আমরা এ কারণেই নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুর জন্য দুআ করতাম যে, দুনিয়াতেই আমরা জান্নাতের সুখ উপভোগ করব- দুর্গের অধিপতি মদের পেয়ালা মুখে দিতে দিতে বলল- এখন সালাহুদ্দীন আইউবী এসেছেন। আল্লাহ তাকেও জলদি তুলে নেবেন।
না, তাকে আমরা তুলে আনব- এক কমান্ডার বলল- ঋতুটা, একটু পরিবর্তন হোক।
দুর্গের দেয়ালে দন্ডায়মান এক শান্ত্রী তার সঙ্গীকে বলল- এই দেখ, দেখ, আগুন জ্বলছে।
জ্বলতে দাও- সঙ্গী বলল- কোন কাফেলা হবে বোধ হয়। বলতে না বলতে আগুনের তিন-চারটি গোলা উপরে উঠে দুর্গের দিকে ধেয়ে এসে শান্ত্রীদের মাথার উপর দিয়ে অতিক্রম করে দুর্গের ভিতর গিয়ে নিক্ষিপ্ত হয়। পরক্ষণে আরো একটি গোলা ধেয়ে আসে। তারপর আরো কয়েকটি। সব কটি-ই দুর্গের সামান-পত্রের উপর গিয়ে নিক্ষিপ্ত হয় এবং আগুন ধরে যায়। দুর্গে বিপদ ঘন্টা বেজে ওঠে। দুর্গ অধিপতির আসর ভেঙ্গে যায়। সবাই জান্নাতের সুখ ত্যাগ করে দৌড়ে ফটকের দিকে ছুটে আসে। এবার তীরবর্ষণ চলছে তাদের উপর। ফটকের শান্ত্রীরা চীৎকার ও হৈ-হুঁল্লোড় শুরু করে দেয় ফটক পুড়ে যাচ্ছে। সুলতান আইউবীর আক্রমণকারী সৈন্যরা ফটকের উপর দাহ্য পদার্থ ছুঁড়ে মেরে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। শান্ত্রীরা চীৎকার করে দুর্গের সৈন্যদেরকে জাগ্রত করে। দুর্গের ভিতর থেকেও প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়। কিন্তু বাহির থেকে এত তীর আসতে থাকে যে, মাথা উত্তোলন করাও সম্ভব হচ্ছে না। সুলতান আইউবীর মিনজানীকগুলো দুৰ্গটাকে জাহান্নামে পরিণত করে তোলে। দুর্গের কমান্ডার চীৎকার করে করে তার সৈন্যদের মনোবল বাড়াবার চেষ্টা করছে। সৈন্যরা এলোপাতাড়ি তীর ছুঁড়ছে।
অস্ত্রসমর্পন কর- সুলতান আইউবীর দিক থেকে একজন উচ্চকণ্ঠে বলতে শুরু করে- তোমরা অস্ত্রত্যাগ কর। তোমরা কোন দিক থেকে সাহায্য পাবে না। জীবন রক্ষা কর। তোমরা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর হাতে আত্মসমর্পন কর। কাউকে যুদ্ধবন্দি বানানো হবে না। তোমরা সুলতানের আনুগত্যবরণ করে নাও। আমাদের ফৌজে শামিল হয়ে যাও।
রাতভর এই ঘোষণা চলতে থাকে এবং উভয় পক্ষে তীর বিনিময় হতে থাকে। পরদিন ভোরের আলো ফুটলে দুর্গপতি বাইরের দৃশ্য ও দুর্গের ফটকে তার সৈনিকদের লাশ দেখে সাদা পতাকা উড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করে। সুলতান আইউবী এই দুর্গও দখল করে নেন। দুর্গপতি ও তার কমান্ডারগণ অস্ত্রত্যাগ করে। সুলতান দুর্গের অভ্যন্তরে ঢুকে দুর্গপতি ও কমান্ডারদের উদ্দেশ করে শুধু বললেন- আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন। তিনি নির্দেশ প্রদান করেন, সিপাহীদেরসহ এদেরকে দামেস্ক পাঠিয়ে দাও। সুলতান তদেরকে নিজের ফৌজের অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারবেন না। কারণ, তাদের অফাদারী এখনো সন্দেহযুক্ত। এই দুর্গে অস্ত্র ও রসদের বিপুল সংগ্রহ। আছে মদ আর নর্তকী। মদের পাত্রগুলো বাইরে ফেলে দেয়া হল। নর্তকীদেরকে তাদের লোকদের সঙ্গে দামেস্ক পাঠিয়ে দেয়া হল। সুলতান আইউবী হেসের দুর্গকে তার দ্বিতীয় ঘাঁটিতে পরিণত করেন।
সামনে হালবের দুর্গ। এটি হাব শহর থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত। এখানেও হেমসের ন্যায় একই ঘটনা ঘটে। সুলতান আইউবীর হামলা ছিল আকষ্মিক। তিনি এই দুর্গের লোকদেরকেও সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে যান। পর পর দুটি দুর্গ জয় করার পর তার বাহিনীর মনোবল এখন অনেক চাঙ্গা। তারা হাবের দুর্গও জয় করে নেয় এবং সেখানকার সৈনিকদেরকে কমান্ডারদেরসহ দামেস্ক পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু এ পর্যন্ত এসে সুলতানের গোপনীয়তা শেষ হয়ে যায়। অসমর্পনকারী সিপাহীদের কেউ পালিয়ে গিয়ে কিংবা অন্য কেউ হাব গিয়ে সংবাদ জানিয়ে দেয় যে, সুলতান আইউবী হামাত, হেমস ও হাল্ব দুর্গ জয় করে এখন হাব শহরের দিকে অগ্রস হচ্ছেন। কিন্তু এই তথ্য সুলতান জানতেন না। তিনি অগ্রসরতার গতিও কমিয়ে দেন। তার কারণ, যে বাহিনী হামাত, হেস ও হাল্ব দুর্গকে অবরোধ করে রাতের বেলা লড়াই করেছে, তাদের বিশ্রামের প্রয়োজন এবং আগে প্রেরণের জন্য তাদের স্থলে নতুন বাহিনী আবশ্যক। এখন পরিবর্তিত বিন্যাসে সৈন্যদের সম্মুখে অগ্রসর হতে হবে। কেননা, হালব শহরের লড়াই দুর্গ অবরোধ থেকে ভিন্ন। নতুন বিন্যাসে কিছু সময় ব্যয় হয়ে যায়। সুলতান আইউবী অত্যন্ত সতর্ক মানুষ। তিনি জানেন, আসল লড়াই সামনে রয়ে গেছে। আবার খৃস্টান বাহিনীর এসে পড়ার আশংকাও রয়েছে।
***
হালবে সংবাদ পৌঁছে গেছে। খৃস্টান উপদেষ্টাগণ সেখানে উপস্থিত। তারা প্রথমে বিস্ময় প্রকাশ করে যে, সুলতান আইউবী এই শীতের মধ্যে হামলা করলেন! পরে তারা এই ভেবে সন্তোষ প্রকাশ করে যে, সুলতানের ফৌজ মরুযুদ্ধে অভ্যস্ত। তারা পার্বত্য এলাকায় লড়াই করে জিততে পারবে না। আবার তাদের এই অনুভূতিও আছে যে, হাবের সৈন্যও এ অঞ্চলে লড়তে পারবে না। তারা দুটি পন্থা নিয়ে ভাবে। এক. সুলতান আইউবীকে তাদের-ই মনঃপুত স্থানে যুদ্ধে লিপ্ত করাতে হবে। দুই. এখানে খৃস্টানদের সেই বাহিনীটিকে নিয়ে আসতে হবে, যারা ইউরোপ থেকে এসেছে। এদের অধিকাংশ সৈন্য-ই রেমন্ডের বাহিনীতে কর্মরত। সিদ্ধান্ত মোতাবেক দ্রুতগামী দূতের মাধ্যমে রেমন্ডকে সংবাদ পৌঁছানো হল, সুলতান আইউবী হাবের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তাকে পিছন দিক থেকে ঘিরে ফেলা হোক।
