আলরিস্তান একটি পর্বতশ্রেণীর নাম। রেমন্ডকে তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হবে। তার পরিকল্পনা অনুপাতে এই পথ তার জন্য খুবই উপযোগী। হামাত এসে সুলতান আইউবীর বাহিনীকে পিছন ভাগ ও রসদ ইত্যাদির পথে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে, এই হল তার পরিকল্পনা। তাতে সফল হলে সুলতান আইউবী হাবের ফৌজ ও রেমন্ডের বাহিনীর মধ্যখানে আটকা পড়ে যাবেন। কিন্তু সুলতান আইউবী হাল অবরোধ প্রত্যাহার করে বাহিনীকে অন্য একদিকে পাঠিয়ে দেন এবং নিজে আলরিস্তানের দিকে রওনা হয়ে যান।
আলরিস্তানের পাহাড়ের চূড়াগুলো বরফে ঢাকা। রেমন্ড আনন্দিত যে, এই মওসুমে সুলতান আইউবীর মরু সৈনিকরা তার ইউরোপিয়ান ও অত্র অঞ্চলের খৃষ্টান সেনাদের সঙ্গে লড়াই করে পেরে উঠবে না। কিন্তু এই ভাবনা ভাবতে ভাবতে যখন সে একটু সামনে অগ্রসর হল, তো বরফঢাকা পর্বতমালার চূড়া থেকে তার বাহিনীর উপর তীর বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেল। ঘটনাটা তার কাছে নিতান্তই আকষ্মিক ও অভাবিতপূর্ব।
রেমন্ড কোন যুদ্ধ ছাড়াই তার বাহিনীকে পিছনে সরিয়ে নিয়ে যায়। সর্বত্রই তার আক্রান্ত হওয়ার আশংকা। সুলতান আইউবীর যুদ্ধকৌশল তার ভালভাবেই জানা। অনেক দূর পিছনে সরে গিয়ে সে ছাউনি ফেলে। এবার কোন্ পথে এগুবে, ভাবতে শুরু করে সে।
ঋতু পাল্টে গেছে। বর্ষণ শুরু হয়ে গেছে। সাত-আটদিনে ঘোড়ার শুকনা ঘাস শেষ হয়ে গেছে। রসদ-পাতিরও অভাব দেখা দিয়েছে। রেমন্ড রসদের ব্যবস্থাটা ভালই করে রেখেছিল। ওখান থেকে নিয়মিত রসদ আসছিল। কিন্তু দিন কয়েক হল, এখন আর আসছে না। আসছেনা কোন সংবাদও। ব্যাপারটা কী? রেমন্ড দূত পাঠায়। দূত ফিরে এসে সংবাদ জানায়, সুলতান আইউবীর সৈন্যরা রসদের পথও অবরোধ করে রেখেছে। শুনে রেমন্ড বিস্মিত হয়ে পড়ে যে, সুলতান আইউবী এত দ্রুত এ পর্যন্ত আসল কীভাবে! পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য রেমন্ড দুজন অফিসারকে পিছনে প্রেরণ করে।
অফিসাররা তিন-চারদিন পর ফিরে আসে। তারা সংবাদের সত্যতা স্বীকার করে, সত্যিই সুলতান আইউবী রসদের পথ বন্ধ করে রেখেছেন। তারা এ সংবাদও নিয়ে আসে যে, আইউবী হাবের অবরোধ তুলে নিয়েছেন।
তার অর্থ আমরা আমাদের কর্তব্য পালন করেছি- রেমন্ড বলল- চল, ত্রিপোলী ফিরে যাই।
***
রেমন্ড যুদ্ধ না করেই ফিরে গেছে, এ সংবাদ শুনে সুলতান আইউবী বিস্মিত হন। পিছুহটার জন্য সে যেপথ অবলম্বন করে, তা ছিল দুর্গম। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে যেপথে এসেছিল, সে পথে যেতে রাজি নয়। সুলতান আইউবীর সঙ্গে যুদ্ধ করার ইচ্ছা-ই ত্যাগ করেছে সে। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, রেমন্ড যুদ্ধ করার ইচ্ছা ত্যাগ করেছিল কথাটা সঠিক। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হল, সুলতান আইউবী তাকে লড়াই করার পজিশনে থাকতে দেননি। রেমন্ড এই ভেবে ঘাবড়ে গিয়েছিল যে, মুসলিম সৈন্যরা এই শীতের মধ্যে এত চমৎকার লড়াই করছে, যেন তারা লড়াইটা উপযুক্ত মওসুমে সমতল ময়দানে করছে। দ্বিতীয় কারণ, সুলতান আইউবী তার পিছনে এবং রসদ সরবরাহের পথে গিয়ে বসে পড়েছিলেন। তৃতীয় ও সবচে বড় কারণ ছিল ভিন্ন একটি, যা পরে ফাঁস হয়। তাহল, রেমন্ড মূলত আস-সালিহ-এর নিকট থেকে বিপুল অর্থ-সম্পদ নিয়েছিল। কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল, মুসলমানদেরকে পরস্পর যুদ্ধে জড়িয়ে দেয়া। সে লক্ষ্য তার পূরণ হয়ে গেছে। খৃস্টানরা মুসলিম উম্মাহকে দুভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে এবং তাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। যখন ত্রিপোলী থেকে রেমন্ডের দূত একটি বার্তা এনে আস-সালিহ-এর হাতে পৌঁছায়, তখন তার উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে যায়। বার্তাটা হল- আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে, সালাহুদ্দীন আইউবী যদি আপনাকে অবরোধ করে ফেলে, তাহলে আমি সেই অবরোধ ভেঙ্গে দেব। আমি যেইমাত্র সংবাদ পেলাম যে, সালাহুদ্দীন আইউবী হাব আক্রমণ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজে ফৌজ নিয়ে আপনার সাহায্যে ছুটে এসেছি। আমার আগমনের সংবাদ টের পেয়ে তৎক্ষণাৎ আইউবী হাবের অবরোধ তুলে নিয়েছেন। আমি আমার ওয়াদা পূর্ণ করেছি। কাজেই আপনার সঙ্গে আমার যে সামরিক চুক্তি ছিল, তা এখন আর নেই। যে কর্তব্য পালনের জন্য আপনি আমাকে সোনা-দানা পাঠিয়েছিলেন, তা আমি পালন করেছি। কাজেই পত্র পাওয়া মাত্র আপনি আমার সামরিক প্রতিনিধি ও উপদেষ্টাদের ফেরত পাঠিয়ে দিন।
রেমন্ডের বার্তা পাঠ করে হাবের শাসকরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। দুজন ঐতিহাসিক লিখেছেন, রেমন্ডের মনে এই শংকাও জাগতে শুরু করে যে, সুলতান আইউবী তার রাজধানী ত্রিপোলী আক্রমণ করে বসতে পারেন। এই আশংকার ভিত্তিতে আলরিস্তান থেকে ফিরে গিয়ে রেমন্ড তার রাজধানীর প্রতিরক্ষা আরো শক্ত করতে শুরু করে।
আস-সালিহ এখনো আনাড়ি-অনভিজ্ঞ। তার এক-দুজন উপদেষ্টা তাঁকে পরামর্শ দেয়, আপনি সুলতান আইউবীর সঙ্গে আপস করে নিন। কিন্তু সাইফুদ্দীন ও গোমস্তগীন প্রমুখ তাঁকে সাহায্যের নিশ্চয়তা দিয়ে আপস সমঝোতার পথ থেকে সরিয়ে রাখে। তাদেরই একজন আস-সালিহকে বলেছিল, সালাহুদ্দীন আইউবী দিন কয়েকের মেহমান মাত্র। নতুন ঘাতকদল এসে গেছে। তারা ধর্মীয় নেতা ও পীর-বুযুর্গের বেশে সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট এই আবেদন নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে যে, আপনারা আর পরস্পর যুদ্ধ করবেন না। উভয়পক্ষ বসে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করে নিন। সুলতান আইউবী সম্মানার্থে তাদেরকে নিজের পার্শ্বে বসতে দেবেন। নির্জনে বসে তাদের কথা শুনবেন। এই সুযোগে ঘাতক তাকে হত্যা করে নিরাপদে কেটে পড়বে।
