ধৃতদেরকে জুরদিকের নিকট নিয়ে যাওয়া হয়। এবার আসল চেহারা খুলে যায়।
মুখোশধারীরা তাদের মুখোশ খুলে ফেলে স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়, তারা সুলতান আইউবীর গুপ্তচর। তাদের একজন হল খলীল। অপরজন তার সঙ্গী।
পলায়নরত অবস্থায় যে দুঅশ্বরোহীকে ধরা হল, তারাও মুসলমান। কিন্তু এখানে এসেছিল তারা জুরদিককে হত্যা করতে। খৃস্টানদের নিকট ঈমান বিক্রিকরা বিভ্রান্ত মুসলমান তারা। তাদের যে লোকটির বাহু কেটে গেছে, তাকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে কিছু দূরে ফেলে দেয়া হল। অপরজনকে বলা হল, তুমি যদি জীবিত ফিরে যেতে চাও, তাহলে বল তোমাদেরকে কে পাঠিয়েছে? অন্যথায় তোমাকেও সঙ্গীর পরিণতি বরণ করতে হবে।
অশ্বরোহী এবার মুখ খুলল- পাঠিয়েছে রেমন্ডের সামরিক প্রতিনিধি। তিনি হাবের ভোজসভায় মুসলিম আমীরদের উপস্থিতিতে বলেছিলেন, অমুক দিন অমুক সময় জুরদিক পার্বত্য এলাকা অতিক্রম করবে। তিনি আমাদেরকে বিপুল অর্থ প্রদান করেছেন। আমাদেরকে বলে দেয়া হয়েছে, তোমরা পাহাড়ের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকবে আর জুরদিককে সময়মত তীরের নিশানা বানিয়ে ফিরে আসবে।
আমরা দুজন নির্দিষ্ট সময়ে এই এলাকায় পৌঁছি এবং পথের দিকে দৃষ্টি রেখে একটি উঁচু পাথরের উপর লুকিয়ে বসে থাকি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আপনার কাফেলা এসে পড়ে। আমরা আপনাকে লক্ষ্য করে তীর হুঁড়ি। কিন্তু তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পুনরায় তীর ছুঁড়লে সেটিও লক্ষভ্রষ্ট হয়ে ঘোড়র গায়ে বিদ্ধ হয়।
অক্ষত তীরান্দাজকে নিয়ে জুরদিক হামাতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। অপরজন কর্তিত বাহুর রক্তক্ষরণের ফলে প্রাণ হারায়।
পথে খলীল হুমায়রার ইতিবৃত্ত কাহিনী জুরদিককে শোনায়। উইন্ডসরকে সে কিভাবে হত্যা করেছিল, তারও বিবরণ দেয়। জুরদিক বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, এমন ঝুঁকিপূর্ণ একটি ঘটনা ঘটিয়ে তোমর হাল্ব থেকে কিভাবে বেরিয়ে এলে!
খলীল জুরদিককে আরো জানায়- হাবে আমাদের একজন কমান্ডার রয়েছেন। কিন্তু আমি তার নাম ও গঠন-আকৃতি আপনাকে বলব না। তিনি কাপড় ইত্যাদি বস্তু পেঁচিয়ে নবজাতক শিশুর সমান একটি প্রতিকৃতি তৈরি করে তার উপর কাফন পরিয়ে দেন। আমাদের চার-পাঁচজন গোয়েন্দা আশপাশে সংবাদ ছড়িয়ে দেয় যে, এখানে অমুকের একটি সন্তান মারা গেছে। কমান্ডার কাফন পেঁচানো প্রতিকৃতিটি দুহাতে তুলে কবরস্তানের দিকে হাঁটা দেন। আমি, আমার সঙ্গী, হুমায়রা (পুরুষের পোশাকে) এবং আরো চার-পাঁচ ব্যক্তি শবযাত্রার ন্যায় তার পেছন পেছন এগিয়ে আসি। কবরস্তানটি শহরের বাইরে। ওখানে তিনটি ঘোড়া দাঁড়িয়ে ছিল। হাবের ফৌজে কর্মরত আমাদের এক গোয়েন্দা ঘোড়াগুলো সংগ্রহ করে ওখানে নিয়ে রেখেছিল। জানাযা হাবের ডিউটিরত সেনা সদস্যদের সম্মুখ দিয়েই কবরস্তানে গিয়ে পৌঁছে। ওখানে একটি কবর খনন করলাম। লাশ দাফন করে আমি, আমার সঙ্গী ও হুমায়রা ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে আসি।
জুরদিকের কাফেলা যখন দুর্গে গিয়ে পৌঁছে, তখন রাত হয়ে গেছে। জুরদিক খলীল ও তার সঙ্গীদেরকে সম্মানিত মেহমানের ন্যায় থাকতে দেন। তিনি খলীলকে বললেন- এবার আমাকে তোমার বন্ধু মনে করতে পার। বল, সালাহুদ্দীন আইউবী কী করছেন? তোমার অবশ্যই জানা আছে যে, আইউবী আস-সালিহকে ধাওয়া করে ধরলেন না কেন। বল, কারণটা কী?
আমি সুলতান আইউবীর পরিকল্পনা যদিও জানি, কিন্তু আপনাকে বলব না খলীল বলল- আর হাল্ব থেকে আমি কী কী তথ্য নিয়ে এসেছি, তাও আপনাকে জানাব না।
সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল- জুরদিক বললেন- পরে এই শত্রুতা আদর্শিক দ্বন্দ্বের রূপ ধারণ করে। তার কারণ যা ই থাকুক, আমি ভুলের উপর ছিলাম। দুশমন আমাকে ভুলটা ধরিয়ে দিয়েছে। আমি খৃস্টানদের মতলব বুঝে ফেলেছি। তারা একদিকে আমার ফৌজ ও আমার দুকে ব্যবহার করতে চায়, অন্যদিকে আমাকে হত্যা করতে চেষ্টা করেছে। আমার মরহুম নুরুদ্দীন জঙ্গী ও সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কথা মনে পড়ে। তাদের মতে এই যুদ্ধ চাঁদ-তারা ও ক্রুশের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ কোন মুসলিম রাজার সঙ্গে কোন খৃস্টান রাজার যুদ্ধ নয়। সুলতান আইউবী বলেছিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবীতে একজন মুসলমানও জীবিত থাকবে, খৃস্টানরা তাকে খতম করার চেষ্টায় রত থাকবে। অমুসলিম যে ধর্মেরই হোক মুসলমানের আপন হতে পারে না। অমুসলিম মুসলমানের প্রতি বন্ধুত্বের নামে যে হাত প্রসারিত করে, তাতে শক্রতার বিষ মেশানো থাকে। নুরুদ্দীন জঙ্গীও এই নীতিরই অনুসারী ছিলেন। তিনি সবসময় বলতেন, যেদিন মুসলমান কোন অমুসলিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়বে, সেদিন থেকে ইসলামের পতন শুরু হয়ে যাবে।
তবে কি আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে যোগ দেবেন?- খলীল জিজ্ঞাসা করল- আমি একজন সামান্য মানুষ, সাধারণ একজন সৈনিক। আমার এই দুঃসাহস না দেখানেই উচিত যে, একজন দুর্গপতিকে জিজ্ঞেস করব, আপনি কী ভাবছেন এবং আপনার উদ্দেশ্য কী? কিন্তু একজন মুসলমান হিসেবে আমার অধিকার আছে, যে মুসলমান পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে, তাকে এটুকু বলব, তুমি গোমরাহ হয়ে গেছ।
হ্যাঁ- জুরদিক বললেন- তোমার এই অধিকার রয়েছে। আমি তোমাকে একটি পয়গাম শোনাতে চাই। পয়গামটি তুমি সুলতান আইউবীর কানে পৌঁছিয়ে দিও। আমি লিখিত পয়গাম পাঠাতে চাই না। আপাতত দূত প্রেরণ করাও সমীচিন মনে করছি না। তুমি আইউবীকে বলবে, তিনি যেন হামাতের দুর্গকে তারই দুর্গ মনে করেন। কিন্তু সাবধান! কোন বিশ্বস্ত সালারকেও যেন বুঝতে না দেন যে, আমি এই প্রস্তাব পেশ করেছি। বিষয়টা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাকে বলবে, খৃষ্টানরা বন্ধুত্বের আড়ালে আমাদের ভূখণ্ডে বেঁকে বসেছে। তোমরা সম্ভবত শীতের পর হামলা করবে। কিন্তু সাবধান! এদিক থেকে তোমাদের উপর আগেই হামলা হয়ে যায় কিনা। তোমরা যদি অগ্রসর হও, তাহলে হামাতের পথে আসবে। আমি ইনশাল্লাহ তোমাদের পুরাতন বন্ধুত্বের হক আদায় করব।
