পরদিন জুরদিক খলীল, তার সঙ্গী ও হুমায়রাকে বিদায় করে দেন।
***
খৃষ্টান ইন্টেলিজেন্স কমান্ডার উইন্ডসরের হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে একটি আকস্মিক ঘটনা। তিনি সুলতান আইউবীর দুই গোয়েন্দার সামনে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন, যার ফলে তারা বাধ্য হয়েই তাকে খুন করে। কিন্তু কাজটি ছিল অবশ্যই দুঃসাহসিক। উইন্ডসর হত্যাকাণ্ডে সুলতান আইউবীর একটি উপকার এই হয়েছিল যে, তাঁর শত্রুপক্ষের গোয়েন্দা বিভাগ- যা পূর্ব থেকেই দুর্বল ছিল- সংগঠিত হতে পারল না। অপরদিকে সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত ও বিচক্ষণ। তার গোয়েন্দারা কেবল গোয়েন্দাই নয় যে ধরা পড়ে গেলে কিছুই করতে পারবে না। তিনি তার গোয়েন্দাদেরকে কঠিন থেকে কঠিনতর কমান্ডো প্রশিক্ষণ দিয়ে রেখেছেন, যাতে ধরা পড়ে গেলেও প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করে বেরিয়ে আসতে পারবে এবং কাউকে হত্যার প্রয়োজন হলে হত্যা করবে। তাদের দেহ-মন এতই পাষাণ যে, নির্যাতন যতো কঠিনই হোক, তারা সহ্য করে নেবে। তীব্র থেকে তীব্রতর ক্ষুধা তৃষ্ণা ও চরম ক্লান্তি তাদের কাছে কোন ব্যাপারই নয়।
খলীল ও তার সহকর্মীদের মধ্যেও এসব গুণাবলী বিদ্যমান। তারা কেবলমাত্র গুরুত্বপূর্ণ খৃস্টান অফিসারকে হত্যা করেই দুশমনকে বোকা বানায়নি, বরং জুরদিকের ন্যায় কঠিন মনের দুর্গপতিকে কথার মাধ্যমে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে, তাকে সুলতান আইউবীর পক্ষে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।
খলীল যখন সুলতান আইউবীকে জুরদিকের বার্তা শোনায়, তখন সুলতান এমন এক স্বস্তি অনুভব করেন, যেন উত্তপ্ত মরুভূমিতে হঠাৎ শীতল বায়ুর ঝাঁপটা এসে গায়ে লাগে। সুলতনি চারদিকে শুধু দুশমনই দেখতে পেতেন। আপনও দুশমন, পরও দুশমন। জুরদিকের পয়গাম তাকে স্বস্তি দিল বটে; কিন্তু তিনি আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত হলেন না। বিষয়টা প্রতারণাও হতে পারে বিধায় তিনি আক্রমণ পরিকল্পনায় কোন রদবদল করলেন না। শুধু এতটুকু চিন্তা মাথায় রাখলেন যে, হামাত থেকে সাহায্য পেতে পারি।
দুশমনের আস্তানা হাব থেকে যেসব সংবাদ আসছে, তাতে নতুন কোন তথ্য নেই। ওখানে কোন পরিবর্তন সাধিত হয়নি। ওখানকার উপদেষ্টা ও কমান্ডারদের দৃঢ় বিশ্বাস, শীতের মওসুমে যুদ্ধের সম্ভাবনা নেই। একটি সংবাদই পাওয়া গেছে যে, খৃস্টানরা বাহ্যত ওখানকার সকলের বন্ধুর রূপ ধারণ করেছে। ঠিক; কিন্তু আমীরদের একজনের বিরুদ্ধে অপরজনকে উত্তেজিত করে তুলছে। আস-সালিহর আশপাশের লোকেরা একে অপরের দুশমন, সে তো সুলতান। আইউবীর জানা বিষয়। তারা সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে শুধু এজন্যে একত্রিত হয়েছে যে, সুলতান তাদের সকলের প্রতিপক্ষ। আর এই শক্রতার কারণ হল, সুলতান আইউবী তাদেরকে বিলাসিতা ও স্বাধীন জীবন-যাপন করার অনুমতি দেন না। সুলতান আইউবীর এই মিশনটাও তাদের ভাল লাগে না যে, সালতানাতে ইসলামিয়ার সম্প্রসারণ ও সুরক্ষাকে ঈমানী দায়িত্ব ভাবতে হবে। তিনি সেইসব রাষ্ট্রনায়কদের মত নন, যারা শান্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা ও ভোগ বিলাসিতার জন্য শত্রুকে বন্ধুরূপে বরণ করে নেয়। যুদ্ধের যত প্রকার বিদ্যা ও কলাকৌশল রপ্ত করা আবশ্যক, তার সবই সুলতান আইউবী অর্জন করেছেন। তার বাহিনী হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যেও লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে। এখন রাতের প্রশিক্ষণে কোন সৈনিক অসুস্থ হচ্ছে না।
১১৭৪ সালের ডিসেম্বর মাস। সুলতান আইউবী তার সেনাকমান্ডারদের সর্বশেষ বৈঠক তলব করেন। কেন্দ্রীয় কমান্ডের সকল অফিসার ও সকল ইউনিট কমান্ডারগণের বৈঠকে উপস্থিত হলে তিনি তাদেরকে সর্বপ্রথম নির্দেশ এই প্রদান করেন যে, এ মুহূর্ত থেকে বাহিনীর গতিবিধি সংক্রান্ত কোন তথ্য কোনক্রমেই বাইরের কাউকে বলবে না। এমনকি নিজ স্ত্রী-সন্তানদেরকেও নয়। ফৌজ অভিযানে রওনা হওয়ার সময় এসে গেছে। কিন্তু বুঝতে হবে, নিত্যদিনের ন্যায় ফৌজ মহড়া ও প্রশিক্ষণে যাচ্ছে।
এসব দিক-নির্দেশনার পর সুলতান বললেন- আমাদের বিলাস-পূজারী ও ঈমান-বিক্রয়কারী ভাইয়েরা ইসলামের ইতিহাসকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে যে, আজ তোমাদের উপর তোমাদেরই আপনজনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কি কখনো কল্পনা করেছে, আমি আমার পীর ও মুরশিদ নুরুদ্দীন জঙ্গীর পুত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করব? কিন্তু পরিস্থিতি এমনই রূপ ধারণ করেছে যে, জঙ্গীর এই ছেলেটির মা আমাকে অভিসম্পাৎ করছে, আমি কেন তার মুরতাদ পুত্রকে হত্যা করছি না। আমার বন্ধুগণ! তোমরা যে বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে যাচ্ছ, তাতে তোমাদের চাচাতো ভাই আছে, মামাতো ভাই আছে, খালাতো ভাই আছে। আমি এমন দুই আপন ভাই সম্পর্কেও জানি, যাদের একজন আমার বাহিনীতে আর অপরজন দুশনের বাহিনীতে। তোমরা যদি রক্ত ও আত্মীয়তা সম্পর্ককে হৃদয়ে স্থান দাও, তাহলে ইসলামের সঙ্গে তোমাদের যে সম্পর্ক রয়েছে, তা ছিন্ন হয়ে যাবে। রওনা হওয়ার আগে এখানেই তোমাদেরকে ওয়াদা করতে হবে, প্রতিপক্ষ কে তা তোমরা দেখবে না। তোমাদের দৃষ্টি থাকবে নিজেদের পতাকার উপর। তোমরা হৃদয়ে এই সত্যটাকে বসিয়ে নাও যে, তোমাদের সম্মুখের প্রতিপক্ষ লোকটি তোমাদের মতো কালেমা-গো মুসলমান ঠিক; কিন্তু তার পিছনের লোকগুলো খৃস্টান। আমি সেই ভাইকে ভাই মনে করি না, যে নিজ ধর্মের শত্রুকে বন্ধু মনে করে।
