আচ্ছা! উইন্ডসর ও খৃস্টান মেয়েটাকে তাহলে তোমরা খুন করেছ! হঠাৎ মকে ওঠে জিজ্ঞেস করেন জুরদিক।
হা- এক মুখোশধারী জবাব দেয়- আমরাই তাদেরকে হত্যা করেছি।
আর তোমরা আমার উপর এই জন্য তীর ছুঁড়েছ যে, আমি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দুশমন। জুরদিক বললেন।
দেখুন, আমরা ভালভাবেই জানি, আপনার নাম জুরদিক এবং আপনি হামাত দুর্গের অধিপতি- এক মুখোশধারী বলল- আমরা এ-ও জানি যে, আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীর দুশমন। কিন্তু আপনাকে হত্যা করার প্রয়োজন আমাদের নেই। আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। অতি শীঘ্র আমরা তোমাদেরকে নিরস্ত্র করব। সকল সৈন্যসহ তোমাদেরকে কয়েদী বানাব। সুলতান আইউবী হাসান ইবনে সাব্বাহ কিংবা শেখ সান্নান নন। তিনি ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ করেন- চোরের মতো কাউকে খুন করান না। উইন্ডসর ও খৃস্টান মেয়েটির হত্যাকাণ্ড আমাদের ব্যক্তিগত কাজ। কাজটা আমরা বাধ্য হয়েই করেছি। পরিস্থিতি আমাদেরকে বাধ্য করেছিল। এতে সুলতান আইউবীর কোন হাত নেই।
জুরদিকের ঘোড়াটা মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। তারা সেটির দিকে তাকায়। দুটি তীর ঘোড়াটার কপালে আর দুটি পাজরে বিদ্ধ হয়েছে। বলল- আপনি সুদক্ষ দ্রুতগামী ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসুন। আমাদের একজনকে তীর-ধনুক দিন। আপনি ঘোড়া হাঁকান। অশ্ব চালনার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করুন। আমরা যে কোন একজন ঘোড়ার পিঠে বসে তীর ছুঁড়ব। যদি প্রথম তীরটি লক্ষভ্রষ্ট হয়, তাহলে আমাদের গর্দান উড়িয়ে দিন। যে চারটি তীর আপনার বদলে ঘোড়ার গায়ে বিদ্ধ হয়েছে, এগুলো আমরা হুঁড়িনি। আমাদের নিশানা কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না।
তোমাকে তো সাধারণ সৈনিক মনে হয় না!- জুরদিক বললেন- তুমি কি সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজের লোক?
আর আপনি কে? মুখোশধারী জিজ্ঞেস করে- আপনি কি সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজের লোক নন? আপনি কি ইসলামের সৈনিক নন? আপনি কি আপনার পরিচয় ভুলে গেছেন? কেল্লাদারির পদমর্যাদা আপনার মস্তিষ্ক নষ্ট করে দিয়েছে। আপনি আরো উচ্চ মর্যাদা লাভ করার জন্য কাফেরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছেন।
আপনি ভেঙ্গে যাওয়া সেই বৃক্ষ ডালটির ন্যায়, যার ভাগ্যে শুকিয়ে পরে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে। অপর মুখোশধারী বলল আপনি এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নন যে, সালাহুদ্দীন আইউবীর আপনাকে হত্যা করার গরজ পড়েছে। নিজের কৃতকর্মের সাজা ভোগ করার জন্য আপনার বেঁচে থাকা প্রয়োজন। আপনি খুন হবেন তো খৃস্টানদের হাতে হবেন।
আপনি হালবে মদপান করতে আর আয়েশ করতে গিয়েছিলেন- প্রথম মুখোশধারী বলল- আপনি এই মেয়েটির নাচ উপভোগ করতে গিয়েছিলেন।
আমি মুসলমান মেয়ে- মেয়েটি বলে ওঠল- আমাকে খৃষ্টানদের আসরে আসরে নাচানো হয়েছে। খৃষ্টানরা আমার দেহ নিয়ে খেলা করেছে। আপনি কিছুক্ষণের জন্য কল্পনা করুন, আমি আপনার কন্যা। আমি ওখানে মুসলিম মেয়েদেরকে উলঙ্গ নাচতে দেখেছি। আপনারা এতো আত্মমর্যাদাহীন হয়ে গেছেন যে, আপন বোন-কন্যাদের শ্লীলতাহানিও আপনাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ জাগাতে পারে না। আমি খৃস্টানদের মাঝে সাত-আট বছর কাটিয়ে এসেছি। আমি সেই খৃস্টান সম্রাট-শাসকদের সঙ্গেও সময় অতিবাহিত করেছি, যাদেরকে আপনারা বন্ধু বানিয়ে আপনাদের মাতৃভূমিতে ডেকে এনেছেন। আমি তাদের কথাবার্তা শুনেছি। তারা বন্ধুত্বের ফাঁদ পেতে মুসলমানদের আপসে যুদ্ধ করাচ্ছে।
জুরদিক নীরব-নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছেন। অপলক নেত্রে এক নাগাড়ে তাকিয়ে আছেন মেয়েটির প্রতি। তার রক্ষীরা হতভম্ব যে, এত প্রতাপশালী ও দুঃসাহসী দুর্গ অধিপতি কীভাবে এসব বরদাশত করছেন।
গভীর ভাবনায় হারিয়ে গেছেন জুরদিক। কিছুক্ষণ পর সম্বিৎ ফিরে পেয়ে কোমল কণ্ঠে মুখোশধারীদের উদ্দেশ করে বললেন- আমি তোমাদেরকে কেল্লায় নিয়ে যেতে চাই।
কয়েদি বানিয়ে প্রশ্ন করে এক মুখোশধারী।
না- সবাইকে হতবাক করে জুরদিক বললেন- মেহমান বানিয়ে। আমার উপর ভরসা রাখ। তরবারীগুলো সঙ্গেই রাখ।
সকলে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে। জুরদিকের ঘোড়া মারা গেছে। তিনি এক রক্ষীর ঘোড়ায় ওঠে বসেন।
কাফেলা রওনা হয়ে যায়।
***
কাফেলা পার্বত্য অঞ্চল ত্যাগ করে সমতলভূমিতে বেরিয়ে এল বলে, ঠিক এমন সময় তারা একাধিক ধাবমান ঘোড়ার পদধ্বনি শুনতে পায়। তারা ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দেয়। দেখতে পায়, দুজন অশ্বারোহী দ্রুতগতিতে হাবের দিকে ছুটে যাচ্ছে। তাদের ধনুক-তূনীর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তারা এখান থেকেই পালিয়েছে বলে কাফেলা নিশ্চিত হয়।
সম্ভবত এরাই আপনার ঘাতক। বলেই এক মুখোশধারী ঘোড়ার গতি আরো বাড়িয়ে দেয়। অপর মুখোশধারীও তার ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দেয়। উভয়ে তরবারী হাতে তুলে নেয়।
পলায়নপর ঘোড়া দুটিকে ধাওয়া করছে কাফেলা। দুই মুখোশধারীর ঘোড়ার গতিই সবচে বেশী। সামনে বালির টিলা ও পার্বত্য অঞ্চল। পলায়নপর আরোহীদ্বয় ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মুখোশধারী দুজন অভিজ্ঞ অশ্বারোহী। তারাও ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে দূরত্ব কমিয়ে ফেলে। পলায়নকারীরা কাঁধের ধনুক হাতে নিয়ে তাতে তীর সংযোজন করে। হঠাৎ ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে মোকাবেলার পজিসনে ধাওয়াকারীদের প্রতি তীর ছোঁড়ে। তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। মুখোশধারী দুজন আরো নিকটে চলে আসে। এখন উভয়ই তীর ছোঁড়ার চেষ্টা করে। পলায়নকারী একজন একটি ঘোড়ার পিছন দিকে তরবারীর আঘাত হানে। ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। অপর পলায়নকারীর উপরও আঘাত করা হয়। তার একটি বাহু কেটে যায়। ঘোড়াটিও আহত হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। কাফেলার রক্ষীরা পলায়নকারী অশ্বারোহীদের ধরে ফেলে।
