জুরদিক এগিয়ে চলছেন। একটু পরপর পার্বত্য এলাকা অতিক্রম করতে হচ্ছে। দু-তিনটা পাহাড়ী এলাকা অতিক্রম করার পর আরো একটা পাহাড়ী এলাকায় ঢুকে পড়েন। পথের দুপার্শ্বে উঁচু-নীচু অনেক টিলা। হঠাৎ কোন একদিক থেকে একসঙ্গে দুটি তীর ছুটে আসে তার দিকে। উভয় তীর জুরদিকের ঘোড়ার মাথায় এসে বিদ্ধ হয়। হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে ঘোড়াল দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। শাঁ করে ধেয়ে আসে আরো দুটি তীর। এগুলোও বিদ্ধ হয় ঘোড়র গায়ে।
জুরদিক দক্ষ ঘোড়সওয়ার। তিনি ধাবমান ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে একটি পাথরের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ান। তার রক্ষী সেনারা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে। যারা তীর ছুঁড়েছে তাদেরকে খুঁজতে থাকে।
এলাকাটি এমন যে, কাউকে গ্রেফতার করা কঠিন ব্যাপার। জ্বরকিবুঝে ফেলেন, এরা ভাড়াটিয়া ঘাতক। সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে খৃষ্টানরা তাকে খুন করার জন্য এদের নিয়োগ করেছে। খৃষ্টানদের মনে সন্দেহ, জুরদিক সুলতান আইউবীর সমর্থক।
জুরদিক দক্ষ যোদ্ধা। তিনি পাথরের আড়াল থেকে বের হয়ে উপরে উঠে আসেন। চারদিকে টিলা আর টিলা। তার রক্ষীসেনারা তীরন্দাজদের খুঁজে বেড়াচ্ছে।
এদিকে আস! এক রক্ষী চিৎকার করে বলল- জলদি এদিকে আস, ধরে ফেলেছি।
সবাই ওদিকে ছুটে যায়। তিন ব্যক্তিকে ঘিরে ফেলেছে তারা। তিনজনই মুখোশ পরিহিত। কিন্তু তাদের নিকট ধনুক নেই, নীরও নেই। শুধু ঘোড়া আছে। তাদেরকে এমন অবস্থায় পাকড়াও করা হয়েছে, যখন তারা ঘোড়ায় আরোহন করছিল। সবারই মুখমণ্ডল আবৃত। শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। বৃক্ষীরা তদেরকে ধরে জুরদিকের নিকট নিয়ে যায়।
তোমাদের ধনুক-তূনীর কোথায়? জুরদিক ধৃতদের জিজ্ঞেস করে।
আমাদের কাছে তরবারী ছাড়া আর কিছুই নেই। একজন জবাব দেয়।
শোন ভাইয়েরা!- জুরদিক শান্ত কণ্ঠে বললেন- তোমাদের চারটি তীরই লক্ষভ্রষ্ট হয়েছে। তোমরা আমাকে খুন করতে ব্যর্থ হয়েছ। এবার ধরাও পড়েছ। কাজেই মিথ্যা বলে লাভ নেই।
কিসের তীর?- বিস্ময়ভরা কণ্ঠে একজন বলল- আমরা তো কোন তীর হুঁড়িনি। আমরা পথচারী। খানিক বিশ্রাম করার জন্য বসেছিলাম। যখন রওনা হতে উদ্যত হলাম, এরা আমাদেরকে ধরে নিয়ে এল।
জুরদিক হাসেন এবং মুখোশ পরিহিত উত্তরদানকারী লোকটিকে উদ্দেশ করে বললেন, আমি তোমাদেরকে আমার শত্রু মনে করি না। তা-ই যদি হতো, তাহলে এতক্ষণে তোমাদের সকলের মস্তক উড়িয়ে দিতাম। আমি জানি, তোমরা ভাড়াটিয়া খুনী। তোমরা শুধু এটুকু স্বীকার কর- আমাকে খুন করার জন্য তোমাদেরকে কে পাঠিয়েছে। সত্য সত্য বল, তোমাদেরকে ছেড়ে দেব। কিন্তু ধৃত একই কথা বলছে যে, এ ব্যাপারে তারা কিছুই জানেনা।
দুজন মুখোশধারী শপথ করে বলল- এই ঘটনার ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না।
তৃতীয় জন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
দেখ, অযথা নিজেদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দিও না- জুরদিক বললেন পরের জন্য নিজের জীবন নষ্ট কর না। আমি তোমাদেরকে শাস্তি দেব না, এক্ষুণি ছেড়ে দেব।
এদের মুখোশগুলো খুলে ফেল- জুরদিক তার রক্ষীদের নির্দেশ দেন। এদের হাত থেকে তরবারীগুলো নিয়ে নাও।
দুই মুখোশধারী খাপ থেকে তরবারী খুলে হাতে নেয় এবং লাফ মেরে পিছনে সরে যায়। তৃতীয়জন তাদের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার সঙ্গে তরবারী নেই।
জুরদিক অট্টহাসি হেসে বললেন- তোমরা কি এতগুলো রক্ষীসেনার মোকাবেলা করতে পারবে? অথচ তোমাদের তৃতীয়জনের হাতে অস্ত্র নেই! আমি তোমাদেরকে পুনরায় সুযোগ দিলাম। তোমাদের গর্দান উড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ কিন্তু আমি এখনো দেইনি।
রক্ষীরা অস্ত্র তাক করে তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে দাঁড়িয়ে যায়।
আর আমি আপনাকে শেষবারের মতো বলছি, আমরা কেউ তীর ছুঁড়িনি। এক মুখোশধারী বলল।
রক্ষীসেনাদের কমান্ডার ধৃত তিন ব্যক্তির পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার মনে বিশেষ সন্দেহ জাগে। তৃতীয় যে লোকটির হাতে অস্ত্র নেই, টান মেরে তার মুখোশটা খুলে ফেলে। তার মুখোশহীন উন্মুক্ত মুখাবয়ব দেখে সবাই থ খেয়ে যায়। এ যে একজন রূপসী যুবতী!
জুরদিক বললেন, ওকে আমার কাছে নিয়ে আস। অপর দুজন হঠাৎ লাফ মেরে পেছনে মোড় ঘুরিয়ে মেয়েটিকে পাকড়াওকারী রক্ষীর বুকে তরবারী তাক. করে ধরে।
একজন চিৎকার করে বলে ওঠে- যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা আমাদেরকে তোমাদের পুরো ঘটনা খুলে না বলবে এবং আমাদের ইতিবৃত্ত না শুনবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মেয়েটির গা স্পর্শ করবে না বলে দিচ্ছি। আমরা জানি, আমাদেরকে তোমাদের হাতে প্রাণ দিতে হবে। কিন্তু তোমাদের অন্তত অর্ধেক রক্ষীসেনাকে না মেরে আমরা মরছি না। মেয়েটাকে তোমরা জীবিত নিতে পারবে না।
জুরদিক ঠাণ্ডা মেজাজের লোক। তিনি রক্ষীদেরকে পেছনে সরিয়ে দিয়ে, মুখোশধারীদের বললেন- তোমরা আমার কাছে আর কী কথা শুনতে চাও বল। কথা তো এটুকুই যে তোমরা ভাড়াটিয়া খুনী আর এই মেয়েটিকে পুরষ্কার হিসেবে লাভ করেছ।
তোমরা ভুল করছ- একজন মুখোশধারী বলল- খৃস্টান অফিসার ও একটি মেয়েকে হত্যা করে আমরা অপরাধ করিনি। পালাতে গিয়ে ধরা পড়েছি, সে আমাদের দুর্ভাগ্য। তারপরও আমরা আনন্দিত যে, আমরা কর্তব্য পালন করেছি। এই মেয়েটি মুসলমান ও নিপীড়িত। আমরা একে খৃস্টানদের পাঞ্জা থেকে উদ্ধার করে এনেছি। আর যাচ্ছি দামেস্কে।
