এ সংবাদে সুলতান আইউবীর মনে সন্দেহ জাগে, তাহলে কি হলববাসীরা আমার আগমন সংবাদ জেনে ফেলল! তবে তো তাদের অজ্ঞাতসারে হাল জয় করা সম্ভব হবে না। তিনি অন্য কোন স্থান দিয়ে নদী পার হওয়া যায় কিনা তথ্য নেয়ার জন্য আবার গোয়েন্দা প্রেরণ করেন। পাশাপাশি তিনি এই সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেন, ওপারের শত্রুবাহিনীকে ধোঁকা দিতে হবে যে, আমার আক্রমণ ও অগ্রযাত্রা এ পথেই হবে। তিনি সে রাতেই কমান্ডো বাহিনী রওনা করিয়ে দেন। তাঁর নিজের হেডকোয়ার্টার সেখান থেকে পাঁচ মাইল দূরে। নদীর তীরে দুশমনের যে ফৌজ অবস্থান করছে, তারাও এই আত্মপ্রচঞ্চনায় লিপ্ত যে, এত তীব্র শীতের রাতে কেউ হামলা করবে না।
তখন মধ্যরাত। হাবের সৈন্যরা নিজ নিজ তাঁবুতে জবুথবু হয়ে পড়ে আছে। কমান্ডার নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাচ্ছে। জেগে আছে শুধু কয়েকজন প্রহরী। এক প্রহরী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করছে। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন তার ঘাড় ঝাঁপটে ধরে। অন্য একজন এসে দুজনে মিলে লোকটাকে তুলে নিয়ে যায়। এরা সুলতান আইউবীর কমান্ডো। তারা প্রহরীকে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, তোমাদের ঘোড়ার পাল কোথায়? কমান্ডোরা প্রহরীর বুকে দুটি তরবারীর আগা ঠেকিয়ে রেখেছে। প্রহরী বুঝে ফেলেছে, এরা সুলতান আইউবীর সৈনিক। সে বিনীত কণ্ঠে বলল, আমি তোমাদের মুসলমান ভাই। যুদ্ধটা হচ্ছে রাজ বাদশাহদের বিবাদ। আমরা কেন পরস্পর রক্ত ঝরাব?
প্রহরী জানায়, ঘোড়াগুলো এক স্থানে বাধা নেই। ফৌজ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। সে কারণে সৈন্যদের তাঁবুর সঙ্গে দু-তিনটি করে ঘোড়া বেঁধে রাখা হয়েছে।
কমান্ডোরা প্রহরীকে তাদের ক্যাম্পের নিকট নিয়ে যায়। জিজ্ঞেস করে, কমান্ডাররা কে কোথায় আছে বল। প্রহরী অনুমানের ভিত্তিতে কমান্ডারদের তাবুর অবস্থান দেখিয়ে দেয়।
প্রহরীকে পিছনে সরিয়ে আনা হল এবং বলা হল, এখানে দাঁড়িয়ে থেকে তামাশা দেখ।
সেখানে ছোট আকারের একটি মিনজানীক ছিল। কমান্ডোরা তাতে একটি পাতিল বসিয়ে দেয়। চারজন লোক ওটিকে একটু পিছনে টেনে নিয়ে ছেড়ে দেয়। পাতিলটা গুলির ন্যায় উড়ে যায়। আরেকটি পাতিল ছোঁড়া হয় অন্যদিকে। তারপর আরো দুটি। সবগুলো গিয়ে দুশমনের ক্যাম্পে নিক্ষিপ্ত হয়। প্রহরীরা কে? কে? বলে চীৎকার জুড়ে দেয়। কোন্দিক থেকে যেন মাথায় সলিগাথা তীর এসে মাটিতে পড়ে। পাতিলগুলো এখানেই এসে পড়ে ভেঙ্গেছিল। ভাঙ্গা পাতিলের ভিতর থেকে তরল পদার্থ বের হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল। এগুলো দাহ্য পদার্থ। তীরের সলিতাগুলো তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। দুটি তাঁবুতেও আগুন ধরে যায়। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। ক্যাম্পে শোর-গোল, ছুটোছুটি শুরু হয়ে যায়। ঘোড়াগুলো রশি ছিঁড়ে পালাতে থাকে। সৈন্যরা এদিক-ওদিক ছুটাছুটি শুরু করলে কমান্ডোরা তীর ছুঁড়তে শুরু করে। দৈর্ঘ-প্রস্থে এক মাইলেরও বেশী জায়গা জুড়ে তাঁবু। কমান্ডার জবাবী অভিযান শুরু করতে না করতে সুলতান আইউবীর কমান্ডোরা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে উধাও হয়ে গেছে।
শোচনীয় রূপ ধারণ করেছে ক্যাম্পের অবস্থা। বিপুল ক্ষতিসাধণ করেছে। আগুন। তার উপর কমান্ডোদের তীর আর ভীত-সন্ত্রস্ত অশ্বপালের পায়ের তলায় পিষে হতাহত হয়েছে অসংখ্য সৈনিক। অবস্থা সামলাতে তাদের ভোর হয়ে যায়। হঠাৎ একদিক থেকে এক ব্যক্তি চীৎকার করে ওঠে- সাবধান! সাবধান! পুনরায় প্রলয় শুরু হয়ে যায়। এবার কমান্ডো নয়-হামলা করেছে সুলতান আইউবীর বাহিনীর একটি ইউনিট। দুশমন এখানে প্রতি মুহূর্ত প্রস্তুত থাকে। কিন্তু রাতের কমান্ডোরা তাদের অবস্থা এমনই শোচনীয় করে এসেছে যে, তাদের সব প্রস্তুতি লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। তারা পুনঃসংগঠিত হয়ে লড়াই করার অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু আর স্থির হতে পারেনি তারা। সুলতান আইউবী তাদের শক্তি-সাহস আগেই শেষ করে দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও উভয় পক্ষের অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। শত্রুবাহিনী পিছু হটতে শুরু করে। কমান্ডাররা তাদের উজ্জীবিত করার বহু চেষ্টা করে। কিন্তু কোন কাজ হল না। সুলতান আইউবীর কমান্ডোরা তাদের উদ্দেশে চীৎকার করে বলতে থাকে তোমরা কাফেরদের বন্ধু। আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। তোমরা নিজেদের পরিণতি দেখ। তোমাদের উপর আল্লাহর গজব নাযিল হচ্ছে।
সুলতান আইউবী তার বাহিনীর একজন সাধারণ সৈনিকের মাথায়ও এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিয়েছেন যে, তোমরা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত আর কাফেরদের বন্ধুরা মুরতাদ। তার বিপরীতে খলীফার বাহিনীর কাছে এরূপ কোন লক্ষ্য বা কোন স্লোগান ছিল না।
শত্রুবাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। অনেকে পিছপা হয়ে নদী পার হয়ে পালিয়ে গেছে। অনেকে এদিক-ওদিক গিয়ে লুকিয়ে গেছে। সুলতান আইউবী তার আক্রমণকারী বাহিনীর কমান্ডারকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন, দুশমন যদি পিছু হটে যায়, তাহলে তোমার বাহিনী বা কোন সৈন্য যেন নদী পার না হয়। তিনি এই ক্যাম্পের উপর হামলা করে মূলত শক্রকে ধোকা দিয়েছেন। তিনি শক্রদেরকে ধাওয়া করতে চাচ্ছেন না। সামনের বিস্তারিত তথ্য না নিয়ে তিনি আর অগ্রসর হবেন না। দূরের অন্য কোন স্থান দিয়ে তিনি নদী পার হতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু দুশমন যখন এখান দিয়েই তাকে সুযোগ দিয়ে দিল, তখন তিনি এখান দিয়েই নদী অতিক্রম করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তিনি নিজে সম্মুখে এগিয়ে যান। তাঁর সৈনিকরা এদিক-ওদিক লুকিয়ে থাকা শত্রুসেনাদের খুঁজে খতম করছে। অস্ত্রসমর্পনকারীদের সংখ্যাও অনেক। সুলতান একটি উঁচু টিলার উপর চড়ে রণাঙ্গনের দৃশ্য অবলোকন করছেন। আনন্দের পরিবর্তে তার মুখমন্ডল বিষাদে ছেয়ে গেছে।
