এ দৃশ্য দেখে হয়ত আল্লাহও কাঁদছেন- পার্শ্বে দন্ডায়মান নায়েবদের উদ্দেশে সুলতান বললেন- উভয় পক্ষে এ কাদের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে? এ হল ইসলামের পতনের আলামত। মুসলমান যদি হুঁশে না আসে, তাহলে কাফেররা তাদেরকে এভাবেই যুদ্ধ করিয়ে করিয়ে শেষ করে দেবে। আমার বন্ধুগণ! তোমরা আমাকে নিশ্চিত কর যে, আমি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নই। আমি আমার তরবারীটা আস্-সালিহ-এর পায়ের উপর ফেলে দেই।
আপনি অবশ্যই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত মোহতারাম সুলতান- এক নায়েব বললেন- আমরাও সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। আপনি মন থেকে সব সংশয় সন্দেহ দূর করে ফেলুন।
সুলতান আইউবীর বাহিনী নদী পার হয়ে গেছে। সম্মুখে হাল্ব নগরী দেখা যাচ্ছে। সুলতান নগরীর প্রতি তাকান। তার বিস্তৃতি, গঠন প্রণালী ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখে ভাবেন, সরাসরি হামলা করে শহরের অভ্যন্তরে ঢুকে লড়াই করব নাকি অবরোধ করব। শহরের আভ্যন্তরীণ অবস্থাটা আসলে কী, তা এখনো তার অজানা। হাবের সাধারণ মানুষগুলো তাঁর বিপক্ষে এক একটা আগুনের ফুল্কি হয়ে আছে, তা তিনি জানেন না। তাঁর আশা ছিল, যেহেতু তারা মুসলমান, তাই জনগণ যুদ্ধে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। সম্ভবত আশাবাদ-ই তাঁকে দিয়ে এমন কিছু কাজ করায়, তাকে অস্থির করে ফেলে। তিনি আধা অবরোধের বিন্যাসে তার বাহিনীকে সম্মুখে এগিয়ে দেন। যুদ্ধের সূচনা হয় তীর বিনিময়ের মাধ্যমে। কিন্তু খানিক পর-ই তিনি অনুভব করলেন যে, তাঁর বাহিনী পিছনে সরে আসছে। হাবের নিরাপত্তা বিধানে একদিক থেকে অন্তত দুশত ঘোড়সওয়ার বেরিয়ে আসে। তারা সুলতান আইউবীর এক পদাতিক ইউনিটের এক পার্শ্বের উপর আক্রমণ চালায় বড় তীব্র ও দুঃসাহসী আক্রমণ।
সুলতান আইউবীর অশ্বারোহী বাহিনী পাল্টা আক্রমণ করে তাদের পদাতিক বাহিনীকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। কিন্তু ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট হয়ে নিজেদের-ই সৈন্য মারা যায়। তারপর পরিস্থিতি এই দাঁড়ায় যে, শহর থেকে পদাতিক কিংবা অশ্বারোহী এক একটি সেনাদল বেরিয়ে আসছে আর তাদের পিছনে পিছনে শহরের উঁচু উঁচু স্থান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর ছুটে আসছে। এই তীরবৃষ্টির আড়ালে আক্রমণকারী সেনারা সুলতান আইউবীর বাহিনীর অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ছে। হাবের এই যুদ্ধ ছিল বড়ই রক্তক্ষয়ী।
এই অবস্থায় সুলতান আইউবীর দু-তিনজন গোয়েন্দা শহর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং সুলতানকে খুঁজে বের করে তাঁর নিকট চলে যায়। হাবের জনসাধারণকে কীভাবে উত্তেজিত করা হয়েছে, তারা সুলতানকে তা অবহিত করে। তারা জানায়, শহর প্রতিরক্ষায় যত না সৈন্য যুদ্ধ করছে, তার চেয়ে বেশি করছে সাধারণ নাগরিক। এ মুহূর্তে আপনার মোকাবেলায় সৈন্যের চে জনসাধারণের সংখ্যা বেশী। সুলতানের শুধু এটুকু জানা ছিল যে, হাবের অধিবাসীদেরকে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তারা যে তাঁর বিরুদ্ধে এমন উন্মাদনার সাথে লড়াই করবে, সে ধারণা তার ছিল না। সুলতান তাদের বীরত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে আফসোসের সুরে বললেন- এ হল মুসলমানের শান! এই হল মুসলমানদের সামরিক চেতনা! কিন্তু কাফেররা তাদের এই চেতনাকে তাদের-ই দ্বীন-ধর্মের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে; কিন্তু তারা তা বুঝছে না।
সুলতান আইউবী তাঁর বাহিনীকে পিছনে সরিয়ে আনেন। এক নায়েব তাঁকে পরামর্শ দিলেন, শহরের উপর মিনজানীক দ্বারা অগ্নিগোলা নিক্ষেপ করা হোক। কিন্তু সুলতান তার পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করে বললেন- তা করা হলে সাধারণ মানুষদের বাড়ী-ঘর পুড়ে যাবে। নারী ও শিশুরা মারা যাবে। শহরটা যদি খৃস্টানদের হত, তাহলে এতক্ষণে নগরীর সর্বত্র দাউ দাউ করে আগুন জ্বলত এবং তা আমার কমান্ডোদের আয়ত্ত্বে চলে আসত। যেসব মুসলমান ময়দানে এসে যুদ্ধ করে ও জীবন দেয়, আমি তাদেরকে ঠেকাতে পারি না আর যারা ঘরে বসে আছে, তাদেরকে হত্যা করতে পারি না।
সুলতান আইউবী আরো কয়েকটি ইউনিটকে সামনে ডেকে এনে শহরকে পরিপূর্ণরূপে অবরোধ করে ফেলেন এবং নির্দেশ জারি করেন, আপতত আমরা আত্মরক্ষামূলক লড়াই করব। আমাদের উপর যদি হামলা হয়, তাহলে তা প্রতিহত করব এবং অবরোধ শক্তভাবে ধরে রাখব। সুলতান আইউবীর সেনা সংখ্যাও কম, শহরকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করাও তাঁর লক্ষ্য।
১১৭৫ সালের জানুয়ারী পুরো মাসটা অবরোধ বহাল থাকে। হাবের ফৌজ ও জনসাধারণ অবরোধ ভাঙ্গার জন্য হামলা চালায়। কিন্তু তারা সফল হতে পারছে না।
১লা ফেব্রুয়ারী ভোরবেলা সুলতান আইউবী সংবাদ পান, ত্রিপোলীর খৃস্টান সম্রাট রেমন্ড হামাতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তিনি রেমন্ডের সৈন্য সংখ্যা সম্পর্কেও অবহিত হন। এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, সে ব্যাপারে সুলতান আইউবীর আগে থেকেই ধারণা ছিল। তার মোকাবেলার প্রস্তুতিও তিনি নিয়ে রেখেছেন। তিনি তার জন্য দুইউনিট সৈন্য রিজার্ভ রেখে দিয়েছেন এবং এমন জায়গায় রেখেছেন, যেখান থেকে রেমন্ডকে স্বাগত জানানোর জন্য তাদের সময়মত পৌঁছানো সম্ভব। সুলতান সংবাদটা পাওয়ামাত্র তাদের নিকট দূত প্রেরণ করেন- যত দ্রুত সম্ভব তোমরা আলরিস্তান পৌঁছে গিয়ে উঁচুতে তীরন্দাজদের বসিয়ে দাও। অশ্বারোহী বাহিনীকে পিছনে রাখবে। আমি আসছি। খৃষ্টান বাহিনী যদি আমার আগে পৌঁছে যায়, তাহলে তোমরা মুখোমুখি যুদ্ধের ঝুঁকি নেবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত ওঁৎ পেতে গেরিলা হামলা চালিয়ে যাবে।
