায় বসে পরবর্তী হামলার পরিকল্পনা ঠিক করছেন আর হাবে বসে নয়জন ভাড়াটিয়া খুনী ভাবছে, আইউবীকে কোথায় কীভাবে হত্যা করা যায়।
৪.৩ ভয়াবহ ষড়যন্ত্র
ভয়াবহ ষড়যন্ত্র
মিশরের সে এলাকায় বর্তমানে আসওয়ান ডেম অবস্থিত, আটশত বছর আগে সেখানে একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছিল। ঐতিহাসিকগণ আইউবী আমলের সেই যুদ্ধের কথা উল্লেখই করেননি। ইতিহাসে শুধু এতটুকু উল্লেখ পাওয়া যায় যে, সুলতান আইউবীর একজন সেনাপতি বিদ্রোহী হয়ে গিয়েছিল। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তার ডায়েরীতে সেই সেনাপতির নামও লিখে রেখেছেন। নামটা হল, আল-কানাজ বা আল-কি। লোকটা ছিল মিশরী মুসলমান। তার মা ছিলেন সুদানী। সম্ভবত সুদানী রক্ত-ই তাকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উস্কে দিয়েছিল। সে যুগের ঐতিহাসিকদের প্রকাশিত পান্ডুলিপিতে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তাতে তার বিদ্রোহের পটভূমি অনেকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১১৭৪ সালের শেষ এবং ১১৭৫ সালের শুরুর সময়। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী মিশরে অনুপস্থিত। নুরুদ্দীন জঙ্গীর ওফাতের পর উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবেলায় তিনি এখন দামেস্ক অবস্থান করছেন। ষড়যন্ত্র-শিকার অপ্রাপ্ত বয়স্ক আনাড়ী খলীফার হাত থেকে দামেস্ক দখল করার পর হেস ও হামাত দুর্গও জয় করেছেন। হাব দুর্গ অবরোধ করতে গিয়ে তিনি অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। সেই সঙ্গে ত্রিপোলীর খৃস্টান ম্রাট রেমন্ডের আক্রমণের শিকার হন তিনি। সুলতান আইউবী হাবের অবরোধ প্রত্যাহার করে পিছনে সরে গিয়ে খৃস্টান বাহিনীকে পথেই প্রতিহত করার কৌশল অবলম্বন করেন। সুলতান আইউবী তার কৌশলে সফল হন এবং রেমন্ড লড়াই ত্যাগ করে পিছনে সরে যায়। কিন্তু সেখানে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেনি; বরং সেখান থেকেই মূল যুদ্ধের সূচনা হয়।
সুলতান আইউবী আলরিস্তান পর্বতমালায় তার বাহিনীকে ছড়িয়ে রেখেছেন। একই সময়ে তাকে তিনটি শত্রুর মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এক. আস-সালিহ ও তার সহচরগণ। দুই. খৃস্টান বাহিনী। তিন. ঋতু। পরিস্থিতিটা ১১৭৫ সালের জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী মাসের, যখন পাহাড়ের চূড়াগুলো সাদা রফে ঢাকা এবং জনবসতিগুলো শীতে কাঁপছে থর থর করে। সুলতান আইউবী সেখানে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছেন, যেন তিনি লোহার শিকলে বাঁধা পড়েছেন।
মিশরের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নন সুলতান। তিনি সেখানকার সেনাকমান্ড আপন ভাই আল-আদেলের হাতে অর্পণ করে এসেছেন। সেখান থেকে কিছু ফৌজ তিনি পরে তলব করে নিয়েও এসেছেন। মিশরের উপর সমুদ্রের দিক থেকে খৃস্টানদের এবং দক্ষিণ দিক থেকে সুদানীদের হামলার আশংকা বিদ্যমান। তার চেয়েও বেশী শংকা খৃস্টান ও সুদানীদের গোপন নাশকতামূলক তৎপরতা। মিশরে দুশমনের গুপ্তচরবৃত্তি ও নাশকতা অনেকটাই দমন করা হয়েছে বটে, কিন্তু তা সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে গেছে বলা যায় না। এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য সুলতান আইউবী আলী বিন সুফিয়ানকে কায়রো রেখে এসেছেন। ভাই আল-আদেলকেও তিনি এ ব্যাপারে সতর্ক করে এসছেন। কিন্তু আল-আদেল ও আলী বিন সুফিয়ান দুজনে মিলেও সুলতান আইউবীর শূন্যস্থান পূরণ করতে সক্ষম হননি।
মিশর ত্যাগ করার সময় মিশরের সীমান্তে ও উপকূলীয় রক্ষীবাহিনীর ব্যাপারে সুলতান তাঁর ভাই আল-আদেলকে নির্দেশ প্রদান করে যান, সুদানী সীমান্তে যদি সামান্যতম গন্ডগোলও দেখা দেয়, তাহলে যেন কঠোর হাতে তার মোকাবেলা করা হয় এবং প্রয়োজন হলে যেন সুদানের অভ্যন্তরে ঢুকে গিয়ে যুদ্ধ করা হয়। কিন্তু অতি জরুরী একটি বিষয়ের প্রতি মনোনিবেশ করতে ভুলে যান সুলতান। তাহল, সীমান্ত বাহিনীর বদলি। সে সময়ে সীমান্ত বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য ও কমান্ডার এমন ছিল যে, তারা দুবছরের বেশি সময় ধরে সীমান্তে নিয়োজিত রয়েছে। এরা সেই বাহিনী, যারা দুশমনের সঙ্গে জানবাজি লড়াই লড়ে এসেছে। কাজেই তাদের হৃদয় দুশমনের ঘৃণায় পরিপূর্ণ। তারা সুদানীদের কিছুই মনে করে না। তাদের আগে সীমান্ত প্রহরায় যে বাহিনী ছিল, তারা ভাল ছিল না। তাদের উপস্থিতিতেই মিসরের বাজার থেকে খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী চোরাচালান হয়ে সুদান চলে যেত। সুলতান আইউবী ময়দান থেকে ফিরে এসে সেই বাহিনীকে বদলী করে ময়দান থেকে আনা বাহিনীকে সীমান্তে নিয়োজিত করেন। তারা সীমান্তে পৌঁছেই ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে দেয়। অল্প সময়ের মধ্যে সত্যিকার অর্থেই তারা মিশরের সীমান্তকে সুরক্ষিত করে ফেলে।
এটি দু-আড়াই বছর আগের ঘটনা। শুরুতে তাদের মনে জোশ ও জযবা ছিল এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসার পর তারা ধীরে ধীরে নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়ে। এই বেকারত্ব তাদের চেতনাকে উই পোকার ন্যায় খেয়ে ফেলতে শুরু করে। সুলতান আইউবী ছিলেন একজন দূরদর্শী মানুষ। তিনি প্রতিটি দিক, প্রতিটি কোণ ও প্রতিটি ক্ষেত্রের উপর সমানভাবে দৃষ্টি রাখতেন। কিন্তু সীমান্ত বাহিনীর বদলির ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টির প্রতি ব্যক্তিগতভাবে তিনি দৃষ্টি দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। সীমান্ত বাহিনীর বিভাগটাই ছিল আলাদা, যার কমান্ডার ছিল সেনাপতি পদমর্যাদার এক ব্যক্তি, যার নাম আল-কি। বছরে তিনবার না হোক অন্তত দুবার সেনাবদলি ছিল তার দায়িত্ব। কিন্তু লোকটা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ এ কাজটা করল না। ফলে এই অবহেলার পরিণতি ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করে।
