লোকটা হামাতের দুর্গ- অধিপতি। তার নাম জুরদিক। ইতিহাসে তার নাম এই জুরদিকই উল্লেখ করা হয়েছে। পুরো নাম পাওয়া যায় না। ইতিহাস তার সম্পর্কে এটুকুই বলছে যে, লোকটা সালাহুদ্দীন আইউবীর বন্ধু ছিলেন। কিন্তু এই ঘটনা পর্যন্ত তিনি আইউবী বিরোধী শিবিরেরই লোক ছিলেন এবং আল মালিকুস সালিহর অফাদার ছিলেন। তার প্রমাণ, তিনি এই ভোজসভায় শুধু উপস্থিত-ই ছিলেন না; বরং আইউবী বিরোধীদের জঙ্গী কর্মকাণ্ডগুলোতেও হাজির থাকতেন। সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যেসব যুদ্ধ পরিকল্পনা প্রস্তুত হয়েছিল, তিনি তাতেও উপস্থিত ছিলেন।
জুরদিক যখন একজন খৃষ্টানের মুখ থেকে শুনলেন যে, হাবের প্রতিটি ঘরে তল্লাশি চালানো হবে, তখন তার মধ্যে ইসলামী মর্যাদাবোধ জেগে ওঠে। তিনি প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। তিনি বললেন- এখানকার প্রতিটি পরিবার মুসলমান। তাদের মধ্যে পর্দানশীল সভ্রান্ত মহিলারাও রয়েছেন। আমি তাদের অবমাননা মেনে নিতে পারি না। সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোতে সৈন্য ঢুকতে পারবে না।
উইন্ডসরের ঘাতক এই নগরীরই মানুষ- এক খৃস্টান অফিসার বলল আমরা সব নাগরিক থেকে প্রতিশোধ নেব। উইন্ডসরের ন্যায় একজন সুদক্ষ অফিসার খুন হল। আমরা কারো ইজ্জত, কারো পর্দার পারোয়া করি না।
আর তোমাদের একজন অফিসার খুন হয়েছে, তাতে আমাদের কিছু যায়। আসে না। ক্ষুব্ধ জুরদিক কম্পিত কণ্ঠে বললেন।
চুপ কর জুরদিক!–অনভিজ্ঞ বালক সুলতান আদেশের ভঙ্গিতে বললেন এরা এতদূর থেকে আমাদের সাহায্যের জন্য এসেছেন! এরা আমাদের সম্মানিত মেহমান। তুমি কি মেহমানদারীর আদব-কায়দা ভুলে গেছ নিমকহারামী কর না জুরদিক! যে করেই হোক, খুনীকে আমাদের ধরতেই হবে।
খলীফার সমর্থনে আরো কয়েকটি কণ্ঠ ভেসে এল- ঠিক, ঠিক।
আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরোধী হতে পারি এবং বিরোধী-ই- জুরদিক বললেন- কিন্তু আমি আমার স্বজাতির বিরোধী নই। মুহতারাম সুলতান। আপনি যদি জনসাধারণকে বিরক্ত করেন, তাহলে তারা আপনার বিরুদ্ধে চলে যাবে। আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে যে রণ প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তা দুর্বল হয়ে পড়বে।
আমরা জনগণের পরোয়া কখনো করি না- রেমন্ডের প্রতিনিধি বলল উইন্ডসরের ঘাতকদেরকে আমরা খুঁজে বের করবই। শহরের যেখানেই পালিয়ে থাকুক, তাদেরকে ধরবই। এ হত্যাকাণ্ড যে সালাহুদ্দীন আইউবী করিয়েছেন, তাতে সন্দেহ নেই।
আমার দোস্ত!- জুরদিক বললেন- তোমাদের একজন অফিসারের খুন হওয়া তেমন কোন ঘটনা নয়। তোমরা সালাহুদ্দীন আইউবীকে খুন করার জন্য কতবার চেষ্টা করেছ! পারনি, সে ভিন্ন কথা। আমি একথা বলছি না যে, আইউবীকে খুন করার চেষ্টা করে তোমরা অন্যায় করেছ। দুশমন একে অপরকে বৈধ-অবৈধ যে কোন পন্থায়ই ঘায়েল করার চেষ্টা করে। তোমাদের উইন্ডসরকে যদি আইউবী-ই খুন করিয়ে থাকেন, তাহলে পার্থক্য শুধু এটুকু যে, তাকে হত্যা করার প্রচেষ্টায় তোমরা সফল হওনি; কিন্তু তিনি সফল হয়েছেন। তোমরাও তো। তার কয়েকজন অফিসারকে খুন করিয়েছ। তারপরও তো তিনি জনসাধারণকে বিরক্ত করেননি।
সমস্ত মুসলিম আমীর ও কর্মকর্তা জুরদিকের বিপক্ষে কথা বলতে শুরু করেন। তারা খৃস্টানদেরকে নারাজ করতে চাচ্ছেন না। কিন্তু জুরদিক একাই সকলের মোকাবেলা করেন এবং নিজের অভিমতের উপর সুদৃঢ় থাকেন যে, নগরীর ঘরে ঘরে নির্বিচারে তল্লাশী চালানো যাবে না।
তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে, তুমিও এই খুনের ঘটনায় জড়িত রয়েছ? এক খৃস্টান উপদেষ্টা বলল- আমার সন্দেহ হচ্ছে, তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীর অনুগত।
যদি হালবের মুসলিম পরিবারগুলোকে অন্যায়ভাবে পেরেশান করা হয়, তাহলে আমি যে কারো হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারি- জুরদিক বললেন, আর আইউবীর বন্ধুও হয়ে যেতে পারি।
আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত এখানে আছি, আমাদেরই নির্দেশ চলবে। খৃস্টান, প্রতিনিধি বলল।
এখানে তোমরা ভাড়ায় এসেছ- জুরদিক বললেন- এদেশে শাসন চলবে আমাদের। আমরা মুসলমান। পরিস্থিতি আমাদেরকে আপসে যুদ্ধে করাচ্ছে। মুসলিম-অমুসলিমে কখনো সখ্য হতে পারে না। যদি বল, তোমরা পারিশ্রমিক ছাড়া, এসেছ, তাহলে আমি তোমাদের সাহায্য থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছি। দুর্গ অধিপতির পদ থেকেও আমি অব্যাহতি গ্রহণ করছি। আমি তোমাদের সকলকে জানিয়ে দিতে চাই যে, আমার জাতির একটি নিরপরাধ লোককেও যদি কষ্ট দেয়া হয়, আমি তার প্রতিশোধ নেব।
কার যেন ইশারায় দুব্যক্তি জুরদিককে বাহিরে নিয়ে যায়। তার অনুপস্থিতিতে খৃস্টান প্রতিনিধি সভাসদদের উদ্দেশ করে বলল- পরিস্থিতি এমন যে, দুর্গ অধিপতিকে ক্ষেপানো যাবে না। লোকটা যেভাবে সাহসিকতার সঙ্গে, কথা বলছে, তাতে বুঝা যায় যে, তার দুর্গে যেসব সৈন্য আছে, তারা তার অনুগত। ঘটনা যদি তা-ই হয়, তাহলে পরিস্থিতিটা ভাল নয়।
আপসে শলা-পরামর্শ করে জুরদিককে ভেতরে নিয়ে আসা হল। তাকে আশ্বস্ত করা হল, নিরীহ জনসাধারণকে হয়রানী করা হবে না। কিন্তু ঘাতকদের খুঁজে বের করতে হবে।
জুরদিক বললেন- ঠিক আছে, আমি তিন-চার দিন এখানে থাকব। দেখব, তোমরা কী কর।
চারদিন পর জুরদিক হালব থেকে রওনা হন। গন্তব্য তার হামাতের দুর্গ। তার উপস্থিতিতে খুনীদের অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা তৎপরতা চলে। তিনি পরিস্থিতির উপর কড়া দৃষ্টি রাখেন। তার দাবি অনুযায়ী কারো বাড়ি-ঘরে হানা দেয়া হয়নি। তিনি নিশ্চিন্ত মনে যাচ্ছেন। কিন্তু খৃস্টানরা তার ব্যাপারে আশ্বস্ত নয়। সঙ্গে দশ-বারজন রক্ষীসেনা। তিনিসহ সবাই অশ্বারোহী।
