এক ঐতিহাসিকের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায়, এই ভাষণের মধ্যখানে এক পর্যায়ে সালাহুদ্দীন আইউবীর কণ্ঠ থেমে যায়। তিনি কিছুক্ষণ মাথা ঝুঁকিয়ে চুপচাপ বসে থাকেন। তাঁর দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে শুরু করে। নীরব-নিস্তব্ধ গোটা সভাকক্ষ। কারো মুখে রা নেই।
খানিক পর সুলতান আইউবী মাথা তুলে দুহাত উত্তোলন করে আকাশের দিকে তাকিয়ে করুণ সুরে দুআ করতে শুরু করেন
আমার মহান আল্লাহ! আমি তোমার খাতিরে, তোমার রাসূল ও তোমার দ্বীনের খাতিরে আমার ভাইদের বিরুদ্ধে তরবারী উত্তোলন করছি। এটা যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তাহলে তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। হে আমার আল্লাহ! আমাকে তোমার দিক-নির্দেশনা প্রয়োজন। আমি পাপী, আমি গুনাহগার। তুমি আমাকে পথ দেখাও।
সুলতান আবারো মাথানত করে ফেললেন। নিজের মাথায় নতুন কোন বুদ্ধি আসল নাকি আল্লাহর পক্ষ থেকে তার মনে জাগল জানিনা, তিনি উচ্চকণ্ঠে বললেন- আমাকে প্রথম কেবলা বাইতুল মোকাদ্দাস মুক্ত করতে হবে। বাইতুল মোকাদ্দাস তোমাদেরকে ডাকছে। আমার তরবারীর নীচে যদি আমার পিতাও আসেন, আমি তাকেও হত্যা করব। আমার সন্তানও যদি আমার মিশনের প্রতিবন্ধক হয়, তাকেও আমি খুন করে ফেলব।
সুলতান আইউবীর মুখমন্ডল জ্বল জ্বল করে ওঠে। তার আবেগ দমে গেছে। এখন তিনি সেই সালাহুদ্দীন, যিনি শুধু বাস্তবভিত্তিক সংক্ষিপ্ত কথা বলে থাকেন। তিনি কমান্ডারদের বললেন- দুদিন পর রাতে রওনা হতে হবে। তিনি পরিকল্পনা অনুসারে বাহিনীকে যেভাবে বিভক্ত করেছেন, তা সবাইকে জানিয়ে দেন এবং প্রতিটি গ্রুপের কমান্ডারদেরকে রওনা হওয়ার সময় বলে দেন। অগ্রগামী ইউনিটের কমান্ডারদেরকে জরুরী দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন। কমান্ডো বাহিনীকে উপদেশ প্রদান করেন। পার্শ্ব বাহিনীগুলোর কমান্ডারদেরকে রওনা হওয়ার সময়, ধরন ও পথের নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি সকলকে জানিয়ে দেন, তোমাদের হেডকোয়ার্টার ঘোরাফেরা করতে থাকবে। তিনি আগেই মিশরের পথে টহল বাহিনী পাঠিয়ে দেন এবং পথচারী ও যাযাবরের বেশে সেইসব এলাকায় অসংখ্য গুপ্তচর পাঠিয়ে দেন, যে পথে রেমন্ডের বাহিনীর আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
রসদের ব্যাপারে সুলতান আইউবীর কোন পেরেশানী নেই। অন্তত এক বছর মিশর থেকে রসদ ও রিজার্ভ ফোর্স তলব করার প্রয়োজন হবে না। বিপুল অস্ত্র এবং পণ্ড তিনি দামেস্কে মজুদ করে রেখেছেন। তিনি মিশরের রাস্তার আশ-পাশে এই নির্দেশনাসহ অশ্বারোহী কমান্ডো প্রেরণ করে রেখেছেন যে, রেমন্ডের বাহিনী যদি এগিয়ে আসে, তাদের উপর গেরিলা হামলা চালাবে এবং আবশ্যক মনে করলে তৎক্ষণাৎ সংবাদ পাঠাবে। আমরা খৃস্টানদেরকে ঘিরে ফেলার ব্যবস্থা করব।
***
১১৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ৭ তারিখ রাতে অগ্রগামী বাহিনী দামেস্ক থেকে রওনা হয়। সে রাতে শীতের প্রকোপ ছিল খুব বেশী। তীব্র শীত গায়ে কাটার মত বিদ্ধ হচ্ছিল। তবে সুলতান আইউবীর সৈন্য ও ঘোড়া এই শীত সহ্য করতে অভ্যস্ত। অগ্রগামী বাহিনীর কমান্ডারকে বলে দেয়া হল, তত্ত্বাবধানকারী বাহিনী আগেই রওনা হয়ে গেছে। সে বাহিনীর সৈন্যরা সামরিক পোশাকে নয় গেছে মুসাফিরের বেশে। সুলতান আইউবী তাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছেন, যেন দ্রুতগামী দূত পিছনে এসে অগ্রগামী বাহিনীর কমান্ডারকে সম্মুখের খবরাখবর পৌঁছাতে থাকে। অগ্রগামী বাহিনী যাবে হামাত পর্যন্ত। কমান্ডারকে সুলতান আইউবী বলে দিয়েছেন, হামাতের দুর্গ যুদ্ধ ছাড়া জয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রতারণা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। তিনি যেন দুর্গ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেমে যান এবং দুর্গওয়ালাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। জুরদিক যদি সন্ধি করতে চায়, তা হলে তাকে দুর্গের বাইরে ডেকে আনবে এবং সুলতানের এসে পৌঁছা পর্যন্ত কোন সমঝোতায় উপনীত না হয়।
শক্ত দেয়াল ভাঙ্গতে সক্ষম এমন অভিজ্ঞ একদল লোক সুলতান আইউবী আগেই পাঠিয়ে দিয়েছেন। অগ্রগামী বাহিনীর রওনা হওয়ার তিন-চার ঘন্টা পর আরো দুটি ইউনিটকে এমনভাবে রওনা করিয়েছেন যে, তাদের এক ইউনিট অগ্রগামী বাহিনীর ডানে এবং অপর ইউনিট বাঁয়ে অবস্থান নিয়ে চলরে। তাদের জন্য নির্দেশনা ছিল, অগ্রগামী বাহিনী যদি হামাত দুর্গ থেকে সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়, তাহলে তারা দুদিক থেকে এগিয়ে গিয়ে দুর্গ অবরোধ করে ফেলবে এবং দুর্গের উপর এমনভাবে তীর বর্ষণ করবে, যেন দেয়াল ভাঙ্গার দলটি দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।
সুলতান আইউবী এই দুই বাহিনীর মাঝে অগ্রসর হচ্ছেন। অগ্রগামী বাহিনী ও দুই পার্শ্ব বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা সুলতান আইউবীর মোট বাহিনীর চারভাগের একভাগ। অন্য সকল সৈন্যকে তিনি পিছনে রেখে এসেছেন। তিনি যত কম সংখ্যক সৈন্য দিয়ে সম্ভব দুশমনকে ঘায়েল করতে চান। সেই পরিকল্পনা তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছেন। শত্রুবাহিনীর রসদের প্রতি নজর রাখার জন্য তিনি কমান্ডো ছড়িয়ে রেখেছেন। হামাত থেকে অনেক সম্মুখেও এরূপ বেশ কটি ছোট ছোট দল পাঠিয়ে দিয়েছেন, যাতে হামাত থেকে কোন দূত হাব যেতে না পারে এবং কোন দিক থেকে শক্রর সাহায্যে সৈন্য এসে গেলে কমান্ডো হামলা চালিয়ে। তাদেরকে অস্থির করে রাখে এবং তাদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করে।
