রেমন্ড যাতে সময় থাকতে এসে পৌঁছুতে পারে, সে জন্য তারা কালক্ষেপণের পন্থা অবলম্বন করে যে, সুলতান আইউবীকে হাল্ব অবরোধে দীর্ঘ সময় আটকে রাখতে হবে। খৃস্টান উপদেষ্টাগণ গোপনীয়তা রক্ষা করার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ প্রদান করে। তাদের জানা আছে যে, শহরে সুলতান আইউবীর গুপ্তচর রয়েছে। তাই তারা শহরটা সম্পূর্ণ সীল করে দেয়। তারা তৎক্ষণাৎ ঘোষণা করে দেয়, যদি কেউ শহর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তাকে সাবধান না করেই তীর ছুঁড়বে। সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে মসজিদেও ঘোষণা করে দেয়া হয় যে, সুলতান আইউবী সামরিক শক্তি ও রাজত্বের নেশায় হাব আক্রমণ করেছেন। খৃস্টানরা নাশকতার ওস্তাদ। তারা নতুন নতুন পন্থায় প্রোপাগান্ডা চালাতে শুরু করে। ঘরে ঘরে, গলিতে গলিতে, মসজিদে মসজিদে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে, সুলতান আইউবীর ফৌজ যে শহর জয় করে, সেখানকার সকল যুবতী মেয়েদের একত্রিত করে তারা তাদের সম্ভ্রম ছিনিয়ে নেয়। মানুষের সহায়-সম্পদ লুট করে শহরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ কথাও প্রচার করা হয় যে, সুলতান আইউবী নবুওতের দাবি করেছেন এবং একটি নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছেন, যা সম্পূর্ণ কুফ্রী।
এমন বহু গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় হাবের সর্বত্র। এমনিতেই সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টির তৎপরতা বিগত ছয় মাস যাবত চলে আসছে। জনমনে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ-উন্মাদনা সৃষ্টি করা হয়েছে। সর্বশেষ এসব তাজা প্রোপাগান্ডা জনগণকে অগ্নিশর্মা করে তোলে। তারা জীবন দিতে ও জীবন নিতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
শহর সীল হওয়ার কারণে সুলতান আইউবীর গোয়েন্দারা বেকার হয়ে পড়ে। তারা শহরের অধিবাসীদের মধ্যে আইউবী বিরোধী রোষ ও ক্রোধ প্রত্যক্ষ করে। এক গোয়েন্দা শহর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে প্রাণ হারিয়েছে। সে সুলতান আইউবীকে এই সংবাদ পৌঁছাতে চেয়েছিল যে, শহরের পরিস্থিতি আমাদের অনুকূল নয় এবং তিনি যেন আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত হয়ে না আসেন। সে শহর থেকে বের হওয়ার জন্য ঘোড়া হাঁকায়। কিন্তু দুটি তীর তাকে কাবু করে ফেলে। আইউবীর গোয়েন্দাদের কমান্ডার নাগরিকদের মধ্যে খৃস্টানদের প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন বটে; কিন্তু তার লোকেরা কোথাও মুখ খুলতে পারেনি।
আস-সালিহ খৃস্টান উপদেষ্টাদের পরামর্শে মসুলের গভর্নর সাইফুদ্দীনের নিকটও সাহায্যের আবেদন জানান। হাসান ইবনে সাব্বাহর ফেদায়ীদের শুরু শেখ সান্নান-এর নিকট সংবাদ প্রেরণ করা হয়, দাবি অনুপাতে পারিশ্রমিক দেয়া হবে, আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীকে যেভাবে তোক খুন করে দিন। শেখ সান্নানের আইউবী হত্যার একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। সুলতান আইউবীর একজন দেহরক্ষীকে নেশা খাইয়ে সে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। এবার সে তার এমন ফেদায়ীদের তলব করে, যারা জীবন ও মৃত্যুকে কিছু-ই মনে করে না। তারা নামেমাত্র মানুষ। নিজের জীবন দেয়া ও অন্যের জীবন নেয়া তাদের পক্ষে ডাল-ভাত। তাদের মধ্যে অনেক পলাতক খুনীও রয়েছে। শেখ সান্নান তাদেরকে বলল, পারিশ্রমিক যা চাও, দেব; সুলতান আইউবীকে হত্যা করে আস। নয়জন ফেদায়ী একাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।
আস-সালিহ-এর সমর্থকদের মধ্যে সবচে হিংসুক ও শয়তান প্রকৃতির মানুষ হল গোমস্তগীন। একজন গবর্নরের সমান মর্যাদা তার। লোকটা বাহ্যত সুলতান আইউবীর বিরোধী বটে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার বন্ধু কেউ-ই নয়। আস সালিহকে খুশি করার জন্য তাকে সহযোগিতা প্রদান করে এবং খৃষ্টানদের সনে বন্ধুত্ব এভাবে প্রকাশ করে যে, তার দুর্গে অনেক খৃস্টান সৈন্য বন্দি ছিল, তাদের সকলকে মুক্ত করে দেন। এখনো সে সুলতান আইউবী দ্বারা হাব আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ পেয়ে বাহিনী প্রেরণ করেন এবং নিজেও যুদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
সুলতান আইউবীর জন্য এ এক মহা-বিপদ। অল্প কজন সৈন্য দিয়ে এত বিশাল শত্রুবাহিনীর মোকাবেলা তিনি কীভাবে করবেন! তদুপরি বর্তমানে তাঁর গোয়েন্দারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার ফলে তিনি জানতেই পারছেন না, হাবে দুশমনের ক্যাম্পে কী হচ্ছে। এখনো তিনি এই আত্মপ্রচঞ্চনায় লিপ্ত যে, হাবকেও তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে দখল করে নেবেন। কিন্তু আশার কথা হল, সুলতান আনাড়ি যোদ্ধা নন। তিনি বাহিনীর পেছন ও দুপার্শ্ব রক্ষা করার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তদারককারী দল সামনে এগিয়ে গেছে। সম্মুখের এলাকা টিলাময়, পাথুরে ও উঁচু-নীচু। পথে মাঝারী আকারের একটি নদী।
***
১১৭৫ সালের জানুয়ারী মাস শুরু হয়ে গেছে। শীতের তীব্রতা বেড়ে গেছে আরো। সুলতান আইউবী যুদ্ধের জন্য তাঁর মোট সেনাবাহিনীর চার ভাগের এক ভাগ ময়দানে নিয়ে এসেছেন। অধিকাংশ সৈন্যকে তিনি রিজার্ভ রেখে এসেছেন। তিনি যখন হাবের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন গোয়েন্দারা সংবাদ দেয়, নদীর ওপারে বিশাল-বিস্তৃত এক মাঠে শক্ৰবাহিনী প্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান করছে। সুলতান আইউবীকে এ পথেই নদী পার হতে হবে। শীত মওসুমের কারণে নদীতে পানি কম। এ জায়গাটায় আরো কম। মানুষ ও ঘোড়া পানি ভেঙ্গে অনায়াসে নদীটা পার হতে পারবে। দুশমন এ জায়গাটায়ই তাদের সেনাদের ছড়িয়ে রেখেছে। গোয়েন্দারা সুলতান আইউবীকে জানায়, রাতে শত্রু বাহিনীর কয়েকজন শান্ত্রী জেগে পাহারা দেয় আর দিনে টহল বাহিনী চারদিক ঘুরে বেড়ায়।
