পরদিন অতিবাহিত হয়েছে। রাত গম্ভীর হয়ে গেছে। অগ্রগামী বাহিনীর হামাত পৌঁছাতে আর দু-তিন মাইল পথ বাকি।
১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর। রাতের শেষ প্রহর। হামাত দুর্গের ফটকে দন্ডায়মান শান্ত্রী আবছা আলো-আঁধারীতে ছায়ার মত এমন কিছু দেখতে পায়, যেন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও ঘোড়া। হয়ত কোন কাফেলা এগিয়ে আসছে।
ভোর হয়েছে। দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে। অন্ধকার পুরোপুরি কেটে গেছে। শান্ত্রীরা এবার দেখতে পেল, ওরা সৈন্য। কিন্তু তাদের দুর্গের ডানে-বাঁয়ে যে ফৌজ রয়েছে, তা এখনো তারা টের পায়নি। ডংকা বাজিয়ে দেয়া হল। এক কমান্ডার দৌড়ে উপরে উঠে যায়। ফৌজ দেখে দৌড়ে গিয়ে সে দুর্গপতি জুরদিককে সংবাদ জানায়।
ভয় পেওনা- জুরদিক কমান্ডারকের বললেন- এরা আক্রমণকারী ফৌজ নয়। খৃস্টানরা আমাকে খুন করতে পারেনি। তারা অন্য কোন ষড়যন্ত্র করে থাকবে হয়ত। তারা হয়ত আস-সালিহ-এর নিকট থেকে এই অনুমোদন নিয়েছে যে, আমার থেকে দুর্গ ছিনিয়ে নিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে দেবে। তোমরা বাইরে গিয়ে দেখ বাহিনীটা কার এবং তারা কী চায়।
কমান্ডার ঘোড়ায় চড়ে বাইরে বেরিয়ে যায় এবং সুলতান আইউবীর অগ্রগামী বাহিনীর দিকে এগিয়ে যায়। পতাকা দেখেই চিনে ফেলে, এ তো আইউবীর বাহিনী! খানিক দূরে থাকতেই কমান্ডার থেমে যায়। আইউবীর অগ্রগামী বাহিনীর কমান্ডার তার নিকট এগিয়ে যায়। দুজন-ই একে অপরকে চিনে ফেলে। তারা নুরুদ্দীন জঙ্গীর বাহিনীতে একসঙ্গে কাজ করেছে।
আহ! এমন একটা সময়ও প্রত্যক্ষ করতে হল যে, আমাদের দুজনকে পরস্পর লড়াই করতে হবে- আইউবীর অগ্রগামী বাহিনীর কমান্ডার দুর্গের কমান্ডারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল- জঙ্গী যখন জীবিত ছিলেন, আমরা তখন বন্ধু ছিলাম। তিনি মারা গেছেন, তো আমরা পরস্পর দুশমন হয়ে গেলাম।
তোমরা কেন এসেছ? দুর্গের কমান্ডার জিজ্ঞেস করে।
তোমরা দুর্গকে রক্ষা করতে পারবে না- অগ্রগামী বাহিনীর কমান্ডার বললেন- তোমার প্রতি আমার পরামর্শ, দুর্গের অধিপতিকে বল, যেন তিনি দুটা আমাদের হাতে তুলে দেন এবং রক্তক্ষয় হতে না দেন। আমরা তোমাদেরকে বেশী সময় দিতে পারব না। অল্পক্ষণের মধ্যেই দুর্গ অবরুদ্ধ হয়ে যাবে। আমরা তোমাদের সাহায্য-সহযোগিতার সব পথ বন্ধ করে এসেছি। তোমরা অন্ত্রত্যাগ কর।
দুর্গের কমান্ডার কোন জবাব না দিয়েই ফিরে যায়। জুরদিককে জানায়, সালাহুদ্দীন আইউবী হামলা করেছেন। তিনি আমাদেরকে অস্ত্রত্যাগ করতে বলছেন। এই বাহিনী তারই। জুরদিক চীৎকার করে বলে উঠলেন, দুর্গ থেকে পতাকা সরিয়ে ফেল। সাদা পতাকা উড়িয়ে দাও। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এসেছেন।
জুরদিক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। ঘোড়ায় চড়ে দুর্গ থেকে অগ্রগামী বাহিনীর কমান্ডারের নিকট চলে যান। সুলতান আইউবী অনেক পিছনে অবস্থান করছেন। জুরদিক একজন রাহবার ও তার দেহরক্ষীদের নিয়ে সুলতান আইউবীর হেডকোয়ার্টারের দিকে রওনা হয়ে যান।
***
সুলতান আইউবী জুরদিককে বুকে জড়িয়ে ধরেন। জুরদিক সুলতানের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে আবেগময় কিছু কথা বলেন এবং সৈন্যসহ দুর্গকে সুলতান আইউবীর হাতে তুলে দেন। সুলতান আইউবী তার সহকর্মীদের নিয়ে দুর্গে প্রবেশ করেন এবং সাদা পতাকার স্থলে নিজের ঝান্ডা উড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। জুরদিক দুর্গে অবস্থানরত তার বড়-ছোট সব কমান্ডারকে সুলতান আইউবীর সম্মুখে উপস্থিত করে বললেন- তোমাদেরকে পরাজিত করা হয়নি। তোমরা যার যার ইউনিটের সৈন্যদেরকেও বলে দাও, তারা যেন নিজেদেরকে পরাজিত মনে না করে। আমরা সবাই মুসলমান। এখন আমরা খৃস্টান ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে লড়াই করব।
সম্মুখে হেমস দুর্গ। সুলতান আইউবী রওনা হওয়ার জন্য এমন একটা সময় নির্ধারণ করেন যে, হেমস গিয়ে পৌঁছুতে রাত হয়ে যাবে। তিনি এই অগ্রগামী বাহিনীটিকেই সম্মুখে রওনা করিয়ে দেন। এবার তিনি সেনাবিন্যাসে কিছু রদবদল করেন। কারণ, হেমস দুর্গ যুদ্ধ ব্যতীত জয় হবে, এমন আশা তার নেই। খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য একটি দলকে তিনি আগেই রওনা করিয়ে দিয়েছিলেন। ফিরে এসে তারা সুলতানকে দুর্গের অবস্থান ও আশ-পাশের পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে। যেসব দিক থেকে শত্রুপক্ষের সাহায্য আসার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব দিকেও তিনি বাহিনী প্রেরণ করে রেখেছেন। নিজের রসদ তিনি হামাত দুর্গে জড়ো করে রাখেন এবং রসদ সরবরাহের পথকে টহল বাহিনী ও কমান্ডারদের দ্বারা নিরাপদ করে রাখেন। তাদের সঙ্গে হামাতের একটি ইউনিটও রয়েছে। সুলতান আইউবীর প্রচেষ্টা ছিল, এই অভিযানের সংবাদ যাতে হাল্ব পর্যন্ত না পৌঁছে। তাহলে তিনি দুশমনকে তাদের অজ্ঞাতেই কাবু করে ফেলতে পারবেন। অভিযানের ব্যবস্থাপনাটা তিনি এভাবেই করে নিয়েছেন। তিনি হাবের পথে নিজের লোক ছড়িয়ে রেখেছেন, যাদের প্রতি নির্দেশ হল, সৈনিক বা সাধারণ কাউকে পালাতে দেখলে আক্রমণ করে হলেও তাকে প্রতিহত করবে।
রাত গম্ভীর হয়ে গেছে। হেস দুর্গের অধিপতি ও তার কমান্ডাগণ প্রশস্ত একটি কক্ষে সুরাপানে ব্যস্ত। সঙ্গে আছে দুজন নর্তকী। কক্ষে বাদ্য-বাজনা ও নাচ-গান চলছে। সাধারণ সৈনিকরা অবচেতন মনে নিদ্রা যাচ্ছে। প্রহরারত সৈনিকরাও শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আড়ালে-আবডালে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। কনকনে শীত। কমান্ডার সবাইকে জানিয়ে রেখেছে, শীতের মওসুমে যুদ্ধের কোন আশংকা নেই।
